শিল্পকর্ম চুরির প্রায় আট মাস পর ব্রাজিলে উদ্ধার হলো বিখ্যাত ফরাসি শিল্পী অঁরি মাতিসের আটটি দুর্লভ ইলাস্ট্রেশন। সাও পাওলোর একটি লাইব্রেরি থেকে চুরি যাওয়া এসব শিল্পকর্মের আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই লাখ মার্কিন ডলার। একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এগুলো উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে একই ঘটনায় চুরি যাওয়া ব্রাজিলের খ্যাতিমান শিল্পী কান্দিদো পোর্তিনারির পাঁচটি খোদাইচিত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
প্রদর্শনীর শেষ দিনে চুরি
ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। সাও পাওলোর ঐতিহাসিক ‘বিবলিওতেকা মারিও দে আন্দ্রাদে’-তে তখন চলছিল ‘ফ্রম বুক টু মিউজিয়াম’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর শেষ দিনেই সেখানে হামলা চালায় দুই চোর।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে লাইব্রেরির প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে ঢোকে তারা। নিরাপত্তারক্ষী এবং সেখানে আসা এক বয়স্ক দম্পতিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর প্রদর্শনী থেকে শিল্পকর্মগুলো নিয়ে বেরিয়ে যায়। চোরেরা শিল্পকর্মগুলো একটি ক্যানভাসের ব্যাগে ভরে হেঁটে কাছের মেট্রো স্টেশনের দিকে চলে যায়।
ঘটনার পর এ মামলায় আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
উদ্ধার হলো মাতিসের আটটি ইলাস্ট্রেশন
বৃহস্পতিবার সাও পাওলো শহরের দক্ষিণে অবস্থিত সাও বের্নার্দো দো কাম্পো এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকেই অঁরি মাতিসের আটটি ইলাস্ট্রেশন উদ্ধার করা হয়। এ সময় ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের ধারণা, গ্রেপ্তার হওয়া জোয়াও পাওলো লিনহারেস দে আরাউজো চুরি করা শিল্পকর্মগুলো চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের হয়ে গোপনে সংরক্ষণ করছিলেন। অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সংস্কৃতি বিভাগ জানিয়েছে, উদ্ধার করা মাতিসের শিল্পকর্মগুলো ইতিমধ্যে লাইব্রেরিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুরির ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
মাতিসের ‘জাজ’ বইয়ের জন্য তৈরি
উদ্ধার হওয়া শিল্পকর্মগুলো মাতিসের বিখ্যাত শিল্পগ্রন্থ ‘জাজ’-এর একটি সীমিত সংস্করণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বইটিতে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি এসব ইলাস্ট্রেশন তৈরি করেন।
বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী হিসেবে অঁরি মাতিসের অবস্থান শিল্পের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজের প্রতি শিল্পসংগ্রাহক ও জাদুঘরগুলোর আগ্রহও ব্যাপক। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া শিল্পকর্মগুলোর বাজারমূল্যের চেয়েও ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক বেশি—কেউ কেউ যার মূল্যকে ‘অমূল্য’ বলে মনে করছেন।
এখনো নিখোঁজ পোর্তিনারির পাঁচ কাজ
চুরির সময় মাতিসের কাজের পাশাপাশি ব্রাজিলের আধুনিক শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ‘কান্দিদো পোর্তিনারির*’ পাঁচটি খোদাইচিত্রও নিয়ে যায় চোরেরা।
এসব কাজ তৈরি হয়েছিল ব্রাজিলীয় লেখক হোসে লিন্স দো রেগোর উপন্যাস ‘প্লানটেশন বয়’-এর বিশেষ সংস্করণের জন্য।
পুলিশ জানিয়েছে, পোর্তিনারির পাঁচটি কাজ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তকারীদের ধারণা, চুরি করা এসব শিল্পকর্ম ইতিমধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
সন্দেহের কেন্দ্রে শিল্পচোর
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৩ বছর বয়সী লায়েসিও রদ্রিগেস দে অলিভেইরাকে এই চুরির মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। শিল্পকর্ম চুরির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এবং স্থানীয় গণমাধ্যম তাঁকে একজন ‘দুর্ধর্ষ শিল্পচোর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এপ্রিল থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
তদন্তকারীরা এখন উদ্ধার হওয়া মাতিসের কাজগুলোর পাশাপাশি নিখোঁজ পোর্তিনারির শিল্পকর্মগুলোর সন্ধানেও তদন্ত চালাচ্ছেন।
বই থেকে জাদুঘর, আবার বইয়ের কাছে
‘ফ্রম বুক টু মিউজিয়াম’ প্রদর্শনীতে একই সঙ্গে সাহিত্য ও চিত্রকলার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছিল। মাতিসের ‘জাজ’এবং পোর্তিনারির ‘প্লানটেশন বয়’-এর জন্য তৈরি কাজগুলো সেই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
প্রদর্শনীর শেষ দিনেই চুরি হয়ে যাওয়া এবং কয়েক মাস পর মাতিসের কাজগুলো উদ্ধার—পুরো ঘটনাটি শিল্পজগতের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে দুর্লভ ও ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কঠোর হওয়া প্রয়োজন, সেই আলোচনাও নতুন করে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া আটটি মাতিসের কাজ এখন আবার ফিরেছে সেই লাইব্রেরিতে, যেখান থেকে একদিন সেগুলো নিঃশব্দে হারিয়ে গিয়েছিল। তবে পোর্তিনারির পাঁচটি কাজের খোঁজ না মেলা পর্যন্ত এই শিল্পচুরির গল্পের শেষ অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









