দৈনিক এদিন অনলাইন ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে তার চিঠিগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করছে। পাঠক আসনু আমরা কাফকার আজকের চিঠিগুলোর মধ্য দিয়ে কাফকার জগতে পুনরায় প্রবেশ করি।
১৪ নভেম্বর, ১৯১২
প্রিয়তমা, আমার প্রিয়তমা! পৃথিবীতে যত দিন এত মঙ্গল, এত ভালো কিছু রয়ে গেছে, তত দিন ভয় পাওয়ার, উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার চিঠি যখন এল, আমি তখন আমার ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে ফেল্ডস্পার খনির বিমা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। চিঠিটা আমি ছিনিয়ে ; বরাবরের মতো হাত কাঁপছিল, আর ঊর্ধ্বতনের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলাম, যেন তিনি কোনো ভূত। কিন্তু চিঠিটা দু-তিনবার পড়ার পরই আমার ভেতরে এমন শান্তি নেমে এল, যার জন্য কত দিন ধরে আকুল হয়ে ছিলাম, আর তিন রাত আগেও যার জন্য প্রার্থনা করেছিলাম।
তোমার ‘তুমি’ লেখা খাম—না, এভাবে বলা ঠিক হলো না; বলতে হবে, ‘সেই’ খাম। অথচ ‘তুমি’ আর ‘তোমার’ শব্দ দুটি বারবার নিজেদের জানান দিতে চায়, কিছুতেই আড়ালে থাকতে চায় না। যাই হোক, সেই খামের সান্ত্বনাদায়ক কথাগুলো নিশ্চয়ই আমার শান্তির কারণ নয়; সেগুলো তো আমি পরে পড়েছি। চিঠির ভেতরের কথাগুলো বরং আমাকে আরও অস্থির করে তোলার কথা ছিল। এই ঘূর্ণায়মান পৃথিবীতে মানুষ যত বেশি পায়, ততই তো তার ভয় বেড়ে যাওয়ার কথা। তাহলে আমাকে শান্ত করল কী? নিশ্চয়ই সেই ‘তুমি’, যে আমাকে এক মুহূর্তে নিজের মুঠোয় ধরে ফেলেছিল। সেই ‘তুমি’র জন্য আমি মাথা নুয়ে তোমাকে ধন্যবাদ জানাই। তোমার জন্য আমার উদ্বেগই শব্দটিকে আমার ভেতর থেকে বের করে এনেছিল; আর এখন তুমি শান্ত হাতে সেটি আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ।
প্রিয়তমা, এবার কি সত্যিই তোমাকে নিজের বলে নিশ্চিত হতে পারি?
‘আপনি’ শব্দটি যেন বরফের ওপর দিয়ে পিছলে চলে যায়। দুটো চিঠির মাঝখানের ফাঁকে কখন যে হারিয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না। সকাল, দুপুর, রাত—চিঠি আর চিন্তার সাহায্যে তাকে খুঁজে বেড়াতে হয়। কিন্তু ‘তুমি’ শব্দটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এখানেই থাকে, ঠিক তোমার চিঠির মতো; চিঠিটা বারবার চুমু খেলেও একটুও নড়ে না।
কিন্তু কী আশ্চর্য একটি শব্দ! বিশেষত তোমার আর আমার মতো দুজন মানুষের মধ্যে, যাদের সম্বল বলতে প্রায় সবই শব্দ, এমন সম্পূর্ণ একাত্মতা আর কোনো কিছুই তৈরি করতে পারে না। আজ অফিসে আমিই ছিলাম সবচেয়ে শান্ত মানুষ। গত সপ্তাহের মতো একটি সপ্তাহ পার করার পর যে শান্তি কেবল সবচেয়ে সংযমী মানুষই আশা করতে পারে, আজ আমার মধ্যে সেই শান্তি ছিল। এ নিয়ে পরে আরও বলব। ভাবতে পারো, আজ আমাকে দেখতেও নাকি বেশ ভালো লাগছিল! অফিসে কয়েকজন আছেন, যাদের প্রতিদিনের কাজই হলো আমার চেহারা খুঁটিয়ে দেখা। তারাই কথাটা বলেছেন। তোমার চিঠির উত্তর দিতে আমি তাড়াহুড়ো করিনি—আজ তাড়াহুড়ো করার উপায়ও ছিল না। কিন্তু আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস তোমার কাছে উত্তর পাঠিয়েছে, তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
প্রিয়তমা, আমার প্রিয়তমা! এই শব্দ দুটি যদি পাতার পর পাতা লিখে যেতে পারতাম! কিন্তু ভয় হয়, তুমি যখন একই রকম দেখতে এতগুলো পাতার ওপর চোখ বুলিয়ে যাচ্ছ, তখন হঠাৎ কেউ তোমার ঘরে ঢুকে পড়লে কীভাবে লুকাবে তুমি, কী পড়ছ? তাই থেমে যাই। গতকাল তোমাকে কয়েকটি মাত্র লাইন লিখেছিলাম। চিঠিটা তুমি পাবে রবিবার। এখন আর সেটি ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন; অবশ্য তার প্রয়োজনও নেই। শুধু জানিয়ে রাখছি, যাতে অকারণে চমকে না ওঠো। তোমাকে চমকে দেওয়ার কাজটা এত দিন আমি যথেষ্টই করেছি! কয়েকটি লাইন মাত্র, তারিখ নেই, শিরোনাম নেই, স্বাক্ষরও নেই। তোমাকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার এক করুণ, অনিশ্চিত চেষ্টা। ওদের প্রতি একটু সদয় হয়ো। কিন্তু বলো তো, তুমি কী করে বুঝলে, সম্প্রতি তোমাকে একবার লিখছি, আবার থেমে যাচ্ছি—এসব ছিল যন্ত্রণা, উন্মাদনা নয়? আমার নিজের কাছেই তো মনে হয়েছে, ব্যাপারটা উন্মাদনার দিকেই বেশি ঝুঁকেছিল। আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, তাহলে হয়তো সম্পর্ক থেকে সরে আসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম।
শেষ চিঠিটার কথাই ধরো। ওটা লেখা হয়নি; ক্ষমা করো, শব্দটা একটু অস্বস্তিকর—ওটা যেন আমার ভেতর থেকে উগরে পড়েছিল। বিছানায় শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আমার ভেতরে একটা ভয়ংকর বাক্য জন্ম নিয়েছে। বাক্যটির মধ্যে কোনো পরপর সাজানো কথা ছিল না; সে ছিল একটিমাত্র অখণ্ড, ভয়াবহ উচ্চারণ। লিখে না ফেললে সেটাই আমাকে মেরে ফেলবে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু লিখতে শুরু করার পর ব্যাপারটা আর তত ভয়ংকর থাকল না। আমি ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিলাম, স্মৃতির পেছনে হাঁটলাম, আর এখানে-সেখানে কয়েকটি ছোটখাটো সান্ত্বনাদায়ক অসত্যও চিঠির মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারপর কী সহজেই চিঠিটা নিয়ে রওনা দিলাম ডাকঘরের দিকে, কী তাড়াতাড়ি সেটি পাঠিয়ে দিলাম! বাড়ি ফিরলাম গভীরভাবে অসুখী, কিন্তু তখনো বেঁচে আছি। তারপর ঘুমোতে যাওয়ার আগের সেই ভয়ংকর দুই ঘণ্টা আবার আমার সমস্ত মানসিক অবস্থা বদলে দিল।
এসব থাক। এবার তোমার চিঠি আবার পাব। যখন ইচ্ছে লিখবে, বরং বলা ভালো, যখন পারবে। আমার জন্য অফিসে দেরি করে থেকো না। চিঠি না পেলেই যে আমি ভেঙে পড়ব, এমন নয়। আর যখন আবার চিঠি পাব, সেটি আমার হাতে এমনভাবে জীবন্ত হয়ে উঠবে, যেমন আর কোনো চিঠি কখনো হয়ে ওঠেনি বলে আমার মনে হয়। আমার চোখে, আমার ঠোঁটে, তোমার সেই চিঠি তোমার না-লেখা সব চিঠির অভাব পূরণ করে দেবে। অন্যদিকে, তোমার হাতে একটু বেশি সময় থাকবে এই সুন্দর সন্ধ্যাগুলোয় হাঁটতে বেরোনোর। গতকাল রাত দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত আমার ছোট বোনটির সঙ্গে হাঁটতে গিয়েছিলাম। তুমি হয়তো তাকে কল্পনা করতে পারবে না। তার বয়স বিশ, লম্বায় ও শক্তিতে প্রায় অসাধারণ, অথচ এখনো শিশুর মতো। যদি মহড়ায় ছুটে যেতে না হয়, তাহলে আশা করি সন্ধ্যাগুলো তুমি উপভোগ করবে। তোমার ‘হিউমর’ নাটকটির মহড়া যেন ভালোভাবে শেষ হয়!
তোমার কথা ভেবে আমি ম্যাক্সকে কত যে জ্বালিয়েছি! কয়েকবার হাঁটতে বেরিয়ে তার হাত প্রায় মুচড়ে দিয়েছি। অথচ নির্বোধ লোকটা টেলিফোনে তোমাদের কথোপকথন সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলতে পারে না—শুধু তোমার হাসির কথা ছাড়া। তুমি যদি টেলিফোনে হাসতে পারো, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি টেলিফোনে কথা বলার কাজে খুবই দক্ষ। টেলিফোনের কথা মনে হলেই আমার হাসি হারিয়ে যায়। তা না হলে তোমাকে শুভরাত্রি জানাতে আমি কেন এক্ষুনি ডাকঘরের দিকে ছুটে যাব না? কিন্তু সেখানে এক ঘণ্টা বসে থাকতে হবে, কখন সংযোগ পাওয়া যায় সেই অপেক্ষায়; উৎকণ্ঠায় চেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। অবশেষে যখন ডাক পড়বে, তখন কাঁপতে কাঁপতে ছুটে গিয়ে রিসিভার তুলব, দুর্বল গলায় তোমার নাম বলব, তারপর তোমার কণ্ঠ শুনেও হয়তো কোনো উত্তর দিতে পারব না। তিন মিনিট শেষ হলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেব, অথচ তখনই তোমার সঙ্গে সত্যিকারের কথা বলার জন্য এমন অসহ্য আকুলতা জন্মাবে যে আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারব না—বাড়ি ফিরে যেতে চাইব, যেখানে অন্তত তোমার সঙ্গে কথা বলার কল্পনাটুকু করা যায়।
না, বরং টেলিফোন না করাই ভালো। তবু সম্ভাবনাটা মন্দ নয়। তোমার টেলিফোন নম্বরটা কী? আমার ভয় হচ্ছে, ম্যাক্স ভুলে গেছে। যাক, সব ঠিকঠাক। এবার আমার ঘুম নিশ্চয়ই ভাল হবে। প্রিয়তমা, আমার প্রিয়তমা, আমি সংগীতের কিছুই বুঝি না। তবু এই কথাগুলোর মধ্যে কি সংগীতের জন্য একটুও আকুলতা নেই?
তোমার,
ফ্রানৎস
#
১৪ নভেম্বর, ১৯১২
প্রিয়তমা, তোমার কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চাই না। শুধু শুভরাত্রি জানাতে এলাম। এই কয়েকটি কথা লেখার জন্য নিজের লেখার মাঝখানে থেমে গেছি।
আমার ভয় হচ্ছে, শিগগিরই হয়তো তোমাকে আর লিখতে পারব না। কাউকে চিঠি লিখতে হলে—একবারের জন্য তোমাকে ‘কেউ একজন’ বলি, যদিও তোমাকে নানা নামে ডাকতে হয়—যার উদ্দেশে লিখছি, তার মুখটি মনে স্পষ্ট থাকতে হয়। তোমার মুখ আমার মনে স্পষ্ট, সেখানে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু তার চেয়েও স্পষ্ট হয়ে উঠছে আরেকটি ছবি, যা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বারবার মনে আসে। ছবিটিতে আমার মুখ তোমার কাঁধে রাখা। আমি তোমার কাঁধে, তোমার পোশাকে, কিংবা নিজের কাছেই কথা বলে চলেছি। কথাগুলো চাপা, অস্পষ্ট; যেন কাঁধের কাপড়ে মুখ ডুবিয়ে কথা বলছি। আর তুমি কিছুই বুঝতে পারছ না, আমি কী বলছি। তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ? নাকি এখনো বই পড়ছ—যা আমি মোটেই সমর্থন করি না? নাকি এখনো মহড়ায় ব্যস্ত? অন্তর থেকে আশা করি, তা যেন না হয়।
আমার ঘড়ি সব সময় একটু পিছিয়ে থাকে, কিন্তু কখনো নষ্ট হয় না। তার হিসাবে এখন রাত একটা বাজতে সাত মিনিট বাকি। মনে রেখো, অন্যদের চেয়ে তোমার বেশি ঘুমানো দরকার। আমি বেশির ভাগ মানুষের চেয়ে কম ঘুমাই, যদিও খুব বেশি কম নয়। পৃথিবীর সবার জন্য বরাদ্দ ঘুমের মধ্যে আমার যে অংশটুকু ব্যবহার করা হয় না, তা তোমার প্রিয় চোখ দুটির মধ্যে জমা করে রাখার চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে? আর কোনো উদ্ভট স্বপ্ন দেখবে না, দয়া করে!
মনে মনে তোমার বিছানাটিকে ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সবাইকে চুপ থাকতে বলছি। সেখানে সবকিছু গুছিয়ে দেওয়ার পর, হয়তো ইমানুয়েলকির্শস্ট্রাসে ঘুরে বেড়ানো কোনো মাতালকেও তাড়িয়ে দিয়ে, আবার ফিরে আসব নিজের লেখার কাছে। তখন আমার ভেতরটাও হয়তো একটু গুছিয়ে যাবে। অথবা সোজা ঘুমিয়ে পড়ব।
প্রিয়তমা, আমি যখন তোমাকে লিখি, তখন তুমি মোটামুটি কী করছ, তা আমাকে জানাতে কখনো ভুলবে না। আমি নিজের অনুমানের সঙ্গে তোমার বলা ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখব। সম্ভব হলে তুমি ঘটনাগুলোকে আমার অনুমানের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। বারবার চেষ্টা করতে করতে একদিন যদি আমাদের অনুমান আর বাস্তবতা মিলে যায়, যদি তারা এক হয়ে এমন একটি বৃহৎ সত্যে পরিণত হয়, যার ওপর আমরা সব সময় নির্ভর করতে পারি—তাহলে কি ব্যাপারটা খুব অবিশ্বাস্য হবে?
এইমাত্র প্রাগের সময় রাত একটা বাজল। টাওয়ারের ঘড়ি সেই কথাই জানিয়ে দিল।
বিদায়, ফেলিসে, বিদায়!
তোমার এই নামটি কীভাবে হলো? আর হারিয়ে যেয়ো না!
কথাটা হঠাৎ মনে এল। হয়তো ‘বিদায়’ শব্দটির কারণেই। শব্দটির মধ্যে যেন হারিয়ে যাওয়ার একটা টান আছে। আমার মনে হয়, অনেক উঁচুতে উড়ে যাওয়ার মধ্যে অসাধারণ আনন্দ পাওয়া যেতে পারে—যদি তাতে এমন কোনো ভারী বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, যা মানুষের গায়ে লেগে থাকে। যেমন আমি তোমার সঙ্গে লেগে আছি। কিন্তু এই মুক্তির হাতছানিতে সাড়া দিয়ো না। এই ভ্রমটুকু আঁকড়ে ধরে থেকো যে তোমার আমাকে প্রয়োজন। নিজেকে এই বিশ্বাসের মধ্যে আরও গভীরভাবে ডুবিয়ে দাও। এতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না, তুমি জানো। আর কোনো দিন যদি আমাকে ছেড়ে দিতে চাও, সে শক্তি তোমার সব সময়ই থাকবে।
কিন্তু তত দিন তুমি আমাকে এমন একটি উপহার দিয়েছ, যা এই জীবনে কখনো পাওয়ার স্বপ্নও দেখিনি। ব্যাপারটা এমনই, তুমি ঘুমের মধ্যে মাথা নেড়ে অস্বীকার করলেও।
ফ্রানৎস


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









