প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। তাঁরা দূরদেশে থাকেন। পরিবার থেকে দূরে থাকেন। কষ্ট করেন। ঘাম ঝরান। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির ভিতও শক্ত করেন। তাঁদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। সেই অর্থে পরিবারের সংসার চলে। সন্তানের পড়াশোনা হয়। চিকিৎসা হয়। বাড়িঘর তৈরি হয়। ব্যবসা হয়। জমি কেনা হয়।
অর্থাৎ প্রবাসীরা বিদেশে থাকলেও তাঁদের জীবন ও শ্রমের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। অথচ সেই প্রবাসী যখন নিজের দেশের জমিজমা সংক্রান্ত একটি সাধারণ কাজ করতে যান, তখন তাঁকেই যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়ালে আটকে যেতে হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আরো বড় প্রশ্ন উঠবে তখন, যখন দেখা যাবে, একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর মানুষ সহজ সেবা প্রত্যাশা করেছিল, অথচ আগের সময়ে সহজ করা কোনো কোনো ব্যবস্থাই আবার কঠিন হয়ে উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রবাসীদের নাগরিকসেবা সহজ করার বেশ কিছু উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য নথি ব্যবহার করতে পারতেন। দূতাবাসের মাধ্যমে আমোক্তারনামাসহ প্রয়োজনীয় কিছু কাজও তুলনামূলক সহজে করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ভূমির নামজারির ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের জন্য বিকল্প পরিচয়পত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিদেশি পাসপোর্ট, বাংলাদেশি পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন নম্বর দিয়ে আবেদন করার সুযোগ ছিল বলে প্রবাসীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু এখন অনেক প্রবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, সেই সহজ পথের অনেকটাই আর আগের মতো কার্যকর নেই। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চোখে না পড়লেও অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, আগের কিছু বিকল্প আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ছাড়া আবেদন এগোচ্ছে না। ফলে একজন প্রবাসীর হাতে বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকলেও কাজ হচ্ছে না। জন্মনিবন্ধন থাকলেও কাজ হচ্ছে না। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো একাধিক সরকারি নথি থাকার পরও শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে তাঁর সম্পত্তির নামজারি আটকে যাচ্ছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নামজারি নির্দেশিকায় জাতীয় পরিচয়পত্রের পাশাপাশি পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন সনদের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি নির্দেশিকায় বিকল্প পরিচয়পত্রের বিষয়টি রয়েছে। তাহলে বাস্তবে অনলাইনে সেই সুযোগ কোথায়? সরকারি নির্দেশিকা যদি এক কথা বলে, আর নাগরিক যখন আবেদন করতে যান, তখন ব্যবস্থা অন্য কথা বলে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোনটিকে সত্য বলে ধরে নেবেন। এই অসঙ্গতির দায় কে নেবেন?
আমার নিজের অভিজ্ঞতাই এর একটি বাস্তব উদাহরণ। আমার বোনের শাশুড়ি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া জমিজমা তিনি, তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের নামে নামজারি করে দিতে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হলো। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত্যুসনদ নেওয়া হলো। জমির দলিলপত্র সংগ্রহ করা হলো। উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজনীয় নথিও প্রস্তুত করা হলো। সবকিছু প্রস্তুত থাকার পরও আবেদন করা গেল না। কারণ, উত্তরাধিকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তাঁরা চারজনই প্রবাসী।
তিন জায়গায় তাঁদের সংসার। সবাই বিবাহিত। কারো দুই সন্তান। কারো তিন সন্তান। তাঁদের প্রত্যেকের নিজের সংসার, চাকরি, ব্যবসা এবং সন্তানদের পড়াশোনার ব্যস্ততা রয়েছে। দেশে এসে জাতীয় পরিচয়পত্র করার মতো সময় তাঁরা পাননি। অথচ তাঁদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট আছে। জন্মনিবন্ধন আছে। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো সরকারি নথি আছে। তারপরও তাঁদের বলা হচ্ছে- জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া হবে না।
বোনের শাশুড়ি আমাকে বললেন, তিন সন্তানকে একসঙ্গে দেশে নিয়ে আসা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একজনের দেশে আসা মানে শুধু বিমানভাড়া নয়। ছুটি নিতে হয়। কাজ বন্ধ রাখতে হয়। সন্তানদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে হয়। অনেকের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীকেও সঙ্গে আনতে হয়। শুধু একটি জাতীয় পরিচয়পত্র করার জন্য একটি পুরো পরিবারের পরিকল্পনা বদলে ফেলতে হয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের একটি নাগরিকসেবা কি নাগরিকের জন্য এমন বোঝা হয়ে দাঁড়ানো উচিত।
আমি বিকল্প পথ খুঁজেছি। কিন্তু অনলাইন ব্যবস্থায় সেই পথও প্রায় বন্ধ। শেষ পর্যন্ত দূতাবাসে যোগাযোগ করতে বলা হলো। সেখান থেকেও দেশে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হলো। এখানেই প্রবাসীদের হতাশার জায়গাটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন মানুষ বিদেশে বসে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের বৈধ প্রমাণ বহন করছেন। তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট আছে। জন্মনিবন্ধন আছে। কিন্তু নিজের দেশের জমির নামজারি করতে তাঁকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে দেশে আসতে হবে। এটি কোনোভাবেই আধুনিক নাগরিকসেবার চিত্র হতে পারে না।
অবশ্য আশার বিষয় হলো, সব জায়গায় যে জাতীয় পরিচয়পত্রের সেবা একেবারেই নেই, তা নয়। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাতারসহ কয়েকটি বাংলাদেশি মিশনে এ সংক্রান্ত সেবার সরকারি তথ্য রয়েছে। দোহায় বাংলাদেশ দূতাবাসের জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্য অর্থাৎ ব্যবস্থা করা সম্ভব। কোথাও করা হচ্ছে। তাহলে সব গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে একই ব্যবস্থা কেন থাকবে না। কেন একজন প্রবাসীকে বলা হবে, দেশে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র করে আসুন।
আমার এই স্বজনরা যুক্তরাজ্য প্রবাসী। আর এখানেই আসে আরো বিব্রতকর একটি প্রসঙ্গ। নাগরিকসেবা যত জটিল হয়, ততই বাড়ে দালাল, তদবির এবং অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ। সাধারণ মানুষের মুখে এমন অভিযোগও শোনা যায়, জমিজমার কাজ খুব সহজ হয়ে গেলে কর্মকর্তাদের কাছে ঘোরাঘুরি কমে যায়। তদবিরের প্রয়োজন কমে যায়। ফলে একটি অদৃশ্য সুবিধাভোগী মহল সহজ ব্যবস্থার বদলে জটিল ব্যবস্থাকেই পছন্দ করে। আমি কোনো সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করছি না। কিন্তু যদি কোথাও নাগরিকসেবা জটিল করে রাখার পেছনে এমন কোনো স্বার্থ কাজ করে, তাহলে সেটি শুধু অনৈতিক নয়, রাষ্ট্রের জন্যও ভয়ংকর।
কারণ, রাষ্ট্রের নাগরিকসেবা কোনো ব্যক্তির আয় করার ক্ষেত্র হতে পারে না। নাগরিকের অসুবিধা কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুবিধায় পরিণত হতে পারে না। জমির কাগজ, নামজারি, উত্তরাধিকার, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা আমমোক্তারনামা কোনো নাগরিকের জন্য তদবিরনির্ভর হওয়া উচিত নয়। এগুলো তাঁর অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই অধিকার নিশ্চিত করা।
নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা আরো বেশি। মানুষ ভেবেছিল আগের সময়ের ভুলত্রুটি সংশোধন হবে। সেবা আরো সহজ হবে। সরকারি দপ্তরের দরজায় ঘুরতে হবে না। অনলাইনে কাজ হবে। বিদেশে থাকা নাগরিকদের জন্য দূতাবাসই হবে রাষ্ট্রের হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যদি দেখা যায়, সহজ করা ব্যবস্থাই আবার অদৃশ্য কোনো কারণে কঠিন হয়ে গেছে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। এর নেপথ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে? নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা? নাকি অন্য কোনো স্বার্থ?
প্রবাসীরা সরকারের কাছে বিশেষ সুবিধা চান না। তাঁরা অনুগ্রহ চান না। তাঁরা শুধু চান নাগরিক হিসেবে তাঁদের অধিকারটুকু সহজভাবে নিশ্চিত হোক। যে মানুষটি প্রতি মাসে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন, তিনি নিজের দেশের একটি জমির নামজারি করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়বেন কেন। যে মানুষটির পাঠানো অর্থে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী হচ্ছে, তাঁর একটি নাগরিকসেবা পেতে তদবিরের প্রয়োজন হবে কেন। যে মানুষটি বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের জন্য কাজ করছেন, তাঁকে নিজের দেশেই কেন পরবাসীর মতো আচরণ পেতে হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনই বিষয়টি দেখা দরকার। শুধু একটি দপ্তরকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। ভূমি মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। প্রবাসীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন দূতাবাস ও কনস্যুলেটের মাধ্যমে সর্বত্র চালু করা প্রয়োজন। পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য সরকারি নথি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নামজারি ব্যবস্থায় প্রবাসীদের জন্য যে বিকল্প পরিচয়পত্রের বিধান রয়েছে, সেটি অনলাইনে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রবাসীদের জন্য রাষ্ট্রের দরজা বন্ধ করার সময় এখন নয়। বরং দরজা আরো প্রশস্ত করার সময়। তাঁদের দেশে ছুটে আসতে বাধ্য না করে রাষ্ট্রের সেবা তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কারণ, প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকেন ঠিকই, কিন্তু দেশ থেকে বাইরে নন। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে দৌড়নো নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া।
আর, যদি নিজের দেশের একটি জমির নামজারি করতে গিয়ে একজন বাংলাদেশিকে প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য দেশে ফিরতে হয়, তারপর দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, তখন শুধু প্রবাসীর ভোগান্তি হয় না। রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই প্রশ্নের উত্তর এখন সরকারের দেওয়ার সময়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









