ক্যাম্পোস দস গোইতাকাজেস শহরের মানুষজন বলে, ‘আও লিভ্রো ভের্দে’-এর বয়স এত বেশি যে দোকানটি চাইলে শহরের সবার জন্মের তারিখ মনে রাখতে পারে। কেউ এই কথার প্রতিবাদ করে না। কারণ ১৮৪৪ সালে যখন দোকানটি খুলেছিল, তখন ব্রাজিল এখনো সাম্রাজ্য। প্রজাতন্ত্রের জন্ম হতে আরও পঁয়তাল্লিশ বছর বাকি। কিন্তু দোকানটি তখন থেকেই ভবিষ্যতের জন্য বই সাজিয়ে রাখতে শুরু করেছিল।
দোকানটি শুরু করেছিলেন পর্তুগাল থেকে আসা হোসে ভাজ কোইমব্রা। সেই সময় পর্তুগাল থেকে বহু পরিবার প্যারাইবা দো সুল নদী ধরে ক্যাম্পোসে আসত। তাঁদের সঙ্গে আসত বইয়ের চাহিদা। ফলে ‘আও লিভ্রো ভের্দে’ প্রথমে ছিল দূরদেশের বই পাওয়ার একটি দরজা—একটি ছোট শহরে ইউরোপের মুদ্রিত পৃথিবীর প্রবেশপথ।
তখন বইয়ের দোকান মানেই শুধু বই নয়। ১৮৪৪ সালের বিজ্ঞাপনে বইয়ের সঙ্গে স্কুলের সামগ্রী, কাগজ, বাদ্যযন্ত্র, সুগন্ধি, গয়না, ওষুধের উপকরণ, এমনকি নস্যিরও উল্লেখ ছিল। মনে হয়, দোকানটি নিজেই জানত না সে আসলে কী। সম্ভবত সে জানত—মানুষের প্রয়োজনের তালিকা কখনো বইয়ের তাকের মতো সোজা হয় না। বছর যেতে লাগল।
১৮৮৮ সালে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলো। পরের বছর সাম্রাজ্যের পতন হয়ে জন্ম নিল প্রজাতন্ত্র। তারপর এল দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মহামারি, রেডিও, সিনেমা, টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট। পৃথিবী একের পর এক নতুন জিনিস আবিষ্কার করল, কিন্তু ‘আও লিভ্রো ভের্দে’ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। যেন শহরের একটি পুরোনো গাছ, যার পাতাগুলো বদলায়, কিন্তু শিকড়টি কোথাও যায় না।
এই দীর্ঘ জীবনে দোকানটি কেবল বই বিক্রি করেনি। সে মানুষ জমিয়েছে। ক্যাম্পোসের লেখক ‘হোসে কান্দিদো দে কারভালহো’ ছিলেন তাদের একজন। তার ‘ও কোরোনেল ই উ লোবিসোমে’ উপন্যাসে দোকানটি জায়গা পেয়েছে। তার অসমাপ্ত ‘ও হেই বালতাজার’-এও দোকানের সঙ্গে যুক্ত এক বাস্তব মানুষের ছায়া চরিত্র হয়ে ফিরে এসেছে। এভাবেই কখনো কখনো বাস্তব জীবন সাহিত্যে ঢোকে, আবার সাহিত্য ফিরে এসে বাস্তবের ঘরে বসে পড়ে। দোকানটির দরজা দিয়ে আরও গেছেন নিলো পেচানিয়া, অউস্ত্রেজিলিও দে আতাইদে, কার্লোস হেইতোর কোনি, জিরাল্দোর মতো মানুষ। ফলে ‘আও লিভ্রো ভের্দে’ ধীরে ধীরে বই বিক্রির স্থান থেকে শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি ঘরে পরিণত হয়।
আর তারপর জন্ম নেয় একটি গল্প। বলা হয়, প্রিন্সেস ইসাবেল যে কলম দিয়ে দাসপ্রথা বিলোপের আইন—‘লেই আওরেয়’—স্বাক্ষর করেছিলেন, সেটি নাকি এই দোকান থেকেই কেনা হয়েছিল। ইতিহাস এই গল্পের পক্ষে নিশ্চিত সাক্ষ্য দেয় না। তবু গল্পটি থেকে গেছে। কারণ মানুষের স্মৃতি কখনো কখনো সত্যকে সংরক্ষণ করে দলিলে নয়, কিংবদন্তিতে।
হয়তো সেই কারণেই পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো এত রহস্যময়। একটি বইয়ের দোকান জানে কোন বই বিক্রি হয়েছে। কিন্তু সে জানে না কোন বই একজন মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। ‘আও লিভ্রো ভের্দে’-এর গুরুত্ব এখানেই। এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, গবেষণাকেন্দ্রও নয়। কিন্তু ব্রাজিলের সাহিত্য ও পাঠসংস্কৃতির ইতিহাসে এটি একটি জীবন্ত নথি। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে বোঝার জন্য শুধু লেখকদের বই পড়লেই হয় না; জানতে হয় সেই বই কোথায় পৌঁছেছিল, কার হাতে গিয়েছিল, কোন শহরে পাঠের অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। একটি পুরোনো বইয়ের দোকান সেই অদৃশ্য ইতিহাসের সাক্ষী।

অ্যাকাডেমিয়া ব্রাসিলেইরা দে লেত্রাস ২০২৩ সালে দোকানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক উদ্যোগে যোগ দিয়েছিল। তখন জানা যায়, দোকানটি আর্থিক সংকটে আছে, শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রও আগের মতো প্রাণবন্ত নেই, আর বইয়ের বাজারও বদলে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে—যে দোকান দাসপ্রথার বিলোপ দেখেছে, সাম্রাজ্যের পতন দেখেছে, দুটি বিশ্বযুদ্ধ পার করেছে, মহামারি পার করেছে, সে আজ বই বিক্রি করে বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার সম্ভবত এটাই। যে জিনিসগুলো আমাদের সবচেয়ে পুরোনো বলে মনে হয়, সেগুলোও প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। ১৮৪৪ সালে ‘আও লিভ্রো ভের্দে’ যখন দরজা খুলেছিল, তখন কেউ জানত না সে প্রায় দুই শতাব্দী পরও থাকবে। আজ আমরা জানি সে আছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।
তাই হয়তো কোনো এক সকালে দোকানের দরজা খুলবে, সূর্যের আলো পুরোনো বইয়ের ওপর পড়বে, আর কোনো অচেনা পাঠক একটি বই হাতে তুলে নেবে। সে জানবে না, তার আগে সেই বই কে পড়েছিল। জানবে না, দোকানের দেয়াল কত ইতিহাস শুনেছে। জানবে না, তার হাতে ধরা বইটির ভেতর দিয়ে সে এক মুহূর্তের জন্য ১৮৪৪-এ ফিরে গেছে। আর দোকানটি—যে সবকিছু মনে রাখে—চুপ করে থাকবে। কারণ পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো কথা বলে না।
তারা অপেক্ষা করে। একজন নতুন পাঠকের জন্য, যে এসে তাদের ভুলে যাওয়া সময়টুকু আবার পড়ে নেবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









