পর্যটননির্ভর দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণে যাওয়ার খবরে উচ্ছ্বসিত দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। এ খবরে দ্বীপের বাসিন্দারা আনন্দ মিছিলও করেছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিন হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পর্যটন মৌসুম চলবে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
এজন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে খুশি দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিন পর পর্যটন কার্যক্রম চালুর সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাদের মধ্যে ফিরেছে আশা। তবে দীর্ঘদিন পর এই দ্বীপের দুয়ার খুললেও স্থানীয় মানুষের মনে আনন্দের চেয়ে আশঙ্কার কালো মেঘই বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষার দোহাই দিয়ে এবার যে ধরনের কঠোর বিধি-নিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে দ্বীপের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এক নতুন সংকটের মুখোমুখি।
অবশ্য পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত থাকায় দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। এবার ভ্রমণের পাশাপাশি রাতযাপনের সুযোগ থাকলে পর্যটকেরা বেশি সময় দ্বীপে অবস্থান করতে পারবেন। এতে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌপরিবহনসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসায় গতি ফিরবে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দ্বীপের বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেন্টমার্টিনের প্রায় ১২ হাজারের বেশি স্থায়ী বাসিন্দার জীবন ও জীবিকা কীভাবে প্রতিটি মুহূর্তে বিষিয়ে উঠছে। এখানকার অন্তত ৮৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি পর্যটন ও হোটেল-মোটেল ব্যবসার ওপর নির্ভশীল। বিগত ৫ বছরের টানা অচলাবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, সেন্টমার্টিনের অর্থনীতি এখন সম্পূর্ণ খাদের কিনারে। চার বছর আগেও টেকনাফ থেকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১১টি বড় জাহাজে করে পাঁচ-ছয় হাজার পর্যটক অত্যন্ত কম খরচে এবং কম সময়ে সেন্টমার্টিনে যেতে পারতেন।
তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১০টি জাহাজ চলাচল অনুমোদন পেলেও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি জাহাজ। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিস্থিতি, নাফ নদীর ওপার থেকে বাংলাদেশি ট্রলারে উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ এবং অপহরণের মতো ভীতিকর ঘটনার পর টেকনাফ রুটটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন) ঘাট থেকে জাহাজ চলাচলের যে রুট নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্থানীয়দের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজার থেকে উত্তাল বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ রুট পাড়ি দিয়ে দ্বীপে যেতে পর্যটকদের যাতায়াত সময় যেমন দ্বিগুণ লাগছে, তেমনি পকেটের খরচও হয়ে গেছে দ্বিগুণ। ফলে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পর্যটকদের বড় অংশই সেন্টমার্টিন বিমুখ হয়ে পড়েছেন।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ হিসাব মতে, গত পাঁচ বছরের এই ধারাবাহিক রুট জটিলতা, সময়ের সংকোচন এবং নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসের আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার কারণে দ্বীপের হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ট্রলার মালিকদের সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতি ইতিমধ্যে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)- এর সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন দৈনিক এদিনকে বলেন, “সেন্টমার্টিনে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য আনতে স্থানীয় মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা জরুরি। জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পর্যটনকর্মীদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ দিতে হবে। মৌসুমে কাজ না থাকলে সাময়িক সহায়তাও দেওয়া প্রয়োজন। ব্যবসার ক্ষতি কাটাতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী নৌযান, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের নিয়ম ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করতে হবে। পরিকল্পনার লক্ষ্য হওয়া উচিত—প্রকৃতি রক্ষা করে স্থানীয় মানুষের জন্য স্থিতিশীল জীবিকা তৈরি করা।”
এই চরম অর্থনৈতিক সংকটের সাথে দ্বীপবাসীর জীবনে যোগ হয়েছে এক তীব্র ও অমানবিক বিদ্যুৎ সংকট। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপে নেই কোনো জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ। ২০১৯ সালে ১ ফেব্রুয়ারি এখানে একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল এই আশায় যে দ্বীপবাসী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমানে দ্বীপে দিনে মাত্র ৪ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তাও প্রতি ইউনিটের জন্য দ্বীপের দরিদ্র বাসিন্দাদের দিতে হচ্ছে ৪২ থেকে ৫২ টাকা পর্যন্ত চড়া মূল্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন, নভেম্বর থেকে এই চড়া মূল্যের ওপর আরও প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। বিকেলের পর থেকেই দ্বীপের অধিকাংশ এলাকা ভূতুড়ে অন্ধকারে ডুবে যায় এবং অনেক সময় পরদিন সকাল পর্যন্ত কোনো বিদ্যুতের দেখা মেলে না। এর ফলে রাতের অন্ধকারে পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, শিশুদের পড়াশোনা সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে এবং পর্যটনমুখী জরুরি ব্যবসায়িক কার্যক্রম ফ্রিজিং ও কোল্ড স্টোরেজের অভাবে ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমিত সক্ষমতা এবং অবকাঠামোগত অবহেলার কারণে প্রায় ১২ হাজারের বেশি মানুষের এই জনপদ আধুনিক সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে ধুঁকছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দীর্ঘদিন দ্বীপ বন্ধ থাকায় স্থানীয় প্রান্তিক মানুষজন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছে। সরকারের পর্যটন চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও টেকনাফ রুট পুরোপুরি চালু না করে এবং রাত্রিযাপনে কড়াকড়ি রাখলে দ্বীপের প্রায় ১২ হাজারের অধিক মানুষের পেটে লাথি পড়বে এবং তাদের জীবিকা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে। পরিবেশ রক্ষার কঠোরতা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের জীবন ধ্বংস করে না করা হয়, এটাই এখন সেন্টমার্টিনবাসীর একমাত্র করুণ আকুতি।
সেন্টমার্টিনের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড মূলত তিনটি খাতের ওপর টিকে আছে: আবাসন খাত (হোটেল-রিসোর্ট), রেস্তোরাঁ ও খাদ্য সরবরাহ খাত এবং স্থানীয় অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও খুচরা ব্যবসা। এই তিন খাতের চাকা সচল রাখতে প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়, তা দিয়েই বাকি সাত-আট মাস দ্বীপের পরিবারগুলো জীবিকা নির্বাহ করে। অথচ গত পাঁচ বছরে সরকারের অপরিকল্পিত ও আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের কারণে এই অর্থনৈতিক শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
দ্বীপের একশোরও বেশি হোটেল ও রিসোর্টের মালিকরা ব্যাংক ঋণ এবং ব্যক্তিগত মূলধন বিনিয়োগ করে বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনছেন। অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন তো দূরের কথা, নোনা ধরা এই দ্বীপের স্থাপনাগুলো সচল রাখতেই প্রতি বছর যে বিপুল সংস্কার ব্যয় হয়, তার এক-তৃতীয়াংশও গত কয়েক মৌসুমে ব্যবসা থেকে উঠে আসেনি।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। দ্বীপের কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাদ্যসামগ্রী যেখানে মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রলারে করে চড়া ভাড়ায় নিয়ে আসতে হয়, সেখানে পর্যটকের সংখ্যা বেঁধে দেওয়া এবং তাদের দ্বীপে অবস্থানের সময় সংকুচিত করায় বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। ফলে খাদ্য ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েকশো স্থানীয় বাবুর্চি, সাহায্যকারী এবং সরবরাহকারী সম্পূর্ণ কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও রূপসী বাংলা রিসোর্টের মালিক মহিউদ্দিন এদিনকে বলেন, “বিগত বছরগুলিতে যে লোকশান হয়েছে ব্যবসায় তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আগে প্রতি সিজনে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মতো নির্ধারিত আয় আসত রিসোর্ট থেকে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের পর থেকে ক্ষতির সম্মুখিন আমরা। বিগত দুই বছরে মাত্র দুই থেকে তিন লাখ টাকার মতো আয় দিয়ে সারা বছর সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা কোনরকম চলতে পারলেও দ্বীপে অনেক রিসোর্ট আছে যারা ব্যবসায়ী হিসেবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এবছর দীর্ঘ সময় দ্বীপে চলাচল উম্মুক্ত থাকায় আমরা খুশি । সরকার যেন দ্বীপের সুরক্ষা রক্ষায় এমন কোন সিদ্ধান্ত না নেন, যাতে স্থানীয়রা ক্ষতীর সম্মুখীন হন। সরকার যেন দ্বীপবাসী ও পরিবেশ উভয়ের দিক বিবেচনা করেন।”
এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়েছে দ্বীপের হাজারো সাধারণ মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবনে। সেন্টমার্টিনের সাধারণ বাসিন্দাদের সিংহভাগই জেলের কাজ করতেন, কিন্তু সাগরে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং মিয়ানমার সীমান্তের উত্তেজনার কারণে মাছ ধরা এখন প্রায় বন্ধ। ফলে পর্যটনই ছিল তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র খড়কুটো। কিন্তু সেখানেও এখন বিধির মারপ্যাঁচে তারা কোণঠাসা। স্থানীয় এক প্রবীণ মৎস্যজীবী ও ভ্যানচালক ওসমানের সাথে কথা বলে জানা গেল এক হৃদয়বিদারক তথ্য।
তিনি জানান, আগে পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন একেকজন ভ্যানচালক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা অনায়াসে আয় করতেন। সেই টাকা জমিয়ে তারা বর্ষার কঠিন মাসগুলোতে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতেন। কিন্তু গত মৌসুমের ধাক্কা সামলাতে না পেরে তাকে নিজের একমাত্র আয়ের উৎস ভ্যানটি বন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে। দ্বীপের ঘরে ঘরে এখন কেবল ঋণের বোঝা আর ক্ষুধার হাহাকার। অনেকেই নিজের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে কক্সবাজার বা টেকনাফের মূল ভূখণ্ডে দিনমজুরের কাজে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দ্বীপের তরুণ সমাজ যারা গাইড বা ট্যুর অপারেটর হিসেবে নিজেদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখছিল, কর্মসংস্থান হারিয়ে তাদের বড় অংশই এখন চরম হতাশায় ভুগছে, যা দ্বীপের সামাজিক নিরাপত্তা ও অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা জাবেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘সেন্টমার্টিনবাসীর কল্যাণে সরকারের সিদ্ধান্তে আমরা আনন্দিত। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টার সিদ্ধান্তের কারণে সেন্টমার্টিনের পর্যটনশিল্পে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তা নিয়ে আমরা দ্বীপবাসী অত্যন্ত হতাশ ও উদ্বিগ্ন ছিলাম। পর্যটনশিল্পে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় আমাদের কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে দ্বীপবাসীকে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের বাস্তবতা হলো, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়ার পর বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক পরিবারকে অনাহার ও দুর্ভোগের আশঙ্কায় দিন কাটাতে হয়। বিকল্প কর্মসংস্থানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেন্টমার্টিনবাসীর কল্যাণ, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প রক্ষায় সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। এ সিদ্ধান্তে সেন্টমার্টিনের সাধারণ মানুষ আশাবাদী ও আনন্দিত। আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত সেন্টমার্টিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকুক, একই সঙ্গে দ্বীপবাসীর ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থান ও জীবিকা নিশ্চিত হোক। কারণ, স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সমস্যার সমাধানেও তারা নিজেরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। আমরা সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ সংরক্ষণ ও দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকার মধ্যে সমন্বয় রেখে সরকার ভবিষ্যতেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সেন্টমার্টিন বাঁচুক, দ্বীপবাসী বাঁচুক, পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাক।’
স্থানীয় বাসিন্দা হাসান মিয়া বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও সেন্টমার্টিনে পর্যটকরা ভ্রমণে যেতে পারবেন এমন খবরে দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেন্টমার্টিনের মানুষের জীবিকা ও আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটন। পর্যটন মৌসুমের আয় দিয়ে বাকি সময় তাদের সংসার খরচ চলে। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন পর্যটকদের আনাগোনা বন্ধ থাকায় দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দ্বীপের আরেক বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, নতুন করে আবারো সেন্টমার্টিনে পর্যটন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আগের বিধিনিষেধের বেড়াজাল থেকে দ্বীপবাসীকে মুক্ত করে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ায় আমরা আনন্দিত। তিনি আরো বলেন, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা ও নিয়মনীতি নির্ধারণ করায় দ্বীপের বাসিন্দা, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই খুশি।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের পর্যটন ব্যবসায়ী তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘সরকারের নতুন এ সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। কারণ আগের তুলনায় এ বছর পর্যটন মৌসুমে পর্যটকরা বেশি আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সেন্টমার্টিনের মানুষ আনন্দ মিছিল করেছেন।’
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টমার্টিন ভ্রমণে ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য দ্বীপ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’ তিনি বলেন, ‘দ্বীপের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পর্যটন জড়িত।’ তিনি আরো বলেন, পর্যটকদের আগমনকে সামনে রেখে দ্বীপের সব পেশার মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সবাই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংস্কারে ব্যস্ত। এবার পুরো সময় রাতযাপনের সুযোগ থাকলে পর্যটন ব্যবসায়ী ও ভ্রমণপিপাসু উভয়ের জন্যই তা ভালো খবর। কক্সবাজার থেকে আট-নয় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে আসা পর্যটকদের ভ্রমণের কষ্টও কমবে। তাদের দিনে এসে দিনেই ফিরে যেতে হবে না।
টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিন ভ্রমণকালে পযর্টকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন সেখানে দায়িত্বে থাকবেন। যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে উপজেলা প্রশাসন দায়িত্বে থাকবেন।
পরিবেশবাদীদের যুক্তি অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনের প্রবাল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অপরিহার্য। পর্যটকদের ফেলা অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিক বর্জ্য, বোতল ও পলিথিন দ্বীপের মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে এবং সাগরের তলদেশের প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে দ্বীপের মিষ্টি পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং নলকূপগুলোতে নোনা জল চলে আসছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, দ্বীপটিকে বাঁচাতে হলে পর্যটনের ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আনতেই হবে। কিন্তু স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবেশ রক্ষার এই বিশাল মূল্যের দায়ভার কেন কেবল দ্বীপের দরিদ্র ও অসহায় আদিবাসীদের ওপর চাপানো হবে? কেন পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান বা সরকারি কোনো বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হলো না? বিগত ৯ মাস ধরে যখন দ্বীপটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ছিল, তখন সরকারি বা বেসরকারি স্তর থেকে স্থানীয় মানুষের জন্য কোনো খাদ্য সহায়তা বা বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়নি। ফলে পরিবেশ বনাম জীবিকার এই অসম লড়াইয়ে দ্বীপবাসী নিজেদের অবহেলিত এবং প্রান্তিক ভাবছেন, যা দেশের নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হলেও তা কোনোভাবেই দ্বীপের স্থবির অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত টেকনাফ রুট পুনরায় সচল করা হচ্ছে এবং পর্যটকদের রাত্রিযাপনের অধিকার স্বাভাবিক করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বড় বিনিয়োগকারীরা তাদের লোকসান কাটাতে পারবেন না এবং প্রান্তিক মানুষগুলো তাদের হারিয়ে যাওয়া জীবিকা ফিরে পাবেন না।
দ্বীপের বাসিন্দারা চান পরিবেশের সুরক্ষা বজায় রেখেই পর্যটন চলুক। কিন্তু তার জন্য তাদের পেটে লাথি মেরে বা আধুনিক সভ্যতার মৌলিক উপাদান বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত করে নয়। সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে হলে সরকারকে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও মানবিক সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে দেশের একমাত্র এই স্বর্গীয় প্রবাল দ্বীপটি হয়তো একদিন পরিবেশের দিক থেকে টিকে থাকবে, কিন্তু তার আদি বাসিন্দা ও মানুষের জীবনযাত্রা চিরতরে এক ভূতুড়ে মরুভূমিতে পরিণত হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









