জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারের নীতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে ফরাসি সরকার। যেকোনো ধরনের সহিংসতা কঠোর হাতে দমনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) হ্যালোইন উৎসবের দিন ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। এর আগে দুই সপ্তাহ আগে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে বহু দোকান, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শনিবারের পরিস্থিতিকে তিনি জনশৃঙ্খলার জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক ও বাস্তিল চত্বরের মধ্যকার নির্ধারিত বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ করেছে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত। ইউনিয়নগুলোর করা আপিলও খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। ফলে বিক্ষোভকারীদের শহরের পূর্ব প্রান্তের সড়কগুলোতে কর্মসূচি পালন করতে হবে। এতে প্যারিসের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
হ্যালোইন উপলক্ষে বিক্ষোভকারীরা মুখোশ পরে নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে পুলিশ। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে মুখ ঢেকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের রয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ১৫০টি সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও দেশটিতে অবস্থানরত নাগরিক ও ভ্রমণকারীদের বিক্ষোভ এবং বড় জমায়েতের এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা খাতে অসন্তোষ
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সের সংখ্যালঘু সরকার ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু করার পর বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়। দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে থাকায় সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের মুখে রয়েছে ম্যাক্রোঁ সরকার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবস্থা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ।
সরকার শিক্ষা খাতে সংস্কার এবং জ্বালানির ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বিক্ষোভকারীদের অসন্তোষ কমেনি। প্যারিসের উপকণ্ঠের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যারন বার্থিয়ে দ্য গ্রঁদ্রি বলেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে তরুণদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদ না থাকলে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ সংকটে পড়বে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়াচ্ছে বিক্ষোভ
ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। শনিবার জার্মানির ৩০টিরও বেশি শহরে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে চলমান অস্থিরতা দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলছে। আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে ম্যাক্রোঁর সম্ভাব্য মধ্যপন্থী উত্তরসূরিদের মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে।
বিক্ষোভের কারণে ফ্রান্সের অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের হিসাবে, বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ এক বিলিয়ন ইউরোর বেশি। বীমার আওতার বাইরে থাকা ক্ষয়ক্ষতি ও হারানো আয় যুক্ত করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ বিপণিবিতান ও সড়কগুলোতে আগের সহিংসতার চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মধ্যে হার্মিস, লুই ভিটন ও বারবেরির মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভের সময় ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রেখে একটি বিতর্কিত আইন এগিয়ে নিচ্ছে ফরাসি সরকার। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও কয়েকজন আইনজীবীর আশঙ্কা, এই আইনের ফলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









