‘গাছ তার ফলে পরিচয়, মানুষ তার কর্মে’- বাংলার এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি ব্যক্তি মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় শুধু তার প্রতিষ্ঠার তারিখ, নির্বাচনী সাফল্য কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নির্ধারিত হয় না; দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক, রাষ্ট্রচিন্তা এবং ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষায় তার অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তার পরিচয় নির্মাণ করে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তখন ছিল গভীর অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে।
এই দীর্ঘ পথ কখনো মসৃণ ছিল না। ক্ষমতা ও বিরোধী দল- দুই অবস্থানেই বিএনপিকে আন্দোলন, নির্বাচন, কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি দলের জন্মদিন নয়; বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নেতৃত্বের বিবর্তন পর্যালোচনারও একটি উপলক্ষ।
জিয়াউর রহমান যুদ্ধ থেকে রাষ্ট্রচিন্তায়
বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর চট্টগ্রাম থেকে তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়। ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও ভাষা নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিতর্ক রয়েছে। তবে এটিও ইতিহাসের অংশ যে, সেই সংকটময় সময়ে তাঁর কণ্ঠে প্রচারিত ঘোষণা মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রতিরোধের মনোভাব সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার এবং পরবর্তীতে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। একজন যোদ্ধা, সামরিক কর্মকর্তা, সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে আলাদা অধ্যায় তৈরি করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগ পরবর্তীতে সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। ‘বিপদে পড়লে বুদ্ধি বাড়ে’- সংকট মানুষকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করে। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে উঠেছিল।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে দেশে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাকশাল গঠনের মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দেশে আবার রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরে আসার সুযোগ পায়। আওয়ামী লীগও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরে আসে। এই অধ্যায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, গণতন্ত্র কোনো একটি দলের একক সম্পত্তি নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বহুমতের সহাবস্থানে।
‘দশের লাঠি একের বোঝা’- সম্মিলিত শক্তির কথাই বলে। একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও দলের সাংবিধানিক উপস্থিতি সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পথ তৈরি করতে পারে। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। তাঁর ধারণায় বাংলাদেশের ভূখণ্ড, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনগণের অভিন্ন স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। এই চিন্তার সঙ্গে যুক্ত ছিল জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। এসব লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি সামনে আনেন। প্রচলিত আছে- ‘আগে হলে বুনে ধান, তবেই মিলে নবান্ন।’ ভবিষ্যতের সাফল্যের জন্য বর্তমানের সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম অপরিহার্য। কৃষি উৎপাদন, খাল খনন, গ্রামীণ অর্থনীতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেও স্বনির্ভর অর্থনীতির একটি চিন্তা প্রতিফলিত হয়।
পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্ত
স্বাধীনতার পর একটি নবীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করার চ্যালেঞ্জ। জিয়াউর রহমানের সময় মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে সার্ক গঠন করেন। প্রবাদে আছে- ‘এক হাতে তালি বাজে না’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কও একতরফা হতে পারে না। পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
৩০ মে ইতিহাসের বেদনাবিধুর দিন
১৯৮১ সালের ৩০ মে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। চট্টগ্রামে একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি করেনি; দেশকেও নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। কবি রবীন্দ্রনাথের সেই প্রার্থনা যেন এমন সংকটের সময় নতুন অর্থ পায়- ‘বিপদে মোদের রক্ষা করো- এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি যেন না করি ভয়‘।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার দলের নেতৃত্বে আসেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার সামরিক শাসনের অধ্যায় শুরু হয়।
খালেদা জিয়া: আপসহীন সংগ্রাম
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির ইতিহাসে যাঁর নেতৃত্ব সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তিনি বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগদানের পর তিনি ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলে। সাত দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তীতে বৃহত্তর গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৬ সালে তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে এরশাদবিরোধী একদফা আন্দোলন আরো তীব্র হয়। অবশেষে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই অধ্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘আন্দোলন’ শব্দটি স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। রাজনীতিতে শুধু উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না। দীর্ঘস্থায়ী সংগঠন, ত্যাগ, জনসম্পৃক্ততা ও ধারাবাহিক আন্দোলনই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত তৈরি করে।
গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ লড়াই
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয় গণতন্ত্রের জন্য তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম। ক্ষমতায় থেকেছেন, আবার বিরোধী দলেও থেকেছেন; কারাবরণ করেছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।
২০১১ সালে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয়। ২০১৮ সালে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা প্রদান করে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন অবশ্য বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিএনপির শাসনামল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। ইতিহাসের ন্যায্য মূল্যায়নের জন্য প্রশংসার পাশাপাশি এসব বিতর্কও আলোচনায় থাকা প্রয়োজন। কারণ, ইতিহাসের কাজ কাউকে দেবতা বানানো নয়; ইতিহাসের কাজ সত্যকে সময়ের পরীক্ষায় যাচাই করা।
এক যুগের অবসান, নতুন অধ্যায়
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তিনি ছিলেন বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মৃত্যু বিএনপির জন্য গভীর শোকের হলেও একই সঙ্গে দলটির নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান দীর্ঘদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেছেন। খালেদা জিয়ার জীবনাবসানের পর ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এর মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজন্মান্তর ঘটে। এরপর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ফলে, বিএনপির প্রতিষ্ঠার ৪৮তম বছরে দলটি প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এটি নিছক নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বিএনপির ইতিহাসে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়।
জিয়াউর রহমান ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রনায়ক, খালেদা জিয়া ছিলেন দীর্ঘ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আর তারেক রহমান এখন সেই উত্তরাধিকারের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক দর্শন ও সমকালীন বাংলাদেশের বাস্তবতাকে যুক্ত করার পরীক্ষার মুখোমুখি। কারণ, উত্তরাধিকার পাওয়া যায়, কিন্তু উত্তরাধিকারের মর্যাদা ধরে রাখতে হয় কর্মের মাধ্যমে।
উত্তরাধিকার মানে শুধু নাম নয়
তারেক রহমানের সামনে এখন মৌলিক প্রশ্ন- তিনি কীভাবে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবেন? আজকের বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ নয়। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, তরুণদের প্রত্যাশা ও বিশ্বরাজনীতি বদলেছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই পুরোনো আদর্শকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করাই হবে নতুন নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা। খনার বচন বলে- ‘দিনে দিনে বাড়ে ধন,/ দিনে দিনে ক্ষয়।’ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও উন্নতি নিজে নিজে আসে না। সুশাসন, পরিকল্পনা, সততা ও দক্ষতার মাধ্যমে উন্নয়নকে ধরে রাখতে হয়।
বিএনপির সামনে নতুন পরীক্ষা
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় থাকা নয়; বরং ক্ষমতার ব্যবহার কেমন হয়, সেটি। একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি তার প্রতিপক্ষকে কতটা দুর্বল করতে পারে, সেখানে নয়; বরং জনগণের অধিকার কতটা রক্ষা করা যায়, সেখানে। ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’- রাজনীতিতেও অতিরিক্ত ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা শেষ পর্যন্ত সংগঠন ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সরকারের প্রত্যেক ক্ষমতাবান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্ষমতা যত বড়, জবাবদিহিও তত বড় হওয়া উচিত।
ইতিহাসের পদরেখা সামনে এগিয়ে যায়
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস একরৈখিক নয়। এতে যেমন রয়েছে গৌরব, তেমনি রয়েছে বিতর্ক; আছে আন্দোলন, তেমনি আছে রাজনৈতিক ভুলের অধ্যায়; আছে বিজয়, তেমনি আছে পরাজয় ও সংকট। কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই- সবকিছু মিলিয়েই ইতিহাস। জিয়াউর রহমানের হাতে যে দলের জন্ম, খালেদা জিয়ার হাতে যে দল দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছে, সেই দলের নেতৃত্ব এখন তারেক রহমানের হাতে। একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। ফলে বিএনপির ইতিহাসের সঙ্গে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান বাস্তবতাও সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এই মুহূর্তে তারেক রহমানের সামনে বড় সুযোগ হলো- বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা।
শেষ পর্যন্ত সেই পরিচিত কথাটিই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক- ‘গাছ তার ফলে পরিচয়, মানুষ তার কর্মে।’ একটি দলের পরিচয়ও তার কর্মে। ইতিহাস বিএনপিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা শুধু অতীতের ওপর নির্ভর করবে না। বর্তমান নেতৃত্ব আগামী দিনে কী করে, জনগণের জন্য কী করে, গণতন্ত্রকে কতটা শক্তিশালী করে এবং রাষ্ট্রকে কতটা কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক করে- তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ইতিহাস। ৪৮ বছরের পথ পেরিয়ে বিএনপি এখন নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে। প্রতিষ্ঠাতার দর্শন, মায়ের সংগ্রাম এবং সন্তানের নেতৃত্ব- এই তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন সময়ের পরীক্ষায়। আর ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় সবসময়ই এক- কর্মই শেষ কথা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাবেক প্রভাষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









