আইজাজ আহমদ: ইতিহাসের অন্ধকারে এক বিদ্রোহী কণ্ঠ
আইজাজ আহমাদ (১৯৪১–২০২২) ছিলেন একজন মার্কসবাদী দার্শনিক, সাহিত্যতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভিনের স্কুল অব হিউম্যানিটিজের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে চ্যান্সেলরস প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৭ সালে ইউসি আরভিনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি নয়াদিল্লির নেহরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরির সেন্টার অব কনটেম্পোরারি স্টাডিজে প্রফেসরিয়াল ফেলো এবং টরন্টোর ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।
ব্রিটিশ ভারতের মুজাফ্ফরনগরে জন্ম নেওয়া আইজাজ দেশভাগের পর লাহোরে বেড়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি ক্যাফে ও রাজনৈতিক সংগঠনের ঘরে তিনি উর্দু সাহিত্য এবং মার্কসবাদের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন। পাকিস্তানের বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয়তার কারণে তাকে শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে চলে যেতে হয়। সেখানে কবিতা ও রাজনীতি তার চিন্তার দুই প্রধান স্রোত হয়ে ওঠে। গালিবের কবিতা নিয়ে তার কাজ এবং ‘গজলস অব গালিব’ তাকে সাহিত্যজগতে পরিচিত করে তুলে।
ভারতে ফিরে তিনি হিন্দুত্ব, উদারীকরণ এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় তার বিশ্লেষণ দেখিয়েছিল, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বুঝতে হলে জাতপাত, পিতৃতন্ত্র, অর্থনীতি ও ইতিহাসকেও একসঙ্গে দেখতে হয়। আইজাজের উত্তরাধিকার তাই শুধু তার বইয়ে নয়। তিনি বলতে চেয়েছেন, পৃথিবীকে বুঝতে হলে ঘটমান ঘটনাগুলোর পেছনের ক্ষমতার কাঠামো দেখতে হয়। তার কণ্ঠ আজ অনুপস্থিত, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো এখনও আমাদের সঙ্গে আছে। ২০২২ সালের ৯ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে লেখালেখি ও বক্তৃতা করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধের পাশাপাশি তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : লাইনিয়েজ অব দ্য প্রেজেন্ট: আইডিওলজি অ্যান্ড পলিটিক্স ইন কনটেম্পোরারি সাউথ এশিয়া (১৯৯৬), ইরাক, আফগানিস্তান অ্যান্ড দ্য ইমপেরিয়ালিজম অব আওয়ার টাইম (২০০৪), ইন আওয়ার টাইম: এম্পায়ার, পলিটিক্স, কালচার (২০০৭), নাথিং হিউম্যান ইজ এলিয়েন টু মি (২০২০), গজলস অব গালিব (১৯৯৫)
‘ইন থিউরি: ক্লাসেস, নেশনস, লিটারেচারস’ বইটির প্রতি একজন সাহিত্য পাঠকের আগ্রহী হওয়া কেন উচিত তা বইটির ভূমিকায় আইজাজ আহমদ যা লিখেছেন সে লেখাটুকু আমরা দৈনিক এদিন পাঠকের সামনে তা তুলে ধরলাম। বাকি সিধান্ত পাঠক; আপনার। পৃথিবীকে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর থেকে দেখার প্রশ্নগুলো কেন এখনও প্রাসঙ্গিক; তা যাচাই করবেন-না এড়িয়ে যাবেন।

আমাদের সময়ের চিহ্নগুলোর মধ্যে সাহিত্য
সাহিত্যকে আমরা প্রায়ই এমন এক জগতের অংশ বলে ভাবি, যেখানে মানুষের কল্পনা, স্মৃতি, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র, অর্থনীতি কিংবা সাম্রাজ্যের কঠিন বাস্তবতা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করে। একটি উপন্যাস যেন একটি উপন্যাসই, একটি কবিতা যেন কেবল একটি কবিতা, আর একটি সাহিত্যিক চরিত্র যেন তার নিজের গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সাহিত্যকে এভাবে দেখলে আমরা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিককে অদৃশ্য করে ফেলি। সাহিত্য কখনোই কেবল শব্দের সমষ্টি নয়। যে সমাজে একটি বই লেখা হয়, যে ইতিহাসের ভিতর থেকে একটি কাহিনি জন্ম নেয়, যে ভাষা কোনো জনগোষ্ঠীর স্মৃতি বহন করে, যে রাষ্ট্র কোনো ভাষাকে মর্যাদা দেয় আর অন্য ভাষাকে প্রান্তে ঠেলে দেয়—সাহিত্য তার সবকিছুর সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
এই অর্থে সাহিত্য আমাদের সময়ের চিহ্নগুলোর একটি। শুধু সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নয়, বরং সময়কে বোঝার একটি পদ্ধতি হিসেবেও। একটি সমাজ নিজের সম্পর্কে কী ভাবে, অন্য সমাজকে কীভাবে দেখে, কোন ইতিহাসকে স্মরণ করে এবং কোন ইতিহাসকে ভুলে যেতে চায়—সেসব প্রশ্ন সাহিত্যের ভেতর নানা রূপে ফিরে আসে। কখনো তা সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে আসে, কখনো একটি প্রেমের গল্পের আড়ালে, কখনো নির্বাসিত মানুষের একাকিত্বে, কখনো একটি শহরের বর্ণনায়, আবার কখনো এমন একটি নীরবতার মধ্যে, যা কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে।
এ কারণেই সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের শুধু সাহিত্য নিয়েই কথা বলা চলে না। আমাদের কথা বলতে হয় ইতিহাস, সাম্রাজ্য, জাতি, শ্রেণি, ভাষা, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতা নিয়ে।
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই প্রশ্নগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হলো। নতুন রাষ্ট্র জন্ম নিল। পুরোনো সাম্রাজ্যিক কাঠামো ভেঙে গেল, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ পুরোপুরি অদৃশ্য হলো না। রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামরিক চাপ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য পাশাপাশি চলতে থাকল। এই নতুন পৃথিবীতে সাহিত্যও নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হলো: স্বাধীন দেশের সাহিত্য কী? একটি জাতির নিজস্ব সাহিত্য কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে? ‘তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য’ বলে কি সত্যিই কোনো একক সাহিত্যিক সত্তা আছে? আর ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সাহিত্য কি স্বভাবতই মুক্তির পক্ষে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়।
সাহিত্য ও ক্ষমতার অদৃশ্য সম্পর্ক
সাহিত্যকে ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা আসলে ক্ষমতারই একটি সুবিধাজনক ধারণা। কারণ ক্ষমতা শুধু সেনাবাহিনী, কারাগার বা রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে কাজ করে না। ক্ষমতা জ্ঞান তৈরি করে, শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে, মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘সভ্য’, অন্য জনগোষ্ঠীকে ‘অসভ্য’ বলা, কোনো ভাষাকে উচ্চ মর্যাদার এবং অন্য ভাষাকে নিম্ন মর্যাদার বলে চিহ্নিত করা—এসবও ক্ষমতার কাজ।
ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় জ্ঞানব্যবস্থা পৃথিবীর নানা সমাজকে বর্ণনা করেছিল। পূর্বকে পশ্চিমের বিপরীতে স্থাপন করা হয়েছিল; এশিয়া ও আফ্রিকাকে প্রায়ই এমন এক ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যা নিজে নিজের ইতিহাস তৈরি করতে অক্ষম এবং যার প্রয়োজন ইউরোপীয় শাসন, শিক্ষা ও যুক্তিবোধ। এই বর্ণনাগুলো শুধু ভ্রমণকাহিনি বা প্রশাসনিক নথিতে ছিল না। উপন্যাস, কবিতা, নাটক, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব—সবখানেই তার ছাপ পাওয়া যায়।
ফলে সাহিত্যিক প্রতিনিধিত্ব কখনো নিরীহ বিষয় নয়। একজন লেখক যখন অন্য কোনো দেশ, জাতি বা সংস্কৃতিকে বর্ণনা করেন, তখন তিনি শুধু একটি দৃশ্য দেখান না; তিনি সেই দৃশ্যকে একটি অর্থও দেন। সেই অর্থের পেছনে থাকে ইতিহাস, শ্রেণি, জাতিগত ধারণা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক।
কিন্তু এখানেই আরেকটি বিপদ দেখা দেয়। যদি আমরা প্রতিটি সাহিত্যিক রচনাকে শুধু ক্ষমতার যন্ত্র হিসেবে দেখি, তবে সাহিত্য নিজেই সংকুচিত হয়ে যায়। সাহিত্য তখন আর দ্বন্দ্ব, কল্পনা, বিরোধিতা ও অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনার জায়গা থাকে না। অথচ সাহিত্যিক রচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি অনেক সময় তার দ্ব্যর্থতায়। একটি উপন্যাস একই সঙ্গে সাম্রাজ্যের ভাষা ব্যবহার করতে পারে এবং সেই সাম্রাজ্যকে প্রশ্নও করতে পারে। একটি জাতীয় সাহিত্য একই সঙ্গে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারে এবং নিজের দেশের শ্রেণি, জাতপাত বা লিঙ্গ-অসাম্যকে আড়াল করতে পারে।
সাহিত্য তাই ক্ষমতার বাইরে নয়; আবার ক্ষমতার নিছক অনুবাদও নয়।

ঔপনিবেশিকতার পরে ‘জাতীয় সাহিত্য’
স্বাধীনতার পর এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়—নিজেদের সাহিত্যকে নিজেদের চোখে দেখা। ঔপনিবেশিক শাসক যে ইতিহাস লিখেছে, তার বাইরে নিজেদের ইতিহাস পুনর্লিখন করা। যে ভাষা এত দিন অবজ্ঞার শিকার হয়েছে, তাকে মর্যাদা দেওয়া। যে লোকসংস্কৃতিকে ‘নিম্ন’ বলা হয়েছিল, তাকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
এই আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রয়োজনীয়। কিন্তু এখানেও একটি সমস্যা ছিল।
‘জাতীয় সাহিত্য’ বললেই প্রশ্ন ওঠে—জাতি বলতে কাকে বোঝানো হচ্ছে?
একটি দেশের মধ্যে কৃষক আছে, শ্রমিক আছে, জমিদার আছে, ব্যবসায়ী আছে, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ আছে, নানা ধর্ম ও ভাষার মানুষ আছে। নারীর অভিজ্ঞতা পুরুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এক নয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস রাষ্ট্রের সরকারি ইতিহাসের সঙ্গে এক নয়। তাহলে রাষ্ট্র যখন একটি ‘জাতীয় সাহিত্য’ নির্মাণ করে, তখন কার কণ্ঠকে জাতীয় বলে গ্রহণ করে এবং কার কণ্ঠকে প্রান্তে রেখে দেয়?
এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভারতের মতো দেশে। এখানে ‘ভারতীয় সাহিত্য’ ধারণাটি একদিকে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির অসাধারণ বৈচিত্র্যকে একত্রে ভাবার সুযোগ দেয়; অন্যদিকে সেই বৈচিত্র্যকে একটি কৃত্রিম একতার মধ্যে আটকে দেওয়ার বিপদও তৈরি করে।
একটি বাংলা উপন্যাস, একটি তামিল কবিতা, একটি মালয়ালম নাটক, একটি উর্দু গল্প—সবকিছুকে ‘ভারতীয় সাহিত্য’ বলা যায়। কিন্তু এই বৃহৎ পরিচয়ের ভেতরে তাদের পৃথক ইতিহাস হারিয়ে গেলে কী হবে? আবার শুধু ভাষাগত পরিচয়ের মধ্যে তাদের আবদ্ধ রাখলেও কি বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কগুলো অদৃশ্য হবে না?
সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাই ‘জাতীয়’ এবং ‘আন্তর্জাতিক’—এই দুইয়ের সরল বিরোধ যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন এক দৃষ্টি, যেখানে একটি সাহিত্য একই সঙ্গে তার স্থানীয় ইতিহাসের সন্তান এবং বৃহত্তর বিশ্ব-ব্যবস্থার অংশ।
‘তৃতীয় বিশ্ব’ ও সাহিত্য
বিশ শতকের মাঝামাঝি ‘তৃতীয় বিশ্ব’ ধারণাটি রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু নতুন রাষ্ট্র নিজেদের ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের উত্তরাধিকার হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। এই শব্দের মধ্যে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, সাম্রাজ্যবিরোধিতা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ একটি অত্যন্ত অস্পষ্ট সাংস্কৃতিক ধারণায় পরিণত হয়। যেন পৃথিবীর নানা দেশের নানা শ্রেণি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে একটি একক পরিচয়ের মধ্যে রাখা যায়। তখন ‘তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য’কে অনেক সময় এমন একটি সাহিত্য হিসেবে কল্পনা করা হলো, যার একদিকে রয়েছে নিপীড়িত মানুষের সত্যতা, অন্যদিকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিরোধ।
এই ধারণার মধ্যে কিছু সত্য ছিল। কিন্তু পুরো সত্য ছিল না।
কারণ একটি দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হলেই তার সমাজের সব শ্রেণি মুক্ত হয় না। জাতীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক মুক্তি একই জিনিস নয়। অনেক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্রের ক্ষমতা চলে যায় স্থানীয় মধ্যবিত্ত বা জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে। তারা জাতীয় স্বাধীনতার ভাষা ব্যবহার করলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর অনেক অংশ অপরিবর্তিত থাকে।
তাই ‘তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য’কে একমাত্র প্রতিরোধের সাহিত্য হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি একে কেবল অনুকরণ বা নির্ভরতার সাহিত্য হিসেবেও দেখা ভুল।
একটি উপন্যাসের ভেতর একই সঙ্গে জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং শ্রেণিগত অন্ধত্ব থাকতে পারে। একটি কবিতা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে, অথচ নারীর স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করতে পারে। একটি চলচ্চিত্র বিদেশি সংস্কৃতির আধিপত্যের সমালোচনা করতে পারে, অথচ নিজের দেশের সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
এই দ্বন্দ্বগুলোই সাহিত্যের প্রকৃত ক্ষেত্র।
বিপ্লব, পরাজয় ও স্মৃতি
বিশ শতকের বিপ্লবী ইতিহাস সাহিত্যকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিল। চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, দক্ষিণ আফ্রিকা—বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সাহিত্যিক কল্পনাকে নতুন ভাষা দিয়েছিল।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল, দরিদ্র দেশ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছিল। সেই বিজয় শুধু সামরিক ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।
কিন্তু বিজয়ের পর শুরু হয়েছিল অন্য এক ইতিহাস।
যুদ্ধ একটি দেশকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে যে বিজয়ী পক্ষের সামনে তখন শুধু পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা থাকে। খাদ্য, কৃষি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সবকিছুকে আবার গড়ে তুলতে হয়। একটি বিপ্লবের নৈতিক মহত্ত্ব থাকলেই তার বস্তুগত সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
এখানেই সাহিত্য ও ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবের রোমান্টিক স্মৃতি সহজে তৈরি হয়; কিন্তু বিপ্লবের পর মানুষের দৈনন্দিন জীবন—ক্ষুধা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আমলাতন্ত্র, সংকট, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—সেসব স্মরণ করা কঠিন। ফলে পরাজিত বা বিপর্যস্ত বিপ্লবের ইতিহাস প্রায়ই দুই বিপরীত মিথের মধ্যে আটকে যায়। একদিকে তাকে নিখুঁত নায়কোচিত কাহিনি বানানো হয়; অন্যদিকে তার পরবর্তী ব্যর্থতাকে দেখিয়ে পুরো বিপ্লবকেই অর্থহীন বলা হয়।
সাহিত্যিক সমালোচনার দায়িত্ব হওয়া উচিত এই দুই সরলীকরণ থেকে দূরে থাকা।
একটি বিপ্লবের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং তার বাস্তব ব্যর্থতা—দুটোকেই একসঙ্গে দেখা দরকার। কারণ ইতিহাস কখনো একরৈখিক নয়।
মার্কসবাদ, উত্তর-গঠনবাদ এবং নতুন সন্দেহ
এই জায়গায় এসে সাহিত্যতত্ত্বের আরেকটি বড় পরিবর্তনের দিকে তাকাতে হয়। বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-গঠনবাদ, বিনির্মাণবাদ এবং নানা ধরনের উত্তর-আধুনিক চিন্তা সাহিত্যতত্ত্বে প্রবল হয়ে ওঠে।
এই চিন্তাগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছিল। তারা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে ভাষা স্বচ্ছ আয়না নয়; অর্থ স্থির নয়; পরিচয়ও সবসময় একরৈখিক নয়। ‘জাতি’, ‘শ্রেণি’, ‘লিঙ্গ’, ‘ইতিহাস’—এসব পরিচয়ের ভিতরেও ক্ষমতার সম্পর্ক কাজ করে।
কিন্তু এই সন্দেহ যখন অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তখন একটি বিপদ তৈরি হয়। যদি সব ইতিহাসই কেবল ভাষার নির্মাণ হয়, সব সমষ্টিগত পরিচয়ই যদি কেবল বয়ান হয়, সব রাজনৈতিক সংগঠনই যদি সন্দেহজনক হয়, তাহলে বাস্তব বস্তুগত শক্তির কথা কোথায় থাকবে?
একটি রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কেবল একটি ‘বয়ান’ নয়। একটি কারখানার শ্রমিকের ক্ষুধা কেবল একটি ‘ডিসকোর্স’ নয়। একটি উপনিবেশের জমি দখল, একটি জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ, একটি যুদ্ধের ধ্বংস—এসবের বাস্তবতা ভাষার বিশ্লেষণে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না।
সন্দেহ প্রয়োজন, কিন্তু সন্দেহ যদি বাস্তবতাকেই অস্বীকার করে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সমালোচনা না করে ক্ষমতার ইতিহাসকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে।
এখানে মার্কসবাদের গুরুত্ব ফিরে আসে। মার্কসবাদ আমাদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সত্য শেখায়: মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতি বস্তুগত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থনীতি, উৎপাদন, শ্রেণি ও রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কৃতিকে নির্ধারণ করে—এমন সরল অর্থে নয়; বরং তারা সংস্কৃতির সম্ভাবনা ও সীমা তৈরি করে।
একটি উপন্যাসের অর্থ তাই শুধু তার ভাষার ভেতর নেই। তার পাঠকের সামাজিক অবস্থান, প্রকাশনা-ব্যবস্থা, বাজার, রাষ্ট্র, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান—সবকিছু তার অর্থ তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

সাহিত্যিক ক্যানন ও নীরবতা
কোন বইকে ‘মহৎ সাহিত্য’ বলা হবে—এটিও ক্ষমতার প্রশ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কোন লেখক থাকবেন, কোন লেখক বাদ পড়বেন, কোন ভাষার সাহিত্য অনুবাদ হবে, কোন বই আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাবে—এসব সিদ্ধান্ত কখনো পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়।
ঔপনিবেশিক পৃথিবীতে ইউরোপীয় সাহিত্যকে প্রায়ই সার্বজনীন সাহিত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। শেক্সপিয়র, মিল্টন, দান্তে, গ্যেটে বা টলস্টয়ের গুরুত্ব অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়: কেন তাঁদের সাহিত্যকে মানবতার সাধারণ মানদণ্ড হিসেবে পড়ানো হবে, কিন্তু আফ্রিকা, এশিয়া কিংবা লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে ‘স্থানীয়’, ‘বিশেষ’ বা ‘জাতিগত’ সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করা হবে?
একজন ইংরেজ লেখক যখন ভারত সম্পর্কে লেখেন, তাকে ‘বিশ্বসাহিত্য’ বলা হয়; একজন ভারতীয় লেখক ইংল্যান্ড সম্পর্কে লিখলে তাকে প্রায়ই ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক’ লেখক বলা হয়। এই পার্থক্য নিজেই একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
তবে ক্যানন ভাঙার অর্থ কেবল পুরোনো লেখকদের সরিয়ে নতুন লেখকদের বসানো নয়। বরং আমাদের বুঝতে হবে, ক্যানন কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন তৈরি হয়। নতুন ক্যাননও যদি একই ক্ষমতার যুক্তি পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে শুধু নাম বদলাবে; কাঠামো বদলাবে না।
নির্বাসন ও সাহিত্য
আমাদের সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক চিহ্ন হলো নির্বাসন।
আধুনিক পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছে—যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক প্রয়োজন কিংবা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার কারণে। নির্বাসিত লেখক তাই আমাদের সময়ের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র।
নির্বাসন মানুষের পরিচয়কে জটিল করে। সে এক দেশের মানুষ, কিন্তু অন্য দেশে বাস করে। তার ভাষা তার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত, অথচ তার জীবন অন্য ভাষার মধ্যে প্রবাহিত হয়। সে নিজের দেশকে দূর থেকে দেখে এবং নতুন দেশকেও পুরোপুরি নিজের বলে মনে করতে পারে না।
এই দ্বৈত অবস্থান সাহিত্যকে একটি বিশেষ দৃষ্টিশক্তি দিতে পারে। দূরত্ব কখনো মানুষকে নিজের সমাজকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করে। কিন্তু নির্বাসনকে কেবল রোমান্টিক স্বাধীনতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। নির্বাসনের মধ্যে রয়েছে ক্ষতি, বিচ্ছিন্নতা, স্মৃতি এবং কখনো গভীর রাজনৈতিক অসহায়তা।
তবু নির্বাসিত লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এই যে সে কোনো একক পরিচয়ের ভিতর সম্পূর্ণভাবে বন্দী থাকে না। সে একাধিক ইতিহাসের মধ্যে চলাফেরা করতে পারে।
এই কারণে নির্বাসনের সাহিত্য আমাদের শেখায়—পরিচয় কোনো স্থির ঘর নয়; বরং বহু ইতিহাসের মধ্য দিয়ে চলমান একটি পথ।
সাহিত্য কি প্রতিরোধ করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তরও সরল নয়।
একটি কবিতা কোনো সরকারকে উৎখাত করে না। একটি উপন্যাস কোনো সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে না। কিন্তু সাহিত্য মানুষের কল্পনার সীমা বদলে দিতে পারে। যে মানুষকে রাষ্ট্র ‘শত্রু’ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, সাহিত্য তাকে একটি মুখ, একটি স্মৃতি, একটি পরিবার, একটি ভয়, একটি স্বপ্ন দিতে পারে।
এই জায়গাতেই সাহিত্যের রাজনৈতিক শক্তি।
সাহিত্য আমাদের শেখায় অন্যের অভিজ্ঞতাকে কল্পনা করতে। কিন্তু ‘অন্যকে’ কেবল নিজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করাও বিপজ্জনক। একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কাহিনি পড়ে যদি আমরা শুধু নিজেদের উদারতা অনুভব করি, অথচ সেই নিপীড়নের বস্তুগত কারণগুলো নিয়ে প্রশ্ন না করি, তাহলে সাহিত্য আমাদের বিবেককে শান্ত করেছে মাত্র।
সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক কাজ হয়তো তাই কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ শেখানো নয়। বরং এমন একটি দৃষ্টিক্ষেত্র তৈরি করা, যেখানে ইতিহাসের চাপ, মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার নির্মমতা এবং মুক্তির সম্ভাবনা একই সঙ্গে দেখা যায়।
আমাদের সময়ের চিহ্ন
আজকের পৃথিবী বিশ শতকের শেষভাগের পৃথিবী নয়। কিন্তু সেই সময়ের অনেক প্রশ্ন এখনও আমাদের সঙ্গে আছে। সাম্রাজ্যবাদ তার পুরোনো পোশাক বদলেছে; জাতীয়তাবাদ নতুন রূপ নিয়েছে; বাজার বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সীমান্তকে একদিকে দুর্বল করেছে, অন্যদিকে নজরদারির নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
এই পৃথিবীতে সাহিত্যও নতুনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। বইয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল আর্কাইভ, অনলাইন প্রকাশনা—সব মিলিয়ে সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে। কিন্তু তথ্যের বিস্তার জ্ঞানের সমতা নিশ্চিত করে না। বরং যে শক্তি তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, সে অনেক সময় মানুষের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
তাই আজ সাহিত্য পড়ার অর্থ কেবল একটি সুন্দর বাক্য পড়া নয়। বরং প্রশ্ন করা—কে কথা বলছে? কার হয়ে কথা বলছে? কাকে নীরব রাখা হয়েছে? কোন ইতিহাস এখানে উপস্থিত? কোন ইতিহাস অনুপস্থিত? এই কাহিনি কোন সামাজিক বাস্তবতা থেকে এসেছে? এর প্রকাশ ও প্রচারের পেছনে কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে? আর পাঠক হিসেবে আমরা কোন অবস্থান থেকে তা পড়ছি?
এই প্রশ্নগুলো সাহিত্যকে ছোট করে না; বরং তার পরিসর বাড়ায়।
কারণ সাহিত্য যদি সত্যিই আমাদের সময়ের চিহ্ন হয়, তবে সেই চিহ্নের মধ্যে শুধু সৌন্দর্য নয়, দ্বন্দ্বও থাকবে; শুধু কল্পনা নয়, ইতিহাসও থাকবে; শুধু ব্যক্তিমানুষ নয়, রাষ্ট্র ও সমাজও থাকবে।
পাঠের নৈতিক দায়িত্ব
শেষ পর্যন্ত সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা সম্ভবত এই যে, কোনো সাহিত্যকেই তার নিজস্ব ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না।
জাতীয় সাহিত্যকে জাতীয়তাবাদের সরল মহিমায় স্থাপন করা যেমন ভুল, তেমনি সব জাতীয়তাবাদকেই একসঙ্গে অস্বীকার করাও ভুল। ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কেবল রোমান্টিক বীরত্বে পরিণত করা যেমন ইতিহাসকে আড়াল করে, তেমনি পরবর্তী ব্যর্থতার কারণে সেই সংগ্রামের নৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করাও ইতিহাসকে বিকৃত করে। উত্তর-গঠনবাদ আমাদের ভাষা ও পরিচয়ের অস্থিরতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে; কিন্তু সেই অস্থিরতার নামে বস্তুগত বাস্তবতা মুছে ফেলাও বিপজ্জনক।
সাহিত্য তাই কোনো নির্জন দ্বীপ নয়। এটি ইতিহাসের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একটি জটিল ভূখণ্ড। এখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু প্রতিরোধও আছে; আধিপত্য আছে, কিন্তু স্মৃতিও আছে; রাষ্ট্রের ভাষা আছে, আবার নির্বাসিতের কণ্ঠও আছে। এখানে জাতীয়তার স্বপ্ন আছে, আবার সেই স্বপ্নের ভেতরের অন্ধকারও আছে। এখানে সাম্রাজ্যের দৃষ্টি আছে, আবার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাকিয়ে থাকা মানুষের চোখও আছে।
আমাদের কাজ কোনো একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণ করা নয়। বরং সাহিত্যকে এমনভাবে পড়া, যাতে তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসগুলো দৃশ্যমান হয়।
কারণ সাহিত্য কেবল অতীতের স্মৃতি বহন করে না; সে বর্তমানকে কীভাবে দেখতে হবে, তারও একটি পদ্ধতি তৈরি করে। আর যে সমাজ তার সাহিত্যকে প্রশ্ন করতে শেখে না, সে শেষ পর্যন্ত নিজের ইতিহাসকেও প্রশ্ন করতে ভুলে যায়।
সাহিত্যকে তাই আমাদের সময়ের চিহ্ন হিসেবে পড়তে হবে—একটি আয়না হিসেবে নয়, বরং একটি জানালা হিসেবে। আয়না আমাদের নিজেদের মুখ দেখায়; জানালা আমাদের এমন এক পৃথিবীর দিকে তাকাতে শেখায়, যেখানে আমরা নিজেরা একমাত্র মানুষ নই। সেখানে অন্যের ইতিহাস আছে, অন্যের ক্ষত আছে, অন্যের স্বপ্ন আছে। সেই পৃথিবীকে বুঝতে গেলে আমাদের নিজের অবস্থান সম্পর্কেও সচেতন হতে হয়।
এই সচেতনতাই হয়তো সাহিত্য পাঠের নৈতিক শুরু।
আর সেই শুরু থেকে আমরা দেখতে পাই—একটি বই কখনো শুধু একটি বই নয়। তার পাতার মধ্যে একটি সময় কথা বলে; একটি সমাজ কথা বলে; কখনো একটি পরাজিত ইতিহাস কথা বলে; কখনো একটি সাম্রাজ্যের দীর্ঘ ছায়া; কখনো এমন একটি ভবিষ্যৎ, যার নাম আমরা এখনও জানি না।
সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি এখানেই: সে আমাদের প্রস্তুত উত্তর দেয় না; বরং এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, যেখান থেকে ইতিহাসকে আর আগের মতো দেখা সম্ভব হয় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









