পাহাড় বেয়ে বেয়ে উঠে এলাম। উচ্চতা কম নয়। নদীটাকে পিছনে ফেলে হেঁটেছি আড়াই-তিন ঘণ্ট। ধীরে ধীরে নদীর গর্জন ক্ষীণ হয়ে আসছে। ওপরে বাতাসের ঝাপটা বেড়েছে অনেক। তিব্বতীয় প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। আমি এসে দাঁড়ালাম একটা গ্রামের কাছে।
পাহাড়ের কোলে ভুটিয়াদের গ্রাম। সবুজ ক্যানভাসে রঙিন ঘরবাড়ি। সবই কাঠের বাড়ি। ওপরে নীল আকাশ। রোলিং স্টোন সবুজ পাহাড়। রঙিন কাঠের বাড়ি। প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। পাশেই মনেস্ট্রি। পাঁচ রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। নীল, সাদা, লাল, সবুজ, হলুদ। এর মানে- আকাশ, বাতাস, আগুন, পানি ও পৃথিবী। তিব্বতীয়দের বিশ্বাস অনুসারে এই পাঁচটি উপকরণ দিয়ে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে।
গলা শুকিয়ে আসছে ডিহাইড্রেশনে। এত দূর চলে আসব জানতাম না। তাই নিচ থেকে পানি নিয়ে আসা হয়নি। আমি উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছিলাম পানির খোঁজে।
মেয়েটি আমাকে বলল, তোমার কিছু লাগবে? আমি বললাম, পানি, জাস্ট এক বোতল পানি। মেয়েটি উত্তরে বলল, আমার সাথে আসো। সিকিমে পানি বিক্রি হয় না। কারণ সিকিমে একবার ব্যবহার উপযোগী বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই তুমি কোথায় পানি কিনতে পারবে না। সব সময় পানি নিজে বহন করা লাগবে।
আমাকে মেয়েটি তার বাড়িতে নিয়ে গেল। সুন্দর একতলা কাঠের বাড়ি। পাহাড়ের ঢালে। উজ্জ্বল হলুদ রঙ। দূর থেকে চোখে পড়ে। মূল ঘরে প্রবেশের আগে লম্বা বারান্দা। শত শত অর্কিড ঝুলছে।
মেয়েটি আমাকে বলল, অর্কিড সিকিমের রাজ্য ফুল (স্টেট ফ্লাওয়ার)। তুমি কী জান? অর্কিড একবার ফোটলে কত মাস থাকে?
আমি শুকনো গলায় ঢোল গিলে বললাম, কত?
মেয়েটি বলব, ছয় মাস। আর অর্কিড বার মাসে একবার ফোটে। আমার নাম ডোমা। ডোমা ভুটিয়া। ঘর থেকে মেয়েটির বাবা বের হয়ে এলেন। ডোমা বলল, আমার বাবার সাথে পরিচিত হও। আমি বিনয় দেখিয়ে, ভদ্র লোককে বললাম, নমাস্তে।
ভদ্রলোক হাসি দিয়ে, আমার সাথে হাত মেলালেন। আমরা দুজনে ঘরে গিয়ে বসলাম। একেবারে খাবারের ঘরে। আমি ডাইনিং টেবিলে। ডোমার বাবা, আমার উল্টা পাশে মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসলেন। ডোমা আমাদের দুজনের মাঝামাঝি ফ্রিজারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমার দিকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ডোমার বাবার মুখে কৌতূহল মাখা হাসি।
আমার মাঝখানে রাখা হলো এক ঝুড়ি ফল। আপেল, কলা আর কমলা। আমার হাতে ফল কাটার ছুরি। ততক্ষণে আমি প্রেজেন্টেশন দিছি প্রায়। ডোমার বাবাকে মনে হচ্ছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি মার্কেটিংয়ের বড় আজাদ স্যার। ডোমা আমার পারফরম্যান্স দেখছে। দাদ দিয়ে নখ কাটা শুরু করছে সে। আমি আপেল খেতে খেতে গল্প বলে যাচ্ছি। ডোমার মা নেই।ভদ্রলোক আমাকে বাড়ির ঢালে নদীর পাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে সারি সারি কমলা গাছ। আমাকে কমলা পেড়ে হাতে দিলেন। বললেন, খেয়ে দেখ মিষ্টি কেমন?
আমি কমলা মুখে দিয়ে বললাম, মিষ্টি আছে। ভদ্রলোক বললেন, আগে আরও মিষ্টি ছিল। এখন সিকিমের আবহাওয়া আগের মতো নাই। সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশুদ্ধতা হারাচ্ছে, সিকিমের মাটি, বাতাস, পানি।
ডোমা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। বাবার প্রস্থান। আমাকে নিয়ে গেল তার সবজি বাগান দেখাতে। একে একে সব দেখাল। বর্ণনা দিল। বেগুন, ব্রকলি, গাজর, টমেটো, স্টবেরি, ফ্রেন্স বিন। বাগানের চারপাশে এলাচ গাছ।
আমার চোখ গেল ছোট একটা সরিষা খেতের দিকে। নদীর বাতাসে সরিষা গাছে ফুল দুলছে। পাহাড়ের ঢালে সরিষা খেত। ফুল এসেছে। বাতাসে দোল খাচ্ছে সরিষা ফুল। আমি আর ডোমা সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি নিলাম। ছবি তুলে দেওয়ার কেউ ছিল না। ক্যামেরা ট্রাইপডে রেখে, টাইমার দিয়ে ছবি তুলেছি আমরা।
ডোমা একবার বলল, আমি ভালো জামা পরে আসি?
তোমাকে এমনিতেই মিষ্টি লাগছে, বললাম আমি। সে তার পাতলা ঠোঁট নাড়িয়ে হাসি দিল। অতি ফর্সা তুষারের মতো চেহারা। তাতে লাল লাল ছোপ ছোপ আভা। মাথায় হালকা চুল। কোরিয়ার মেয়েদের মতো সমান করে কাটা।
পিছনে মনেস্ট্রিতে ঘণ্টা বাজছে। বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে সে ধ্বনি। বিকাল নেমে যাচ্ছে দ্রুত। সময় বয়ে যাচ্ছে তারও আগে। পাহাড়ে সন্ধ্যা হয় হঠাৎ করে। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেলেই অন্ধকার। আমি ডোমার বাগানে দাঁড়িয়ে আছি। পাশে ডোমা। পিছনে মনেস্ট্রি। সামনে র্যাংপো নদী। আমার হোম স্টেট এখান থেকে অনেক দূরে। দুই-তিন ঘণ্টার পথ। ডাউন হিল।
নদীর ওপারে একটা গাছে লাল ফুলে ছেয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই ফুলগুলির নাম কি, ডোমা।
সে বলল, লালুপাতা। পাহাড়ের উপরে সাদা মেঘ। শীত নেমে গেছে। আমি জড়িয়ে যাওয়া পায়ে নিচে নামছি। ক্রমেই নদীর গর্জন বাড়ছে। পিছনে মনেস্ট্রি। ডোমা তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাসে অনেকগুলো প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। আমি আর পিছনে তাকানোর সাহস পেলাম না। ফিরে আসার সময় ডোমার বাবাকে আর দেখিনি।
সামনে পেলে সাহস করে বলে ফেলতাম। স্যার, আপনার অর্কিড ফুল, কমলালেবু গাছ, ফ্রেন্স বিনের যত্ন আমি নেব। এখানে আমি ফুল ফোটাব। বিনিময়ে কিছুই চাই না। সারা জীবন এখানে মনেস্ট্রির পাশেই কাটিয়ে দিতে চাই।
লম্বা একটা সাসপেনশন ব্রিজ পার হয়ে নদীর ওপারে আমার থাকার ব্যবস্থা। আমি সাসপেনশন ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে দেখলাম। ভয়ংকর, ধ্বংসলীলা চলছে নিচে। বারবার মনে হলো র্যাংপো নদী আমার বুকের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে আজ রাতে। আজ আমি রোলেপ উপত্যকায়, র্যাংপো নদীর পাশে ঘুমাব কী করে!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









