ইন-ইয়াং দর্শন এভাবে ব্যাখ্যা করে:
“সূর্য যখন চাঁদকে গ্রাস করে, চাঁদের আলো নিভে যায়। চাঁদ যখন সূর্যকে ঢেকে ফেলে, সূর্যের আলো হারিয়ে যায়।”
কিন্তু এই ব্যাখ্যায় আমার মন সায় দেয় না। কনফুসিয়াসের শিক্ষক লাওৎসে বরং ভালো কথা বলেছিলেন:
“পাঁচটি রং মানুষের চোখ অন্ধ করে দেয়।”
—লু থুং, গ্রহণ (নবম শতক)
আপনি হয়তো ভাববেন, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের কোনো রং থাকার কথা নয়। ইক্লিপস শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক এক্লেইপসিস থেকে। অর্থ—পরিত্যাগ, ছেড়ে চলে যাওয়া, একা ফেলে যাওয়া। সূর্য আমাদের ছেড়ে যায়। আলো আমাদের পরিত্যক্ত করে।
কিন্তু যারা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখেছেন, তারা এর শূন্যতা ও অনুপস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এমন তীব্র ভাষা ব্যবহার করেন যে, সেই শূন্যতাই যেন রং পেতে শুরু করে। রং আসলে কী? এমন কিছু, যা রংহীন নয়। আলোর কি দ্বিগুণ নেতিবাচকতা তৈরি করা যায়? তা কি এমন, যেন স্বপ্ন থেকে ভুল দিকে জেগে উঠে নিজের মনের উল্টো পিঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন?পূর্ণগ্রাসের ভেতরে একটি মুহূর্ত আসে, যখন সবকিছু উল্টে যায়।
এমিলি ডিকিনসন বিড়বিড় করেন, “প্রকৃতি নিজেকেই উল্টে দেয়।”
চাঁদের ছায়া যখন আপনার ওপর দিয়ে চলে যায়, মনে হতে পারে বিষণ্নতার এক ঝটকা আপনাকে আঘাত করল। অথবা ঘূর্ণিঝড়, কামানের গোলা, ধীরপায়ে এগিয়ে আসা কোনো দেবতা, কাত হয়ে পড়া নৌকা কিংবা বাহুতে ঢুকিয়ে দেওয়া অবশ করার ওষুধের মতো কিছু। মানুষ এসব উপমাই ব্যবহার করেছে। ধোঁয়াটে কাচ কিংবা বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে তাকালে আপনি দেখবেন, আলোর বর্ণালির কিছু রেখা উজ্জ্বল হচ্ছে। তারপর একটি ঝলক। রেখাগুলো উল্টে যায়। অন্য একটি বর্ণালি দেখা দেয়। কিছু রেখা হারিয়ে যায়, অন্যগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

এখন আপনি চাঁদের ছায়ার ভেতরে। ছায়াটি প্রায় একশ মাইল প্রশস্ত। ঘণ্টায় দুই হাজার মাইল বেগে ছুটে চলে।
অনুভূতিটি বিশাল। মনে হয়, আলো ও রং সম্পর্কে এত দিন যা কিছু জেনেছেন, তার সবকিছুর সঙ্গে এক অসম লড়াই শুরু হয়েছে। ভার্জিনিয়া উলফ তার দ্য সান অ্যান্ড দ্য ফিশ প্রবন্ধে এই লড়াইকে একটি দৌড় হিসেবে দেখেছেন। ১৯৩০ সালের ২৯ জুন রিচমন্ডের কাছে বারডন ফেল প্রান্তরে সূর্যগ্রহণের দৃশ্য লিখতে গিয়ে তিনি বলেন, সূর্যকে মেঘের ভেতর দিয়ে ছুটে গিয়ে ডান দিকে একটি সরু স্বচ্ছ জায়গায় পৌঁছাতে হবে। নির্ধারিত কয়েকটি মুহূর্ত ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই।
দৌড়টি শেষ হয় পরাজয়ে।
উলফ লিখেছেন, সময় ফুরিয়ে আসছিল। তারা বুঝতে পারছিলেন, সূর্য হেরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সে হেরেই গেল। প্রান্তরের সব রং মুছে যেতে শুরু করল। নীল বেগুনি হয়ে গেল। সাদা রং হয়ে উঠল ভয়ংকর ঝড়ের আগের বিবর্ণ আভা—যে ঝড়ে বাতাসও যেন নড়ে না। গোলাপি মুখগুলো সবুজ হয়ে গেল। ঠান্ডা আরও বেড়ে গেল।
এটাই ছিল সূর্যের পরাজয়। রং পাল্টে যাওয়ার পর, সূর্য হেরে যাওয়ার পর, কীভাবে আবার সামনে এগোনো যায়?
উলফ লিখেছেন, “এটাই ছিল শেষ। পৃথিবীর মাংস ও রক্ত মৃত হয়ে গিয়েছিল।”
অন্যরাও গ্রহণের সেই মুহূর্তে একধরনের ভুল হয়ে যাওয়ার অনুভূতির কথা বলেছেন। এমিলি ডিকিনসন সংক্ষেপে বলেছিলেন, “ঈশ্বরের ঘড়ি—ভুল চলছে!”
অ্যানি ডিলার আরও বিস্তারিত লিখেছেন:
“সূর্য চলে যাচ্ছিল, আর পৃথিবী ভুল হয়ে উঠছিল। ঘাসগুলোও ভুল ছিল; সেগুলো প্লাটিনামের মতো দেখাচ্ছিল... এই রং পৃথিবীতে আগে কখনো দেখা যায়নি... কোনো ভুলের কারণে আমি তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
ভুলেরও নিজস্ব রং আছে। সেই রং অন্য কোনো কিছুর মতো নয়। এমনকি আরেকটি গ্রহণের মতোও নয়। ডিলার ১৯৭০ সালে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন। তার মতে, আংশিক গ্রহণের সঙ্গে পূর্ণগ্রাসের প্রায় কোনো সম্পর্কই নেই। একজন পুরুষকে চুমু খাওয়া আর তাকে বিয়ে করার মধ্যে যে পার্থক্য, এ দুই অভিজ্ঞতার ব্যবধানও ঠিক তেমন।
উপমাটি লক্ষ করুন।
পূর্ণগ্রাস নিয়ে লেখালেখিতে এমন তীব্র উপমার অভাব নেই। আর এই বিপর্যস্ত মুহূর্তে চুমু ও বিয়ের কথা মনে পড়াও অস্বাভাবিক নয়। গ্রহণের বহু পৌরাণিক ব্যাখ্যায় যৌনতা কিংবা তার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। প্রাচীন জার্মান লোককথায় বলা হয়, পুরুষ চাঁদের সঙ্গে নারী সূর্যের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু চাঁদ সূর্যের আগুনের মতো আবেগ সামলাতে পারত না। সে শুধু ঘুমাতে চাইত। তারা বাজি ধরল—সকালে যে আগে ঘুম থেকে উঠবে, দিনের শাসনভার তার হাতে থাকবে। রাত তিনটাতেও সূর্য ছিল অস্থির। শেষ পর্যন্ত সে জিতল। কিন্তু শপথ করল, আর কখনো চাঁদের সঙ্গে শোবে না। শিগগিরই দুজনেই বিচ্ছেদের জন্য অনুতপ্ত হলো। আবার একে অপরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এভাবেই তৈরি হলো গ্রহণ। কিন্তু মিলনের পরপরই ঝগড়া শুরু হয়। তারা আবার আলাদা হয়ে যায়। রাগে সূর্যের মুখ রক্তলাল। ইতিহাসবিদেরাও গ্রহণের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক খুঁজেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৫ সালে লিডিয়া ও মিডীয়দের যুদ্ধের মাঝখানে একটি সূর্যগ্রহণ ঘটেছিল। হেরোডোটাসের বর্ণনা অনুযায়ী, আকাশের অস্বাভাবিক দৃশ্য দুই বাহিনীকে এতটাই বিচলিত করেছিল যে তারা যুদ্ধ থামিয়ে দেয়। পরে দুই শাসকের সন্তানদের মধ্যে বিয়ের ব্যবস্থা করে যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত হয়।
কবিরাও পূর্ণগ্রাসের সঙ্গে দাম্পত্যের যোগসূত্র দেখেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের গ্রিক কবি আর্কিলোকাসের একটি খণ্ডিত কবিতায় এক বাবা মেয়ের বিয়ের পরিকল্পনা নিয়ে অভিযোগ করেন। গ্রহণ সেখানে মেয়ের আচরণের উপমা।
“পৃথিবীতে আর কিছুই বিস্ময়কর নয়, অবিশ্বাস্য নয়, অসম্ভব নয়—এখন, যখন জিউস দুপুরকে রাতে পরিণত করেছেন, সূর্যের জ্বলন্ত আলো আড়াল করেছেন; মানুষের মনে নেমে এসেছে শীতল ভয়।”
থিবসে সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭৮ কিংবা ৪৬৩ সালে ঘটে যাওয়া একটি পূর্ণগ্রাস গ্রহণ প্রাচীন কবি পিন্ডারের নবম পিয়ানে উঠে এসেছে। তিনি দিনের জায়গায় গড়িয়ে আসা অন্ধকারের পথের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে প্রশংসা করেছেন থিবসের অপ্সরা মেলিয়াকে, যিনি দেবতা অ্যাপোলোর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। অন্ধকার আর মিলন—দুটি দৃশ্য পাশাপাশি। তবে গ্রহণের সাহিত্যিক ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত জুটি হয়তো ভার্জিনিয়া উলফের দ্য সান অ্যান্ড দ্য ফিশ প্রবন্ধেই রয়েছে। প্রবন্ধটি যৌনতার নানা ইঙ্গিতে ভরা।

শুরুতেই উলফ স্মৃতির কথা বলেন। কোনো দৃশ্য আমাদের মনে টিকে থাকতে চাইলে তাকে অন্য কোনো অনুভূতির সঙ্গে জুড়ে যেতে হয়। দৃশ্যেরা অদ্ভুতভাবে বিয়ে করে, কখনো অসম জোটে—যেমন রানির সঙ্গে উটের বিয়ে। এভাবে তারা একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখে। যে দৃশ্য নিজের উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে পায় না, তা মুছে যায়। এরপর পূর্ণগ্রাসের ভয়ংকর বর্ণনা হঠাৎ মোড় নেয়। চিড়িয়াখানার পথে দুটি টিকটিকি মিলিত হচ্ছে। একটি টিকটিকি আরেকটির পিঠে নিশ্চল হয়ে বসে আছে। শুধু সোনালি চোখের পাতার ক্ষীণ ঝিলিক কিংবা সবুজ শরীরের সামান্য নড়াচড়া জানিয়ে দেয়, তারা ব্রোঞ্জের তৈরি নয়, জীবন্ত প্রাণী। মানুষের সব আবেগ তাদের এই স্থির উল্লাসের পাশে অস্থির ও গোপন বলে মনে হয়। কিন্তু উলফ টিকটিকির সেই মুহূর্তে থামেন না। তিনি এর সঙ্গে জুড়ে দেন লন্ডনের অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটা মাছের দৃশ্য। টিকটিকির সঙ্গে মাছের কী প্রয়োজন ছিল? সূর্যগ্রহণ আর টিকটিকির স্মৃতিই কি যথেষ্ট ছিল না—একটি আরেকটিকে মনে বাঁচিয়ে রাখার জন্য? উলফ ইচ্ছা করেই এই সরল জুটিকে জটিল করে তোলেন। যুক্ত করেন তৃতীয় একটি দৃষ্টিকোণ। সেদিন কি এই তৃতীয় দৃষ্টিকোণ তার মনে ছিল? বারডন ফেল প্রান্তরে তিনি ছিলেন স্বামী লিওনার্ড উলফ এবং প্রেমিক ভিটা স্যাকভিল-ওয়েস্টের সঙ্গে। ডায়েরি থেকে বোঝা যায়, সেদিন তিনি ভিটার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। ভিটা তার স্বামী হ্যারল্ডের সঙ্গে কেমন আছেন, সেটিও লক্ষ করছিলেন। একটি যাত্রার বর্ণনায় উলফ লিখেছিলেন, হ্যারল্ড ঘুমিয়ে ভিটার হাঁটুর ওপর মাথা রেখেছিলেন। দৃশ্যটি তার মনে হয়েছিল চিত্রশিল্পী লেইটনের আঁকা ঘুমন্ত স্যাফোর মতো।
সেটি ছিল ১৯২৭ সাল। ভিটা ও হ্যারল্ডের দাম্পত্য তখন ভালোই চলছিল। ভার্জিনিয়া ও লিওনার্ডের সম্পর্কও টিকে ছিল। একই সঙ্গে ভার্জিনিয়া ও ভিটার প্রেমও চলছিল। গ্রহণের পরের সপ্তাহান্তে ভিটার পারিবারিক সম্পত্তি লং বার্নে একসঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবু পূর্ণগ্রাস এমন এক ঘটনা, যা আমাদের ভেতরের অনুপাতগুলো উল্টে দিতে পারে। সেই অদ্ভুত, ভারী, ঐতিহাসিক, ভুলে ভরা দিনে তারা কি একবার থেমে পরস্পরের দিকে তাকিয়েছিলেন? যারা সম্পর্কে বাঁধা, আর যারা বাঁধা নন—সাধারণ একটি মুহূর্তের খোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারা কি নিজেদের নতুন করে দেখেছিলেন?
হঠাৎ নিজেকে বুড়িয়ে যাওয়া মনে হতে পারে। উঁচু প্রান্তরে কালো বাতাস বইতে পারে। আগেই বলা হয়েছিল, গরম কাপড় নিয়ে এসো, সঙ্গে রেখো ধোঁয়াটে কাচ। ঠান্ডা পড়বে। চোখে আঘাত লাগতে পারে। পূর্ণগ্রাসে আলো থাকে না। রং থাকারও কথা নয়। তবু এই অন্ধকার মনের পেছনে ঝুলে থাকা কিছু প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত একজন জীবনসঙ্গী আসলে কে? এই মানুষটি কি থেকে যাবে?
এই মানুষটি কি আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









