২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ের পর কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক অ্যান কারসন চীনের পাঠকমহলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। একসময় সীমিতসংখ্যক সাহিত্যপ্রেমীর কাছে পরিচিত এই লেখকের বই এখন ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করছে। চীনা অনুবাদে প্রকাশিত তার বইয়ের বিক্রি বেড়েছে, আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তার লেখার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরপরই কারসনের কবিতার বই ‘নক্স’–এর অবশিষ্ট মজুত শেষ হয়ে যায়। বইটির বিশেষ সংস্করণে রয়েছে ২৬ মিটার দীর্ঘ অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা পৃষ্ঠা। মাত্র ২ হাজার ২৬টি কপি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে পুরোনো বই কেনাবেচার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এর পুনর্বিক্রয়মূল্য চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানা গেছে।
কারসনের বই প্রকাশেও গতি এসেছে। চীনের ইলিন প্রেস তার ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ ও ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ এক মলাটে প্রকাশ করেছিল। নোবেল ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই বইটি দুবার পুনর্মুদ্রণ করা হয়। প্রকাশনা সংস্থাটির এক সম্পাদক গ্লোবাল টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে, কারসনের আরও বই চীনা ভাষায় প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সিচুয়ান পিপলস পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হবে ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের পোস্ট ওয়েভ পাবলিশিং কোম্পানি ও গুয়াংজুর ফ্লাওয়ার সিটি পাবলিশিং হাউস যৌথভাবে প্রকাশ করবে ‘প্লেইনওয়াটার: প্রবন্ধ ও কবিতা’।
তবে বইয়ের বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—পাঠকেরা অ্যান কারসনের বই কিনছেন ঠিক কী কারণে? সুইডিশ একাডেমি তার লেখাকে ‘সাহসী ও উদ্ভাবনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ধ্রুপদি সাহিত্যধারার সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন রূপ তৈরি করেছেন বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
‘প্লেইনওয়াটার: প্রবন্ধ ও কবিতা’ বইটির অনুবাদক ছেং জিয়া মনে করেন, কারসনের লেখার ধরন, বিরামচিহ্নের ব্যবহার ও শব্দচয়ন বুঝতে এই মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, লেখকের ভাষাকে অতিরিক্ত সহজ বা পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করলে মূল লেখার স্বকীয়তা হারিয়ে যেতে পারে।
অনুবাদে কঠিন চ্যালেঞ্জ
চীন কারসনের লেখার প্রধান বিষয় নয়। তবে কোনো চিন্তা বা প্রশ্ন ব্যাখ্যা করতে প্রয়োজন হলে চীনা দর্শন ও কবিতার উল্লেখ তার লেখায় উঠে আসে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যাবিনেট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘টোটালিটি: দ্য কালার অব ইক্লিপস’ প্রবন্ধে সূর্যগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি প্রথমেই গ্রিক পুরাণের আশ্রয় নেননি। বরং শুরু করেছেন চীনা ব্যাখ্যা দিয়ে। এরপর তুলে এনেছেন তাং রাজবংশের কবি লু থুংয়ের চন্দ্রগ্রহণবিষয়ক কবিতার পঙ্ক্তি এবং দাওবাদী দার্শনিক লাওৎসের একটি সতর্কবাণী।
এরপর তিনি ফিরে গেছেন ইংরেজি ‘ইক্লিপস’ শব্দের গ্রিক উৎসের দিকে। এভাবেই চীনা দর্শন, প্রাচীন কবিতা ও গ্রিক শব্দের ইতিহাস তার লেখায় পাশাপাশি জায়গা করে নেয়। চীন এখানে কোনো বিচিত্র পটভূমি নয়; বরং বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত ভান্ডারের একটি অংশ। সেই ভান্ডারে গ্রিক কবি স্যাফো, ব্রিটিশ লেখক ভার্জিনিয়া উলফ ও মার্কিন কবি এমিলি ডিকিনসনের মতো লেখকেরাও রয়েছেন।
এই আন্তসংযোগই কারসনের লেখা অনুবাদকে কঠিন করে তোলে। ছেং জিয়ার মতে, লেখার ভেতরে থাকা উদ্ধৃতি ও সাহিত্যিক সূত্র শনাক্ত করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো কোনো সূত্র খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান করতে হয়েছে। আবার কোনো ভাবের উপযুক্ত চীনা প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়াও সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রতিটি সূত্রের সমাধানে আটকে না থেকে মূল লেখার অর্থ ও সুর ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

অনুবাদের চুক্তি হয়েছিল ২০২১ সালে, আর অনুবাদ জমা দেওয়া হয় ২০২৩ সালে। ছেং জিয়া একে চুক্তির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুবাদ করা তার সবচেয়ে কঠিন বই বলে উল্লেখ করেছেন। নোবেল স্বীকৃতি তাকে আনন্দিত করলেও কাজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি।
ভিন্ন ধারার লেখায় সংযোগের খোঁজ
‘প্লেইনওয়াটার: প্রবন্ধ ও কবিতা’ বইটির চীনা সম্পাদক ঝাও বো মনে করেন, আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন বিষয় ও সাহিত্যরীতির মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতাই কারসনের মৌলিকত্বের অন্যতম দিক। বইটিতে কবিতা, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার ও অনুবাদ মিলেমিশে রয়েছে। পাঁচটি অংশে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় ও প্রকাশভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে।
কারসনের নিরিক্ষামূলক লেখা যাদের কাছে কঠিন মনে হয়, তাদের জন্য ছেং জিয়া এই বই দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বইটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে, এমন নয়। পাঁচটি অংশ আলাদাভাবেও পড়া যায়। পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন অংশে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
নোবেল পুরস্কারের আগে চীনে কারসনের পাঠকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। পুরস্কার তাকে বৃহত্তর পাঠকমহলে পৌঁছে দিতে পারে। তবে তার লেখার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে পাঠকেরা পুরস্কারের আকর্ষণ পেরিয়ে কতটা তার কবিতা, সাহিত্যিক সূত্র ও ব্যতিক্রমী প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, তার ওপর।
ছেং জিয়ার ভাষায়, নোবেল পুরস্কার কারসনকে চীনে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। কিন্তু তার লেখার খণ্ডিত অংশ, ধ্রুপদি সাহিত্যের প্রতিধ্বনি ও নিরীক্ষাধর্মী প্রকাশভঙ্গির ভেতর দিয়ে পাঠকের যে যাত্রা, তা একান্তই ব্যক্তিগত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









