যেখানে বৃক্ষের শরীরে জমে আছে ড্রাগনের রক্ত, আর ভূগোলের ভেতর ঘুমিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাস। আরব সাগরের নীল জলরাশির মধ্যে, ইয়েমেনের দক্ষিণ উপকূল থেকে বহু দূরে, এমন একটি দ্বীপ পড়ে আছে, যাকে প্রথম দেখলে মনে হয় পৃথিবী তার নিজের কোনো বিস্মৃত স্বপ্ন এখানে রেখে গেছে। দ্বীপটির নাম সোকোত্রা। চারদিকে সমুদ্র, মাঝখানে পাথুরে পাহাড়, শুকনো উপত্যকা, সাদা বালুর সৈকত এবং এমন সব বৃক্ষ, যাদের আকৃতি পরিচিত পৃথিবীর উদ্ভিদজগতের সঙ্গে ঠিক মেলে না। তাদের ডালপালা ছাতার মতো ছড়িয়ে আছে আকাশের দিকে। মনে হয়, কোনো অদৃশ্য সভ্যতার পতনের পর তারা এখানে দাঁড়িয়ে আছে, শেষ সাক্ষী হয়ে।
সোকোত্রাকে বোঝার জন্য মানচিত্র যথেষ্ট নয়। মানচিত্র আমাদের বলে দ্বীপটি কোথায়। কিন্তু বলে না, কেন তার দিকে তাকালে মনে হয় সময় এখানে অন্য কোনো নিয়মে চলে। কেন তার পাহাড়গুলোকে মনে হয় পৃথিবীর জন্মলগ্নের কোনো অসমাপ্ত বাক্য। কেন তার গাছের ছায়ায় দাঁড়ালে মানুষের নিজের ইতিহাসকেও সাময়িকভাবে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

সম্ভবত দ্বীপটির সবচেয়ে বড় বিস্ময় তার বিচ্ছিন্নতা। ভারত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে, আফ্রিকার শিং এবং আরব উপদ্বীপের মাঝামাঝি অবস্থান সোকোত্রার। বহু শতাব্দী ধরে সমুদ্রপথের বণিকেরা এখানে এসেছে, আবার চলে গেছে। কিন্তু দ্বীপটি যেন তাদের কারও সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। সে নিজের মতো থেকেছে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যখন সাম্রাজ্য উঠেছে, যুদ্ধ হয়েছে, নগর গড়ে উঠেছে এবং ধ্বংস হয়েছে, সোকোত্রার পাহাড়ে তখনও বাতাস বয়ে গেছে একইভাবে।
এই দ্বীপের সবচেয়ে পরিচিত বৃক্ষটির নাম ড্রাগনস ব্লাড ট্রি—ড্রাগনের রক্তগাছ। তার শাখাগুলো ওপরের দিকে উঠে গিয়ে তারপর ছাতার মতো বিস্তৃত হয়েছে। গাছটির গায়ে কোনো পরিচিত সৌন্দর্যের নিয়ম কাজ করে না। সে সুন্দর, কিন্তু সেই সৌন্দর্য কোমল নয়। তার মধ্যে আছে প্রাগৈতিহাসিক কোনো প্রাণীর স্মৃতি, কিংবা এমন এক জীবনের আভাস, যা মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা খুঁজে চলেছে।
গাছটির বাকল থেকে নিঃসৃত হয় গাঢ় লাল রজন। রক্তের মতো সেই পদার্থের নাম থেকেই তার পরিচিতি। প্রাচীন মানুষ একে ব্যবহার করেছে রং, ওষুধ ও নানা আচার-অনুষ্ঠানে। কিন্তু নামটির মধ্যে লুকিয়ে আছে আরও পুরোনো একটি কল্পনা। ড্রাগন—মানুষের পৌরাণিক স্মৃতিতে যে প্রাণী শক্তি, ধ্বংস, পাহারা এবং অমরত্বের প্রতীক। পৃথিবীর নানা সভ্যতা ড্রাগনের গল্প তৈরি করেছে। চীন থেকে ইউরোপ, মেসোপটেমিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ—প্রতিটি সংস্কৃতিতে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু রহস্য বদলায়নি। সোকোত্রার এই বৃক্ষ যেন সেই সমস্ত কাহিনির মধ্যবর্তী কোনো জীবন্ত বিরামচিহ্ন।
এখানে একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়: মানুষ কি প্রকৃতিকে দেখে পুরাণ তৈরি করে, নাকি প্রকৃতির ভেতর এমন কিছু পুরোনো স্মৃতি রয়ে গেছে, যা মানুষকে বারবার পুরাণের দিকে ঠেলে দেয়?
সোকোত্রার ইতিহাসে এই প্রশ্নের একটি বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক নাবিকদের কাছে দ্বীপটি পরিচিত ছিল ডিওসকোরিডা নামে। ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথে এর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ধূপ, অ্যালো, সুগন্ধি রজন এবং ড্রাগনস ব্লাডের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য আরব, ভারতীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় বণিকেরা এখানে আসত। তাদের কেউ রেখে গেছে শিলালিপি, কেউ প্রার্থনা, কেউ নিজের নাম। সোকোত্রার হোক গুহায় পাওয়া গেছে বিভিন্ন ভাষা ও লিপিতে লেখা এমন সব প্রাচীন নিদর্শন, যা দ্বীপটিকে একসময়কার বিস্তৃত সামুদ্রিক যোগাযোগের সাক্ষী করে তুলেছে।

কল্পনা করা যায়, বহু শতাব্দী আগে কোনো বণিক জাহাজ এই দ্বীপের উপকূলে এসে নোঙর ফেলেছে। তার সঙ্গে এসেছে দূরদেশের ভাষা, দেবতার নাম, বাজারের হিসাব, সমুদ্রযাত্রার ভয় এবং বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা। জাহাজের মানুষগুলো হয়তো জানত না, তারা এমন একটি ভূখণ্ডে এসে পৌঁছেছে, যেখানে প্রকৃতি নিজেই ইতিহাসের চেয়ে প্রাচীন।
গ্রিক পুরাণে দূরবর্তী দ্বীপগুলো প্রায়ই দেবতা, দৈত্য ও অদ্ভুত প্রাণীর আবাসস্থল। হোমারের ওডিসি-তে সমুদ্রযাত্রা কখনোই শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর ঘটনা নয়; সেটি মানুষের পরিচিত জগৎ থেকে অজানার দিকে যাত্রা। সোকোত্রাকে সেই মহাকাব্যিক কল্পনার পাশে রাখলে মনে হয়, এটি কোনো হারিয়ে যাওয়া দ্বীপ নয়, বরং এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে ওডিসিউসের জাহাজ ভুল করে এসে পড়তে পারত। এখানকার পাহাড়ের গুহায় হয়তো কোনো দৈত্য নেই, কিন্তু রয়েছে এমন সব প্রাকৃতিক রহস্য, যা মানুষের কল্পনাকে দৈত্যের প্রয়োজন থেকে মুক্ত করে দেয়।
দ্বীপটির প্রকৃত বিস্ময় অবশ্য তার জীববৈচিত্র্য। এখানে প্রায় ৮২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যার ৩০৭টি পৃথিবীর অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে জন্মায় না। সরীসৃপের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং স্থলচর শামুকের ৯৫ শতাংশ প্রজাতিও দ্বীপটির নিজস্ব। এজন্য সোকোত্রাকে প্রায়ই ভারত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস বলা হয়। ২০০৮ সালে এটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

কিন্তু সংখ্যার মধ্যে এই দ্বীপের বিস্ময় সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। তার জন্য যেতে হয় হাঘিয়ার পর্বতমালার দিকে। সেখানে গ্রানাইটের খাড়া শৃঙ্গ মেঘের মধ্যে উঠে গেছে। নিচে শুকনো উপত্যকা, দূরে সমুদ্র, আর পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে আছে বিরল উদ্ভিদ। কোথাও সুকুলেন্টের অদ্ভুত গঠন, কোথাও বোতলের মতো মোটা কাণ্ডের শসাগাছ, কোথাও মরুভূমির গোলাপের উজ্জ্বল ফুল। মনে হয়, বিবর্তন এখানে নিজের জন্য আলাদা একটি পরীক্ষাগার তৈরি করেছিল। পৃথিবীর অন্য কোথাও যে পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে, সোকোত্রায় তার কিছু অসমাপ্ত সংস্করণ এখনো বেঁচে আছে।
তবে এই দ্বীপের গল্প কেবল বৃক্ষ ও পাথরের নয়। এখানে মানুষও আছে। আছে সোকোত্রি ভাষা, নিজস্ব লোকজ জ্ঞান, পশুপালন, মাছ ধরা এবং প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থানের ইতিহাস। দ্বীপের মানুষ বাতাস, ঋতু, উদ্ভিদ ও পানির সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক তৈরি করেছে, যা আধুনিক পৃথিবীর অনেক জায়গায় প্রায় হারিয়ে গেছে। তাদের ভাষার মধ্যে দ্বীপের ভূপ্রকৃতি ও জীবজগতের বহু সূক্ষ্ম পরিচয় সংরক্ষিত রয়েছে।
এইখানে এসে সোকোত্রার সৌন্দর্যের অর্থ বদলে যায়। এতক্ষণ যে দ্বীপকে মনে হচ্ছিল মানুষের অনুপস্থিতিতে টিকে থাকা কোনো আদিম পৃথিবী, সেখানে হঠাৎ মানুষের উপস্থিতি তাকে নতুন অর্থ দেয়। বিচ্ছিন্নতা মানেই শূন্যতা নয়। দূরবর্তী মানেই ইতিহাসহীন নয়। বরং কখনো কখনো প্রান্তিক ভূগোলের ভেতরেই এমন সব ইতিহাস বেঁচে থাকে, যাদের কথা কেন্দ্রের সভ্যতা ভুলে যায়।
কিন্তু সোকোত্রাও আর সময়ের বাইরে নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, পরিবেশের ওপর মানুষের চাপ এবং উন্নয়নের নানা অভিঘাত তার ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করছে। যে দ্বীপ হাজার হাজার বছর ধরে নিজের জীবজগতকে আগলে রেখেছে, তার ভবিষ্যৎ এখন মানুষের সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভরশীল।
শেষ পর্যন্ত সোকোত্রা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য রেখে যায়। পৃথিবীকে আমরা প্রায়ই একটি সম্পূর্ণ জানা বস্তু বলে কল্পনা করি। তার মানচিত্র তৈরি করি, সম্পদ পরিমাপ করি, ভূখণ্ডকে পর্যটনস্থলে পরিণত করি। অথচ পৃথিবীর ভেতরেই এমন কিছু স্থান রয়ে গেছে, যাদের সম্পূর্ণ বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই।

সোকোত্রার ড্রাগনস ব্লাড ট্রি তাই শুধু একটি বিরল বৃক্ষ নয়। সে সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত প্রশ্ন। তার শাখার নিচে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষের সভ্যতা হয়তো পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় মাত্র। আমরা আসি, নাম লিখে যাই, চলে যাই। বৃক্ষটি থেকে যায়।
সমুদ্রের ওপারে সূর্য ডুবে যায়। পাহাড়ের গায়ে ছায়া দীর্ঘ হয়। কোনো এক অদৃশ্য বাতাস ড্রাগনস ব্লাড ট্রির পাতাগুলো নাড়িয়ে দেয়। মনে হয়, পৃথিবী তার প্রাচীনতম কোনো ভাষায় কথা বলছে। সেই ভাষা আমরা পুরোপুরি বুঝি না। হয়তো বোঝার প্রয়োজনও নেই।
কিছু দ্বীপের কাজ মানুষের কাছে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করা নয়। তাদের কাজ শুধু মনে করিয়ে দেওয়া—পৃথিবী এখনো আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বড়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









