একটি দেশ পেরিয়ে, নিজের অন্ধকারের দিকে গন্তব্য কোথায়—সে জানত না, কিংবা হয়তো জানত, কিন্তু সেই জানাটিকে উচ্চারণ করার মতো কোনো শব্দ তার কাছে ছিল না, কারণ কিছু কিছু যাত্রা শুরু হয় ঠিক তখনই, যখন মানুষ আর জানে না সে কোথা থেকে পালাচ্ছে এবং কোথায় গিয়ে থামতে চায়, আর সেই মুহূর্তে সামনে পড়ে থাকে শুধু রাস্তা, দীর্ঘ, একঘেয়ে, অসীম বলে মনে হওয়া রাস্তা, যার দুপাশে আমেরিকার দৃশ্যপট একের পর এক বদলে যায়, অথচ তার ভেতরে কিছুই বদলায় না।
পিটার হান্ডকের ‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’ সেই যাত্রার গল্প।
একজন তরুণ অস্ট্রীয়, নামহীন, বয়স তিরিশের কাছাকাছি, আমেরিকায় এসেছে। তার সঙ্গে খুব বেশি লাগেজ নেই। অর্থও সীমিত। কিন্তু তার মাথার ভেতরে এমন এক ভার আছে, যা কোনো স্যুটকেসে ভরা যায় না। জুডিথ—তার প্রাক্তন প্রেমিকা—তার জীবন থেকে সরে গেছে, অথবা সে জুডিথের জীবন থেকে পালিয়েছে; বিষয়টি স্পষ্ট নয়, কারণ সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর মানুষের কাছে প্রায়ই সবচেয়ে অস্পষ্ট হয়ে যায় সেই ঘটনাগুলো, যেগুলো তার জীবনকে সবচেয়ে বেশি বদলে দেয়।
তাদের একসঙ্গে আমেরিকা আসার পরিকল্পনা ভেঙে গেছে। এখন সে একা। এবং আমেরিকা তার সামনে। কিন্তু আমেরিকা যেন তাকে গ্রহণ করার জন্য তৈরি হয়নি।
গ্রেহাউন্ড বাস এগিয়ে যায় নিউ ইংল্যান্ডের মধ্য দিয়ে। জানালার কাচের ধূসর আভা বাইরের পৃথিবীকে আরও বিষণ্ন করে তোলে। রাস্তা, টোল স্টেশন, চালকের হাত, কয়েকটি মুদ্রা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ঠান্ডা বাতাস—সবকিছু এমনভাবে ঘটতে থাকে যেন কেউ বহু আগেই ঠিক করে রেখেছে কীভাবে একটি মানুষকে ধীরে ধীরে তার নিজের চিন্তার মধ্যে আটকে ফেলা যায়।

সে জানালা খুলতে চায়। কেউ তাকে বলে, জানালা খুললে এয়ার-কন্ডিশনিং নষ্ট হবে। সে জানালা বন্ধ করে। এই সামান্য ঘটনাটির মধ্যেই যেন তার সমগ্র যাত্রার একটি গোপন চিত্র তৈরি হয়ে যায়।
সে বাইরে যেতে চায়। কিন্তু তাকে বলা হয়, বাইরে যাওয়া যাবে না। সে দেখতে চায়। কিন্তু কাচের ওপারে পৃথিবী ইতিমধ্যেই ধূসর। সে এগিয়ে যায়। কিন্তু কোথাও পৌঁছায় না। রাত হলে সে মোটেলে আশ্রয় নেয়।
ঘরটি পরিষ্কার নয়। ছাদের রঙ বহুদিন নতুন করে করা হয়নি। পাখাটি ধীরে ধীরে ঘুরছে। শীতাতপযন্ত্রের শব্দ একটানা, প্রায় নিঃশ্বাসের মতো। সে বিছানায় শুয়ে থাকে, বই বন্ধ করে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং মনে হয়, সে নিজেকেই ঘুমিয়ে পড়তে দেখছে।
এই ‘নিজেকে দেখা’—এই বিচ্ছিন্নতা—হান্ডকের উপন্যাসের গভীরতম জায়গাগুলোর একটি। মানুষ নিজের জীবন যাপন করছে, অথচ একই সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে সেই জীবনটিকে দেখছে। সে ভ্রমণ করছে। সে চিন্তা করছে। সে লিখছে। কিন্তু সে যেন কোনো কিছুরই পুরোপুরি অংশ নয়।
আমেরিকা তার কাছে তখন একটি বাস্তব দেশ নয়; বরং একটি বিশাল, উজ্জ্বল, ভোগবাদী দৃশ্যপট, যেখানে দোকান আছে, গাড়ি আছে, মোটেল আছে, টেলিভিশন আছে, রাস্তা আছে, মানুষ আছে—কিন্তু তার নিজের জন্য কোনো জায়গা নেই।
আর যত সে এই বিশালতার মধ্যে ঢুকে যায়, ততই তার ভেতরের শূন্যতা বড় হতে থাকে। তারপর আসে সেই ফোনকল।অস্ট্রিয়ায়। মায়ের কাছে।
সে হোটেলের অপারেটরকে ফোন করে বলে, ইউরোপে কল করতে চায়। অপারেটর জিজ্ঞেস করে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবে, নাকি যে ফোন ধরবে তার সঙ্গেই কথা বলবে। দ্বিতীয়টি সস্তা।
এই সামান্য অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে হঠাৎ তার সমগ্র নির্বাসন যেন ধরা পড়ে যায়। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগও এখানে হিসাবের ব্যাপার।
দূরত্বেরও মূল্য আছে। ঘরে ফেরারও মূল্য আছে। এবং কখনো কখনো সবচেয়ে প্রিয় মানুষের কণ্ঠ শোনার জন্যও টাকা খরচ করতে হয়।
সে ফোন করে। কিন্তু ফোন তাকে ফিরিয়ে নেয় না।
অন্য প্রান্তে হয়তো তার মা আছেন, সেই বাড়ি আছে, সেই গ্রাম আছে, সেই ইউরোপ আছে—কিন্তু সে সেখানে আর ফিরে যেতে পারছে না। ভ্রমণের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, একবার চলে গেলে মানুষ শুধু স্থান পরিবর্তন করে না; সে নিজের পুরোনো পরিচয় থেকেও একটু একটু করে দূরে সরে যায়।
তারপর ক্লেয়ারের কথা মনে পড়ে। মধ্য-পশ্চিমে থাকা পুরোনো প্রেমিকা। এবার প্রথমবারের মতো তার সামনে একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন তৈরি হয়। সে রওনা হয়। ক্যাবের ভাড়া ঠিক করে। নাশতা করে। পথে থামে। একটি ডিসকাউন্টের দোকান থেকে শিশুর জন্য হারমোনিকা কেনে। পোলারয়েড ক্যামেরার ফিল্ম কেনে। ছোট ছোট জিনিস।
এই জিনিসগুলো হয়তো তুচ্ছ। কিন্তু মানুষের জীবন কি শেষ পর্যন্ত এমন তুচ্ছ জিনিস দিয়েই তৈরি নয়? একটি খেলনা। একটি বই। একটি ফোন নম্বর। একটি হোটেলের রসিদ। একটি পুরোনো ছবি। একটি অপ্রেরিত চিঠি। আর কখনো কখনো একটি উপহার, যা কাউকে দেওয়া হয়নি।
কিন্তু ক্লেয়ারের দিকে যাত্রা শুরু করেও সে নিজের কাছ থেকে পালাতে পারে না।
তার মনে পড়ে যায় সেই ভাইয়ের কথা, যে কোনো একদিন তাদের গ্রাম ছেড়ে আমেরিকায় চলে এসেছিল। কাউকে কিছু না বলে। বাবা-মাকে না জানিয়ে। যেন চাইলেই একটি মানুষ হঠাৎ নিজের জীবন থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
এই হারিয়ে যাওয়া ভাই যেন নায়কের নিজের ভবিষ্যতেরও একটি সম্ভাব্য ছবি। সে কি নিজেও একইভাবে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে? সে কি আমেরিকায় এসে নিজের পুরোনো জীবনকে ফেলে দিয়েছে? নাকি সে শুধু তার ভাইয়ের পদচিহ্ন অনুসরণ করছে?

প্রশ্নগুলো উত্তর চায় না। বরং আরও প্রশ্ন তৈরি করে। আর তখন তার লেখালেখির সংকট সামনে আসে। সে লেখক। কিন্তু যা লিখেছে, তা কি সত্যিই কিছু? শব্দগুলো কি তার নিজের? গল্পগুলো কি তার জীবনের? নাকি সে কেবল এমন কিছু লিখে গেছে, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না?
একজন লেখকের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত হয়তো তখনই আসে, যখন সে নিজের লেখা থেকে নিজেকেই বিচ্ছিন্ন দেখতে পায়। হান্ডকের নিজের জীবনও তখন গভীর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭১ সালে তার মা আত্মহত্যা করেন। শৈশবের পারিবারিক সহিংসতা এবং সেই মৃত্যুর অভিঘাত তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। এর পরের বছরই তিনি লিখলেন ‘এ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’—মায়ের জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে এক গভীর ব্যক্তিগত রচনা।
এই অন্ধকারের মধ্যেই জন্ম নেয় ‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’।
তাই আমেরিকার রাস্তাগুলো যতই উজ্জ্বল হোক, এই বইয়ের ভেতরে সবসময় একটি অন্য ভূগোল উপস্থিত থাকে। অস্ট্রিয়া।একটি গ্রাম। একটি পরিবার। একজন মা। একজন হারিয়ে যাওয়া ভাই। একটি শেষ হয়ে যাওয়া প্রেম। এবং একজন মানুষ, যে বুঝতে পারছে না কীভাবে নিজের জীবনটিকে আবার শুরু করা যায়।
তবু রাস্তা থামে না। আমেরিকা এগিয়ে চলে। শহর বদলায়। ট্রেন বদলায়। হোটেল বদলায়। মানুষ বদলায়। শুধু তার ভেতরের প্রশ্নটি বদলায় না।
জীবনে আসলে কী গুরুত্বপূর্ণ?
সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছায়। সেখানে তার দেখা হয় জন ফোর্ডের সঙ্গে। বৃদ্ধ হলিউড পরিচালক। একজন কিংবদন্তি। একজন মানুষ, যিনি আমেরিকার পশ্চিমকে সিনেমার ভাষায় পৃথিবীর সামনে নির্মাণ করেছেন। তরুণ অস্ট্রীয় লেখক তখন দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষের সামনে, যার চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সে আমেরিকাকে আগে থেকেই চিনেছে।
এ যেন বাস্তব আমেরিকার সঙ্গে তার কল্পনার আমেরিকার মুখোমুখি হওয়া। যে দেশটিকে সে সিনেমায় দেখেছিল, সেটি কি সত্যিই এই দেশ? নাকি সিনেমাই তাকে এই দেশ সম্পর্কে একটি স্বপ্ন দেখিয়েছে?
হান্ডকের আমেরিকা তাই একই সঙ্গে বাস্তব এবং কল্পিত।
একটি রাস্তা। একটি সিনেমা। একটি পালানো। একটি অনুসন্ধান। একটি স্বপ্ন। এবং সেই স্বপ্নের নিচে ক্রমশ জমতে থাকা বিষণ্নতা। ‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’ আসলে একটি রোড মুভি, কিন্তু গাড়ির চাকা যতটা পথ পেরোয়, মানুষের মন তার চেয়ে অনেক বেশি পথ পেরোয়।
সে জুডিথ থেকে পালায়। ভাইকে খোঁজে। ক্লেয়ারের কাছে যায়। জন ফোর্ডের সঙ্গে দেখা করে। হোটেলে ঘুমায়। ট্রেনে ওঠে। বাসে চড়ে। ফোন করে। বই পড়ে। আর এইসব করতে করতে বুঝতে শুরু করে—গন্তব্য কোনো শহর নয়। গন্তব্য হয়তো সেই মানুষটি, যাকে সে এতদিন ধরে নিজের ভেতর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।
এই কারণে ‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’-এর ‘বিদায়’ যতটা জুডিথকে, ততটাই তার নিজের পুরোনো জীবনকে।
চিঠিটি ছোট। বিদায়টি দীর্ঘ। এবং সেই বিদায়ের কোনো শেষ নেই।
কারণ মানুষ যখন একটি জীবন থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সে সেই জীবনটিকে পেছনে ফেলে যায় না; বরং সেটিকে সঙ্গে নিয়ে নতুন রাস্তায় হাঁটে।
রাস্তা সামনে থাকে। পৃথিবী বিশাল থাকে। বাস চলতে থাকে। পাখা ঘুরতে থাকে। শীতাতপযন্ত্রের মৃদু শব্দ অন্ধকার ঘরে ভেসে থাকে। আর একজন মানুষ, যে ভেবেছিল সে অন্য কোথাও যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—
সে আসলে কোথাও যাচ্ছে না। সে শুধু নিজের আরও গভীরে নেমে যাচ্ছে।

সিসিলিয়া ড্রয়মুলারের সঙ্গে কথোপকথন
প্যারিস আর ভার্সাইয়ের মাঝখানে, চেস্টনাট গাছের নিচে ঘেরা একটি বাড়ি, যেখানে বাতাস এলে পাতাগুলো নড়ে কিন্তু বাড়িটির ভেতরে যেন সময় নড়ে না, সেখানে বসেছিলেন পেটার হান্ডকে। বাইরে পৃথিবী তখনও তার নাম নিয়ে কথা বলছে, তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তর্ক করছে, সার্বিয়া নিয়ে তার বক্তব্যকে কেউ অপরাধ বলছে, কেউ বলেছে সাহসী, কেউ আবার তার সাহিত্যকেও সেই বিতর্কের সঙ্গে এক করে দেখছে। কিন্তু ঘরের ভেতরে বসে থাকা মানুষটি ছিলেন শান্ত, প্রায় নীরব, তার কণ্ঠ এত নিচু যে কথাগুলো শুনতে হলে ঝুঁকে পড়তে হয়।
১৯৪২ সালে অস্ট্রিয়ার গ্রিফেনে জন্ম নেওয়া হান্ডকে তখন অনেক দূর পথ পেরিয়ে এসেছেন। তার বইয়ের মধ্যে ভ্রমণ আছে, যুদ্ধ আছে, স্মৃতি আছে, ধর্ম আছে, পূর্বপুরুষ আছে, আর আছে এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ কখনো কোনো গন্তব্যে পৌঁছায় না, শুধু হাঁটতে থাকে।
২০১১ সালের ৫ নভেম্বর সাহিত্যসমালোচক ও অনুবাদক সিসিলিয়া ড্রয়মুলার পেটার হান্ডকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই কথোপকথন যেন ধীরে ধীরে একটি পুরোনো দরজা খুলে দিয়েছিল। দরজার ওপারে দেখা যায় শৈশব, ভাষা, বলকান, স্রষ্টা এবং একজন লেখকের দীর্ঘ পথচলা।
প্রশ্ন:
১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এত দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার কারণ কী ছিল?
পিটার হান্ডকে:
আসলে আমার থাকার মতো কোনো জায়গা ছিল না। কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো এমন সাধারণ কথার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আমি সালজবুর্গের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। আমার প্রথম মেয়ে পড়াশোনার জন্য ভিয়েনায় চলে গেল। হঠাৎ মনে হলো, এতদিন যে স্বপ্নটি আমার ভেতরে চুপ করে পড়ে ছিল, এবার হয়তো তাকে জাগানো যায়।
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাব। কোনো স্থায়ী ঠিকানা থাকবে না। এক বছর নয়, কয়েক মাস নয়—বছরের পর বছর। শেষ পর্যন্ত আড়াই বছর ধরে ঘুরেছিলাম।
প্রশ্ন:
আপনার বই পড়লে মনে হয়, এই ভ্রমণের মধ্যে শান্তি ও নির্জনতা খোঁজার একটি প্রবল ইচ্ছা ছিল। ভ্রমণের মধ্যে সেই শান্তি কীভাবে পেলেন?
পিটার হান্ডকে:
মধ্যযুগের মানসিক রোগীদের নিয়ে একটি গল্প আছে। কেউ যখন খুব উত্তেজিত বা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠত, তাকে একটি নৌকায় তুলে দেওয়া হতো। নৌকাটি নদীর ওপর ভাসত, দুলত, আর সেই দোলার মধ্যে মানুষটি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যেত। আমার কাছে ভ্রমণও কিছুটা তেমন।
নৌকা যেমন মানুষকে এক জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি ভ্রমণও মানুষকে তার নিজের জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়। আর কখনো কখনো সেই সরে যাওয়া থেকেই শান্তি আসে। তাই আমার কাছে ভ্রমণ আর শান্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
অবশ্য একটি কথা গুরুত্বপূর্ণ—আমি নিজের টাকায় ভ্রমণ করেছি।

প্রশ্ন:
ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সের রোমানেস্ক গির্জা ও মঠ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণগুলো গুরুত্বপূর্ণ। মনে হয়, এই ভ্রমণটি একই সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার দিকেও একটি যাত্রা ছিল।
পিটার হান্ডকে:
‘আধ্যাত্মিকতা’ শব্দটি খুব বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। শব্দটি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি যেন দূরে সরে যায়। তবে আত্মার দিকে যাত্রা—হ্যাঁ, সেটা বলা যায়।
গ্যোটে যখন ইতালি ভ্রমণ করেছিলেন, তখন ভেরোনা কিংবা সান জেনোর রোমানেস্ক মূর্তিগুলো দেখে তিনি ভয় পেয়েছিলেন, বিরক্ত হয়েছিলেন। এমনকি সেগুলোকে ব্যঙ্গচিত্রও বলেছিলেন।
আমি তার বিপরীত কিছু অনুভব করি।
রোমানেস্ক শিল্পের মূর্তিগুলো আমাকে টানে। তাদের শরীরের ভঙ্গি, একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, তাদের স্থিরতা—সবকিছুতে এক ধরনের স্বপ্ন আছে। গথিক শিল্পে সবকিছু যেন একটি তীরের মতো আকাশের দিকে উঠে যায়। সেখানে পৃথিবী ছেড়ে আকাশের দিকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে।
রোমানেস্ক শিল্পে সবকিছু মাটির ওপর থাকে। তবু সেই মাটির ওপর দাঁড়িয়েই আপনি আকাশ অনুভব করেন। সোরিয়ার সান্তো দোমিঙ্গোর গির্জার সম্মুখভাগ আমার কাছে তখন বিশুদ্ধ সংগীতের মতো মনে হয়েছিল।
প্রশ্ন:
রোমানেস্ক মূর্তিগুলোর সঙ্গে আপনার বইয়ে বাইবেলের উদ্ধৃতি, ঈশ্বর ও ঐশ্বরিক বিষয় নিয়ে অনেক ভাবনা আছে। তাহলে কি এই ভ্রমণ ছিল ক্যাথলিক ধর্মের শিকড় খোঁজার এক ধর্মীয় অনুসন্ধান?
পিটার হান্ডকে:
না। আমি ধর্মের শিকড় খুঁজছিলাম না। আমি খুঁজছিলাম একজন মানুষকে কীভাবে বর্ণনা করা যায়। একজন মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছানো যায়। বাস্তব মানুষকে বাস্তবতার নিয়মে বর্ণনা করার পদ্ধতি আমার ভালো লাগে না। উনিশ শতকের বড় লেখকরাও এই পদ্ধতিতে লিখেছেন—স্তাঁদাল, ফ্লবেয়ার, আবার অন্যভাবে তলস্তয় ও দস্তয়েভস্কি।
তারা বড় লেখক। কিন্তু তাদের পদ্ধতি আমার নয়। আমি রোমানেস্ক শিল্পের মতো স্পষ্ট রেখা পছন্দ করি। প্রথমে একটি রেখা থাকবে। সেই রেখা মানুষটির একটি আকার তৈরি করবে। তারপর সেই আকারের ভেতরে পাঠক নিজেই ঢুকবেন।
আমি অন্য এক ধরনের মহাকাব্য খুঁজছিলাম। মধ্যযুগীয় মহাকাব্য পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিল, সেখানে মানুষকে ব্যাখ্যা করা হয় না, বরং তার মধ্যে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়।
আমি ‘মাই ইয়ার ইন দ্য নো-ম্যান্স বে’, ‘ক্রসিং দ্য সিয়েরা দে গ্রেদোস’ এবং ‘অ্যাট নাইট ওভার দ্য রিভার মোরাভা’-তেও সেই পুরোনো মহাকাব্যের অনুভূতিকে আমাদের সময়ে নিয়ে আসতে চেয়েছি।
আমার কাছে এগুলো উপন্যাসের চেয়ে মহাকাব্যের কাছাকাছি। আমি উপন্যাসকে যতটা বিশ্বাস করি, মহাকাব্যকে তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস করি—সেই গল্পকে, যা অনেক দূর থেকে আসে, যার মধ্যে সময়ের গন্ধ থাকে, এবং যা আবার দূরের দিকেই চলে যায়। এই কারণেই আমি মনস্তাত্ত্বিক লেখার বিরোধী।
প্রশ্ন:
‘ট্র্যাভেলিং ইয়েস্টারড’-এ আপনি লিখেছেন, ‘উপযুক্ত জায়গা, উপযুক্ত সময় ও উপযুক্ত আলোয় চলাফেরা করলে পৃথিবী আবার একটি গল্প হয়ে ওঠে।’ আপনি কি রোমান্টিক?
পিটার হান্ডকে:
জানি না। হয়তো কিছুটা। কিন্তু আমাকে ক্লাসিকও হতে হয়। তবে এমন ক্লাসিক নয়, যে নিজের চারপাশে দেয়াল তুলে আবদ্ধ থাকতে হয়।
আমি সম্প্রতি গ্যোটের ‘ভিলহেল্ম মাইস্টার্স অ্যাপ্রেন্টিসশিপ’ পড়েছি। বইটি আমার কাছে প্রায় ভয়ংকর মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, গ্যোটে এমন একটি ঐক্য তৈরি করেছেন, যা পৃথিবীর বাস্তবতায় নেই। তখন আমি বুঝতে পারলাম, রোমান্টিকদের খণ্ডিত লেখার প্রয়োজন ছিল।
নোভালিস, ক্লাইস্ট, আইখেনডর্ফ—তারা অনেক কিছু অসম্পূর্ণ রেখেছেন। তারা সবকিছুকে জোর করে এক জায়গায় এনে সম্পূর্ণ করেননি।

তারা ফাঁক রেখেছেন। আর সেই ফাঁকের মধ্য দিয়েই অন্য কিছু প্রবেশ করতে পারে। এই কারণে এখনকার সময়ে বেঁচে থাকতে আমার ভালো লাগে। সবকিছু এখন আর প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা হয় না। আমিও করি না।
প্রশ্ন:
আপনার বইয়ে আপনি মানবজাতির জন্য একটি ‘ট্রাউমবার্কে’—স্বপ্নের নৌকা—চেয়েছেন। এর চেয়ে বেশি রোমান্টিক চিন্তা আর কী হতে পারে?
পিটার হান্ডকে:
মাঝে মাঝে আমার রোমান্টিক মুহূর্ত আসে। কিন্তু আমি নিজেকে পুরোপুরি তাদের হাতে তুলে দিই না। যদিও কখনো কখনো দেওয়া উচিত। আমি প্রায়ই বলি, সত্যিকারের ভালো সাহিত্য অনেকটা একটি জনপ্রিয় গানের মতো। আপনি গানটি শুনবেন, আর বুঝতে পারবেন না কেন সেটি আপনার ভেতরে এতক্ষণ থেকে গেল।
প্রশ্ন:
আপনার বইয়ের এই লেখাগুলোতে মনে হয় আপনি খুব কঠিন এক শিক্ষানবিশির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
পিটার হান্ডকে:
হ্যাঁ। আমি পৃথিবীর ছন্দের সঙ্গে চলি। নিজের ঢোলের তালে হাঁটি না। বরং পৃথিবী যে ছন্দে চলছে, তার সঙ্গে নিজের হাঁটাকে মিলিয়ে নিই। আমি যা দেখি, তার সঙ্গে চলি। যা আমার ভেতরে ঢোকে, আমি তা আবার বাইরে পাঠাই। আমার কাছে এটাই স্বাভাবিক।
আমি যা পড়ি, তা থেকেও শিখি। আর যত বেশি পড়ি, তত বুঝি—আমার শেখার এখনও কত বাকি।
প্রশ্ন:
বইয়ের প্রথম অংশে আপনি শান্তি খুঁজছেন। এরপর আপনার লক্ষ্য হয়ে উঠছে নিজেকে আরও উন্মুক্ত করা।
পিটার হান্ডকে:
উন্মুক্ত থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখক যেন একটি চলমান মানুষের মতো হন, যার ভেতর দিয়ে পৃথিবীর নানা জিনিস প্রবেশ করে, কিছুক্ষণ থাকে, তারপর আবার বেরিয়ে যায়।
কিন্তু কে সত্যিই এমন হতে পেরেছেন? জানি না। কখনো হোমার। কখনো জর্জ সিমেনোঁ। কখনো উইলিয়াম ফকনার সাহিত্য আসলে সামনে এগোয় না। তার রূপ বদলায়।
এখন আর সিমেনোঁর মতো লেখা সম্ভব নয়। অনেক আগে আমি বলেছিলাম, আহা, যদি চেখভের মতো লিখতে পারতাম! তার মতো গল্প, তার মতো নাটক। তখন কেউ আমাকে বলেছিল, ‘চেখভের মতো লেখার আর প্রয়োজন নেই। চেখভ তো আছেন। তিনি তোমাকে তার পৃথিবী দিয়ে গেছেন, তার ছন্দ দিয়ে গেছেন, তার গতি দিয়ে গেছেন। তুমি বরং দেখো, চেখভ তোমার ভেতরে কী রেখে গেছেন।’ সেই কথা আমি মনে রেখেছি।
একজন বড় লেখক তার পরের লেখকদের পথ বন্ধ করে দেন, কিন্তু সেই বন্ধ পথই তাদের অন্য পথ খুঁজতে বাধ্য করে থমাস বার্নহার্ডের মতো লেখককে সহজে অনুকরণ করা যায়। কিন্তু যে লেখককে খুব সহজে নকল করা যায়, গভীর অর্থে সে হয়তো বড় লেখক নয়।

প্রশ্ন:
আপনার এই বিস্তৃত বিশ্বদৃষ্টি, পূর্ব ও পশ্চিমের জ্ঞান কোথা থেকে এলো?
পিটার হান্ডকে:
বোকামি থেকে। আমি কোনো আন্তর্জাতিক লেখক নই। আমি গ্রামের মানুষ। আমি যে জায়গা থেকে এসেছি, সেখানে বৌদ্ধরাও ছিল, যদিও কেউ তাদের বৌদ্ধ বলে ডাকত না। একজন মুয়াজ্জিন ছিল, একটি মিনার ছিল—যদিও বাস্তবে হয়তো ছিল না। ভারতীয়রাও ছিল। একটি শিশুর কল্পনার জন্য যতটুকু পৃথিবী দরকার, আমার ছোট জায়গাটির মধ্যে সেটুকু ছিল সবকিছু এসেছে আমার জন্মস্থান থেকে, আমার বাবা-মা থেকে, আমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে।
মানুষ অবশ্য নিজেকেও তৈরি করে। কিন্তু কেউই পুরোপুরি নিজেকে তৈরি করতে পারে না। একসময় ভাবতাম, কেন আমি উইলিয়াম ফকনারের মতো মিসিসিপির তীরে জন্মালাম না? এখন বুঝি, আমার শৈশবের ছোট ছোট ঝরনাগুলোই ছিল আমার মিসিসিপি।
বিশ বছর বয়সে যখন থমাস উলফ, শেরউড অ্যান্ডারসন, ড্রাইজার কিংবা স্টেইনবেক পড়তাম, মনে হতো—তাদের পৃথিবী কত বড়, আর আমার পৃথিবী কত ছোট। এখন বুঝি, সেই লেখকরাই তাদের লেখার মধ্যে সেই বিশাল পৃথিবী তৈরি করেছিলেন। আমাকেও আমার নিজের পৃথিবী তৈরি করতে হবে। আমার জানা ছন্দে। আমার পক্ষে যে ছন্দ তৈরি করা সম্ভব, সেই ছন্দে।
পৃথিবীটি আসলে আমার কাছেই ছিল। আমি শুধু তাকে দেখতে পাইনি। কারণ আমার ভেতরে একজন মহান মানুষের স্বপ্ন ছিল। তাই নিজের শহরের মানুষগুলোকে আমি ছোট মনে করতাম। এখন জানি, তারা ছোট ছিল না। ছোট ছিল আমার চোখ।
প্রশ্ন:
সীমান্ত অঞ্চলে আপনার শৈশব ভাষার দ্বারাও চিহ্নিত হয়েছিল।
পিটার হান্ডকে:
হ্যাঁ। বাড়িতে আমরা কারিন্থিয়ার স্লোভেনীয় উপভাষায় কথা বলতাম। আমার মা বিশুদ্ধ স্লোভেনীয় ভাষায় কথা বলতেন।আমি কম বলতাম। কিন্তু আমাদের শহর থেকে মাত্র এক মাইল দূরে স্লোভেনীয় ভাষায় কথা বলা পছন্দ করা হতো না। তৃতীয় রাইখের সময় সেখানে কঠোর নাৎসি শাসন ছিল। স্লোভেনীয় ভাষা নিষিদ্ধ ছিল। আমাদের গ্রামেও মানুষকে নির্বাসনে পাঠানোর ভয় ছিল। কিছু কৃষককে বাড়ি থেকে সরিয়ে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। পরে জার্মান ও টাইরোলীয় কৃষকদের এনে সেখানে বসানো হয়।
ভাষা তখন শুধু ভাষা ছিল না। একটি ভাষা বলা মানে কখনো কখনো নিজের অস্তিত্বকে বিপদের সামনে দাঁড় করানো।
প্রশ্ন:
আপনার নাটক ‘স্টিল স্টর্ম’-এ আপনি পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খুব কম মানুষ জানে, নাৎসি জার্মানির ভেতরে একমাত্র সশস্ত্র প্রতিরোধগুলোর একটি পরিচালিত হয়েছিল স্লোভেনীয় ভাষাভাষী অস্ট্রীয়দের নেতৃত্বে।
পিটার হান্ডকে:
হ্যাঁ, দক্ষিণ কারিন্থিয়ার পাহাড়ে সেই প্রতিরোধ হয়েছিল। এ নিয়ে মানুষ কথা বলতে শুরু করেছে খুব বেশি দিন হয়নি সম্ভবত পরিবারের ভেতরের কষ্ট এত গভীর ছিল যে তারা কথা বলতে পারেনি। আর যারা তাদের পাশে ছিল, তারাও সাহায্য করেনি। বরং তাদের ‘দস্যু’ বলা হয়েছিল—যেমন হিটলারের লোকেরা বলত। যুদ্ধ শুধু দেশের মাঝখানে বিভাজন তৈরি করেনি। পরিবারের মাঝখানেও রেখা টেনে দিয়েছিল।
কারিন্থিয়ায় নাৎসিদের হাতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছিল স্থানীয় মানুষ। স্লোভেনীয়, ক্রোয়াট, সার্ব, গ্রিক, ফরাসি—অনেককেই নানা নোংরা কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর কখনো কখনো স্লোভেনীয়রাই নিজেদের ভাই-বোনকে হত্যা করেছিল। এটি ছিল একটি ট্র্যাজেডি। একটি এমন ট্র্যাজেডি, যার শেষ কোথায়, তা বোঝা কঠিন।
প্রশ্ন:
এই পূর্বপুরুষদের ইতিহাস নিশ্চয়ই যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে আপনার সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে?
পিটার হান্ডকে:
অবশ্যই। আমার মা প্রায়ই তার বড় ভাইয়ের কথা বলতেন। তিনি ফলের চাষ করতেন। আমার ভেতর যেন ভালোবাসার অনেক গল্প জমে আছে, কারণ মা তার দুই ভাইয়ের কথা বলতেন। তারা হিটলারের জন্য প্রাণ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, অথচ হৃদয়ে তারা যুগোস্লাভিয়ার কাছাকাছি ছিলেন। আর সেই বড় ভাই মারিবোরে চলে গিয়েছিলেন—স্লোভেনিয়ার সেই শহরে, যা ছিল আমাদের সবচেয়ে কাছের যুগোস্লাভ শহর। অনেক প্রমাণ আছে যে তিনি আমার পরিবারকে যুগোস্লাভদের পক্ষ নেওয়ার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন।
এই গল্পগুলো আমার ভেতরে থেকে গেছে। যেমন থেকে যায় কোনো পুরোনো ঘরের গন্ধ। যেমন থেকে যায় মৃত মানুষের কণ্ঠ।
প্রশ্ন:
‘ট্র্যাভেলিং ইয়েস্টারডে’-এ ১৯৮৯ সালে আপনি লিখেছিলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড আছে এমন আর কোনো দেশকে প্রশ্ন করা হচ্ছে না। তোমাদের যুগোস্লাভিয়ার কী হলো?’
পিটার হান্ডকে:
১৯৮৯ সালে যুগোস্লাভিয়ায় মৃত্যুদণ্ড ছিল। কিন্তু ১৯৮০ সালে টিটোর মৃত্যুর পর আর কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি—এটা আমি পরে জানতে পেরেছিলাম। তখন সংবাদপত্রে মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার দাবি উঠেছিল, যেমন ফ্রান্সে করা হয়েছিল। কিন্তু সেই একই ফ্রান্স অন্য দেশের ওপর বোমা ফেলছিল। সেটিও তো এক ধরনের মৃত্যুদণ্ড। শুধু আমরা তার নাম অন্য কিছু দিই।
আজকের গণতন্ত্রগুলো দেশের ভেতরে এক রকম আচরণ করে, দেশের বাইরে আরেক রকম। তারা নিজেদের মানবিক বলে। কিন্তু তাদের হাতেও সহিংসতা ঘটে। আমার মনে হয়, আমরা ভণ্ডামির যুগে বাস করছি। আগে সহিংসতা ছিল সরাসরি। এখন তার ওপর একটি মিষ্টি আবরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভেতরের সহিংসতা এখনও একই রকম। হয়তো আরও ভয়ংকর।
প্রশ্ন:
বলকান অঞ্চল কি এখন আপনার কাছে তার পুরোনো রহস্য হারিয়েছে?
পিটার হান্ডকে:
না। কখনোই না। যেসব দেশকে আমরা সহজে ‘সাবেক যুগোস্লাভিয়া’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই, সেগুলো এখনও আমার কাছে প্রিয়। এবং একই সঙ্গে ভয়াবহ। আমি তাদের স্তাঁদালের মতো করে দেখাতে চাই—হালকা হাতে, সৌন্দর্যের সঙ্গে, কিন্তু বেদনা ছাড়া নয়। হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি ছাড়া নয়।
এরা ট্র্যাজিক জাতি। আলবেনীয়রা, সার্বরা, বসনিয়ার মুসলমানরা—সবাই। ক্রোয়াটরাও, যদিও এখন কিছুটা কম। তাদের ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের নাড়া দেয়। প্রত্যেকটির গল্প বলা দরকার।
‘আস্কিং থ্রু দ্য টিয়ার্স’-এর ‘দ্য ট্যাবলাস অব দাইমিয়েল’ অংশে আমি শরণার্থী শিবিরগুলোর কথা লিখেছি। তখন দশ লাখেরও বেশি মানুষ ঘর হারিয়েছিল। সার্বিয়া শরণার্থীতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।ক্রোয়েশিয়ার অবস্থাও ভালো ছিল না।
প্রশ্ন:
আপনি কি এখনও মনে করেন মিলোশেভিচ একজন ট্র্যাজিক চরিত্র ছিলেন?
পিটার হান্ডকে:
এই বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। আমি যখনই কথা বলি, আমার কথার সঙ্গে এমন উদ্দেশ্য জুড়ে দেওয়া হয়, যা আমার ছিল না। আমি ক্লান্ত।
প্রশ্ন:
আপনার বইয়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে, বিশেষ করে নিউ টেস্টামেন্ট নিয়ে, বারবার ভাবনা এসেছে। আপনার কাছে খ্রিস্টের অর্থ কী?
পিটার হান্ডকে:
গসপেলগুলো অসাধারণ গল্প।
প্রশ্ন:
আপনার আরেকটি জায়গা উদ্ধৃত করি—‘যিশুর গল্প যেন আবিষ্কারের এক নাটকীয় ইতিহাস। নিজের মধ্যেই ঐশ্বরিকতার আবিষ্কার।’
পিটার হান্ডকে:
হ্যাঁ। হোল্ডারলিন হয়তো এমন কথা বলতে পারতেন। তিনি মানুষের ভেতরে থাকা ‘দরিদ্র ঈশ্বর’-এর কথা বলেছিলেন আমাদের চেষ্টা করতে হবে, যাতে সেই ঈশ্বর মানুষের ভেতরে দরিদ্র ও পরিত্যক্ত হয়ে না থাকেন। এটি বাস্তব। এটি আমাদের অস্তিত্বেরই অংশ। আমরা আরও ভালো হতে পারি।কিন্তু আমাদের জীবনযাপনের গতি, আমাদের অবিরাম ছুটে চলা, আর সবচেয়ে বেশি—আমরা নিজেরাই, সেই সম্ভাবনাটিকে আটকে রাখি।
আমরা ছুটি। আর ছুটতে ছুটতে অনেক কিছু দেখতে পাই না।
প্রশ্ন:
আপনি অর্থডক্স চার্চে ধর্মান্তরিত হলেন কেন?
পিটার হান্ডকে:
কারণ সেখানে শ্রেণিবিন্যাস এত শক্ত নয়, এত চোখে পড়ে না। একবার সার্বিয়ায় একজন প্যাট্রিয়ার্কের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন খুব ছোটখাটো একজন মানুষ। তাকে দেখে মনে হয়নি তিনি কোনো বিশাল চার্চের প্রধান। অন্যদিকে মানুষ কখনো কখনো একজন নেতাকে চায়। পোপের মতো একজনকে।
মানুষ যখন নিজেকে একা মনে করে, যখন পৃথিবী তাকে ছেড়ে দিয়েছে বলে মনে হয়, তখন সে একজন পিতার বিকল্প খুঁজতে থাকে। তবে আমি অর্থডক্স ধর্মের প্রচারক নই।
আর যারা নিজেদের নাস্তিক বলে গর্ব করে, তাদের প্রতিও আমার খুব একটা আগ্রহ নেই। তাদের কিছুটা হাস্যকর মনে হয়।যে মানুষ বলে সে কোনো কিছুর ওপর বিশ্বাস করে, তার ওপর আমার বরং বেশি আস্থা আছে। হয়তো আমরা যে ছন্দে এখন বেঁচে আছি, তার বাইরে আরেকটি ছন্দ আছে। আরেকটি আলো আছে।
‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’ থেকে আমার বইগুলোর ভেতর সেই অন্য ছন্দটি চলে আসছে। আমাদের এ নিয়ে বেশি কথা বলার দরকার নেই। আমাদের সে ছন্দটিকে জীবনে অনুশীলন করা দরকার।
পরিচিতি:
পেটার হান্ডকে/ পিটার হান্ডকে জন্মেছিলেন ১৯৪২ সালের ৬ ডিসেম্বর, অস্ট্রিয়ার দক্ষিণের ছোট্ট গ্রিফেন গ্রামে। তার মা মারিয়া ছিলেন স্লোভেনীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ; বাবার সঙ্গে তার দেখা হয় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। যুদ্ধ, সীমান্ত, ভাষা আর শৈশবের সেই দ্বিধাময় ভূগোল পরবর্তী জীবনে হান্টকের সাহিত্যের গভীরে থেকে যায়।
গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে শুরু করলেও সাহিত্য তাকে অন্যদিকে টেনে নেয়। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য হর্নেটস’ দিয়ে তার সাহিত্যজীবনের শুরু। একই সময় ‘অফেন্ডিং দ্য অডিয়েন্স’ নাটকটি প্রচলিত থিয়েটারের ধারণাকে যেন দরজা খুলে বাইরে ফেলে দেয়। পরে ‘কাসপার’, ‘দ্য গোয়ালিজ অ্যাংজাইটি অ্যাট দ্য পেনাল্টি কিক’, ‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’, ‘এ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’, ‘দ্য রিপিটিশন’, ‘স্লো হোমকামিং’ এবং ‘মাই ইয়ার ইন দ্য নো-ম্যানস বে’ তাকে ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র লেখকে পরিণত করে। তিনি উপন্যাসের পাশাপাশি নাটক, কবিতা, প্রবন্ধ, দিনলিপি, অনুবাদ ও চিত্রনাট্য লিখেছেন; উইম ভেন্ডার্সের ‘উইংস অব ডিজায়ার’-এর চিত্রনাট্যও তার উল্লেখযোগ্য কাজ।
পিটার হান্ডকে জর্জ বুখনার পুরস্কার (১৯৭৩), ভিলেনিৎসা আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার, আন্তর্জাতিক ইবসেন পুরস্কার (২০১৪), নেস্ট্রয় থিয়েটার পুরস্কারসহ বহু সম্মান পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে আসে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি—সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। সুইডিশ একাডেমি তাকে পুরস্কার দেয় “ভাষাগত উদ্ভাবনশীলতার মাধ্যমে মানব-অভিজ্ঞতার প্রান্তিকতা ও বিশেষত্ব অনুসন্ধানকারী প্রভাবশালী রচনার” জন্য নোবেল প্রদান করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









