কোনো ভাষার ইতিহাস কি আসলে কোনো জাতির ইতিহাস? প্রশ্নটি শুনতে যত সরল, তার উত্তর তত নয়। কারণ ভাষা কখনো কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা স্মৃতির একটি গোপন ভাণ্ডার, ক্ষমতার একটি অদৃশ্য মানচিত্র, মানুষের পৃথিবীকে নাম দেওয়ার প্রাচীনতম পদ্ধতি। আমরা যে জিনিসটির নাম জানি না, তাকে কীভাবে চিনব? আর যে মানুষটির ভাষা আমরা বুঝি না, তার পৃথিবীকে কতটা বুঝতে পারি?
সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যকে এই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করালে তার রসিক মুখটির আড়ালে আরেকটি মুখ দেখা যায়—একজন গভীর সংশয়বাদী, একজন অনুসন্ধিৎসু মানুষ, যিনি কোনো পরিচয়কেই শেষ সত্য বলে মেনে নিতে রাজি নন। তিনি ভাষা জানতেন বহু, দেশ দেখেছেন বহু, সংস্কৃতির মধ্যে যাতায়াত করেছেন অবলীলায়; কিন্তু তার আসল ভ্রমণ ছিল মানুষের মনোজগতে।
১৯০৪ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির জীবন যেন নিজেই একটি বহুভাষিক গ্রন্থ। শান্তিনিকেতন, আলিগড়, ইউরোপ, কাবুল—শিক্ষা ও জীবনের নানা পরিসর তাকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছিল, যেখানে পৃথিবীকে একক কোনো সংস্কৃতির আয়নায় দেখা সম্ভব ছিল না।
এখানে একটি আপাত-বিরোধ থাকে। যে মানুষ যত বেশি ভাষা জানে, সে কি তত বেশি নিজের ভাষা থেকে দূরে সরে যায়? মুজতবা আলীর ক্ষেত্রে ঘটল ঠিক উল্টোটি। অন্য ভাষার দরজা দিয়ে তিনি নিজের ভাষার ঘরে ফিরে এলেন। যেন দূরদেশে গিয়ে আবিষ্কার করলেন—নিজের বাড়িরও একটি ভূগোল আছে। ভাষা সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত এই যে আমরা তাকে একটি সম্পত্তি মনে করি। যেন ভাষা আমার, তোমার নয়; এই শব্দটি শুদ্ধ, ওই শব্দটি অশুদ্ধ; এই উচ্চারণ সভ্য, অন্যটি অসভ্য। অথচ ভাষার প্রকৃতি সম্পত্তির বিপরীত। ভাষা যত ব্যবহার হয়, তত বদলে যায়। যে ভাষা বদলায় না, সে ভাষা আসলে বেঁচে নেই; তাকে অভিধানের কাচের বাক্সে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এই অর্থে মুজতবা আলীর ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ কেবল একটি ভাষাবিষয়ক পুস্তক নয়; এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটি গভীর প্রশ্নও। রাষ্ট্র যখন কোনো ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়, তখন সে কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নির্বাচন করে না; সে নির্ধারণ করে কার কণ্ঠস্বর শোনা হবে এবং কার কণ্ঠস্বর প্রশাসনিক নীরবতায় হারিয়ে যাবে এখানে ভাষা রাজনীতির বিষয় হয়ে ওঠে—কিন্তু রাজনীতি মানেই দলীয় রাজনীতি নয়। রাজনীতির প্রাথমিক অর্থই তো ক্ষমতার বিন্যাস। কে কথা বলবে? কার ভাষায় আইন লেখা হবে? কার ভাষায় শিক্ষা হবে? কার ভাষা ‘মান্য’ এবং কার ভাষা ‘স্থানীয়’ বলে চিহ্নিত হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই রাষ্ট্রের প্রকৃত মুখ দেখা যায়।
মুজতবা আলীর যুক্তিবাদী মন তাই ভাষাকে আবেগের একমাত্র আশ্রয় বানায় না। তিনি জানতেন, ভাষাকে ভালোবাসা যায়; কিন্তু ভালোবাসার কারণে তার চিন্তা করা বন্ধ করা যায় না। আর এখানেই মুজতবা আলীর হাস্যরসের গুরুত্ব। মুজতবা আলীর হাসি নিছক হাসি নয়। সেটি এক ধরনের বৌদ্ধিক অস্ত্র। তিনি মানুষকে নিয়ে হাসেন, সমাজকে নিয়ে হাসেন, সংস্কৃতির আত্মম্ভরিতা নিয়ে হাসেন; কখনো নিজের ওপরও হাসেন। কেন? কারণ যে মানুষ নিজের ওপর হাসতে জানে, সে নিজের বিশ্বাসকে অন্তত একবার দূর থেকে দেখতে পারে।

সম্ভবত এখানেই রসবোধ ও দর্শনের গোপন আত্মীয়তা। উভয়েই আমাদের পরিচিত জিনিসকে অপরিচিত করে তোলে। আমরা যে কথাটি এতদিন সত্য বলে জেনে এসেছি, একটি ভালো কৌতুক সেটিকে উল্টে দেয়; একটি ভালো দর্শনও তাই করে। পার্থক্য শুধু এই যে কৌতুকের পরে বা শুনে আমরা হাসি, দর্শনের পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। মুজতবা আলীর ক্ষেত্রে দুটি ঘটনাই প্রায়ই একই সঙ্গে ঘটে। তার বৈজ্ঞানিক মননের ভিত্তিও এই প্রশ্ন করার ক্ষমতা। বিজ্ঞান তার কাছে শুধু পরীক্ষাগারে ঘটতে থাকা কোনো বিষয় নয়; বিজ্ঞান হলো মানসিক শৃঙ্খলা—কোনো কথাকে কেবল প্রচলিত বলে সত্য না মানা। ‘সবাই বলে’ কোনো যুক্তি নয়। ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাই করতেন’ও নয়। আবার ‘বিদেশিরা তাই করে’—এটিও যুক্তি নয়। এই তিনটি বাক্য মানবসভ্যতার বহু বিপদের উৎস।
মুজতবা আলীর আধুনিকতা তাই অনুকরণমূলক আধুনিকতা নয়। তিনি পশ্চিমকে দেখেছেন, পশ্চিমের জ্ঞান আত্মস্থ করেছেন, কিন্তু পশ্চিমকে সত্যের একমাত্র মালিক করেননি। একইভাবে নিজের ঐতিহ্যকেও পবিত্রতার নামে প্রশ্নাতীত করেননি। তার কাছে সংস্কৃতি ছিল একটি চলমান সংলাপ। এই সংলাপের সবচেয়ে সুন্দর রূপ তার ভ্রমণসাহিত্যে আমরা খুঁজে পাই।
ভ্রমণকাহিনি সাধারণত শুরু হয় একটি মানচিত্র দিয়ে এবং শেষ হয় আরেকটি মানচিত্রে। মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনি শুরু হয় মানচিত্র দিয়ে, কিন্তু শেষ হয় মানুষের কাছে গিয়ে। ‘দেশে বিদেশে’-র পৃথিবী তাই শুধু আফগানিস্তানের পাহাড়, কাবুলের রাস্তা কিংবা কোনো বিদেশি শহরের দৃশ্য নয়। সেখানে মানুষ আছে—তার হাসি, সন্দেহ, আতিথেয়তা, কুসংস্কার, বুদ্ধি, নির্বুদ্ধিতা, ক্ষুধা ও প্রেম আছে।
একটি দেশকে তার স্মৃতিস্তম্ভ দিয়ে চেনা সহজ; তার মানুষ দিয়ে চেনা কঠিন। কারণ স্মৃতিস্তম্ভ কথা বলে না। মানুষ কথা বলে, এবং কথা বলতে গিয়ে নিজের বিরোধিতাও প্রকাশ করে। মুজতবা আলী এই বিরোধিতাগুলো পছন্দ করতেন। মানুষ একসঙ্গে উদার ও সংকীর্ণ, বুদ্ধিমান ও নির্বোধ, আধুনিক ও প্রাচীন হতে পারে—এই জটিলতাই মুজতবা আলীর কাছে মানুষকে আকর্ষণীয় করে তোলে। তার মানুষগুলো কোনো মতাদর্শের পোস্টার নয়। তারা ভুল করে। মিথ্যা বলে। ভালোবাসে। কখনো বোকামিও করে। আবার অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে এমন মানবিকতা দেখায়, যা কোনো দর্শনগ্রন্থে সহজে পাওয়া যায় না।
এই কারণেই মুজতবা আলীর ভ্রমণসাহিত্যকে কেবল ‘ভ্রমণ’ বলে পড়া যায় না। এটি এক ধরনের নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, আবার একই সঙ্গে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। অন্যকে দেখতে দেখতে লেখক নিজেকেই দেখতে থাকেন। কারণ ‘অন্য’ বলে যে মানুষটিকে আমরা চিহ্নিত করি, তার মধ্যেই কোনো না কোনোভাবে আমাদের নিজের ছায়া থাকে।
এই ‘অন্য’-এর ধারণাটি মুজতবা আলীর সাহিত্যদর্শনের কেন্দ্রে বসানো যায়। ভাষা, ধর্ম, জাতি, দেশ—সব পরিচয়ই মানুষকে অন্য মানুষের থেকে আলাদা করে; কিন্তু সাহিত্য সেই বিভাজনের মধ্যে একটি গোপন সেতু নির্মাণ করে। যে আফগান মানুষটির সঙ্গে আমি একই ভাষায় কথা বলতে পারি না, তার দুঃখের সঙ্গে হয়তো আমার দুঃখের আশ্চর্য মিল আছে। যে ইউরোপীয় সংস্কৃতি আমাকে দূরের বলে মনে হয়, তার প্রেমিকের ঈর্ষা আমার কাছে মোটেই বিদেশি নয়।
মানুষের এই সামঞ্জস্য ও বৈসাদৃশ্যের মধ্যেই সাহিত্য তার সত্য ও অর্থ খুঁজে পায়। ‘ভাষা সংস্কৃতি সাহিত্য’ তাই তার চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দরজা। ভাষা এখানে সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, সংস্কৃতিও সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একটি ভাষা মানুষের জীবনযাপন, স্মৃতি, খাদ্য, গান, রসিকতা, শোক—সবকিছুকে বহন করে। সাহিত্য সেই বহনকৃত অভিজ্ঞতাকে আবার নতুন অর্থ দেয়। ফলে সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়। সাহিত্য স্মৃতিরও একটি প্রযুক্তি। যে সমাজ তার গল্প হারায়, সে ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় হারায়।
কিন্তু স্মৃতি মানেই অতীতের বন্দিত্ব নয়। ‘পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়’ নামটির মধ্যেই যেন মুজতবা আলীর চিন্তার এই দ্বন্দ্বটি ধরা পড়ে। পরিবর্তন অনিবার্য; কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু মানবিক আকাঙ্ক্ষা টিকে থাকে। মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়ের বোধ, সৌন্দর্যের অনুসন্ধান, ভালোবাসার প্রয়োজন—এসব নতুন যুগে নতুন ভাষা পায়, কিন্তু অদৃশ্য হয়ে যায় না। অতএব আধুনিকতার প্রশ্নটি ‘পুরোনো না নতুন’—এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো— কোন পুরোনো জিনিস এখনও জীবিত, আর কোন নতুন জিনিস আসলে পুরোনো ভয়ের নতুন পোশাক? মুজতবা আলীর রসবোধ এই প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষ করে তুলে।
‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’-এ মুজতবা আলীর রবীন্দ্রনাথ-স্মৃতি ও শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতার ভেতরেও এই মুক্তচিন্তার সূত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়। বইটিতে ‘গুরুদেব’ ও ‘শান্তিনিকেতন’—দুটি পরিসরে রবীন্দ্রনাথ, তার সাহিত্য-সংগীত এবং শান্তিনিকেতনের মানুষ ও পরিবেশ নিয়ে তার ভাবনা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তার কাছে কেবল পূজার আসনে বসানো একজন কবি নন। কারণ কোনো মানুষকে সত্যিকার অর্থে সম্মান করার একটি লক্ষণ হলো তার সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক স্থাপন করা। মূর্তির সঙ্গে তর্ক করা যায় না; মানুষের সঙ্গে যায়। মুজতবা আলীর সৌভাগ্য ছিল, তিনি রবীন্দ্রনাথকে মানুষ হিসেবে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এটা তার সাহিত্যিক স্বাধীনতা।

মুজতবা আলী কোনো ‘শিবির’-এর লেখক নন। তাকে কোনো একটি রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক খোপে স্থাপন করতে গেলে তার লেখার দরজা দিয়ে আমাদের বারবার বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ তার মন এক জায়গায় স্থির থাকে না। সে ভাষা থেকে ইতিহাসে যায়, ইতিহাস থেকে মানুষে, মানুষ থেকে রসিকতায়, রসিকতা থেকে দর্শনে—তারপর আবার ফিরে আসে একটি সাধারণ বাক্যে। সেই সাধারণ বাক্যটিই মুজতবা আলীর সাহিত্যের শক্তি।
গভীর সত্যকে সহজ ভাষায় বলা কঠিন। সহজ ভাষায় বলা কথা প্রায়ই গভীর হয় না, আর গভীর কথা প্রায়ই এমন ভাষায় লেখা হয় যে পাঠককে অভিধান নিয়ে বসতে হয়। মুজতবা আলীর কৃতিত্ব এই দুই বিপদের মাঝখানে হাঁটা। তিনি পাণ্ডিত্যকে প্রদর্শনীতে পরিণত করেননি; বরং পাণ্ডিত্যকে হাসির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। ফলে জ্ঞান তার লেখায় ভারী পাথর নয়, চলমান জল। আর জলই বোধ হয় তার সাহিত্যদর্শনের সবচেয়ে উপযুক্ত রূপক।
জল কোনো একটি পাত্রের মালিক নয়। তাকে যে পাত্রে রাখবেন, সে তার আকার নেবে; কিন্তু তার নিজস্ব প্রবাহ হারাবে না। ভাষাও তেমন। সংস্কৃতিও তেমন। মানুষও তেমন। তাই মুজতবা আলীকে পড়ার অর্থ শুধু একজন প্রাজ্ঞ, রসিক, বহু ভাষাজ্ঞ লেখককে পড়া নয়। তাকে পড়া মানে নিজের পরিচয়ের দেওয়ালগুলো পরীক্ষা করা। এই দেওয়ালগুলো কি সত্যিই প্রয়োজনীয়? হয়তো কিছু দরকার। মানুষকে কোথাও তো দাঁড়াতেই হয়। কিন্তু দাঁড়ানোর জায়গাকে যদি পৃথিবীর শেষ সীমানা মনে করি, তখনই বিপদ। মুজতবা আলীর সাহিত্য সেই বিপদের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ, মৃদু হাসি। তিনি যেন বলছেন—নিজের ভাষাকে ভালোবাসুন, কিন্তু অন্য ভাষাকে ভয় পাবেন না। নিজের সংস্কৃতিকে জানুন, কিন্তু তাকে মূর্তি বানাবেন না। আধুনিক হোন, কিন্তু আধুনিকতার বিজ্ঞাপন হয়ে উঠবেন না। পৃথিবী ঘুরে আসুন, কিন্তু ফিরে এসে নিজের উঠোনটিকেও নতুন চোখে দেখুন।
তার সাহিত্য আমাদের একটি অস্বস্তিকর অথচ মুক্তিদায়ক সত্যের সামনে দাঁড় করায়: মানুষ কোনো একক পরিচয় নয়। আমরা একই সঙ্গে আমাদের ভাষা, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভ্রমণ, আমাদের ভুল, আমাদের হাসি এবং আমাদের প্রশ্নের সমষ্টি।
সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রকৃত আধুনিকতা এখানেই—তিনি মানুষকে একটি বাক্যে শেষ করতে দেননি। আর যে লেখক তার পাঠককে শেষ বাক্যে পৌঁছেও প্রশ্নের মধ্যে রেখে যেতে পারেন, তার বই বন্ধ হয়; কিন্তু পাঠ শেষ হয় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









