ভারতে মৃত্যুদণ্ডের রাজনৈতিক অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে, বরাভরা রাওয়ের নতুন বইয়ে তারই অনুসন্ধান। মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে তার যে দাবি, আজকের সময়ে তা নতুন করে জরুরি হয়ে উঠেছে।
১৯৭৫ সালের ৩০ নভেম্বর। মুশিরাবাদ জেলের বন্দিরা তখন মরিয়া হয়ে কাগজের টুকরো আর কলম খুঁজছেন। এমন একটি খবর বাইরের পৃথিবীতে পৌঁছে দিতে হবে, যা তখনও জেলের বাইরে কেউ জানে না। খবরটি বাইরে পাঠানোর জন্য তারা একটি পরিকল্পনা করলেন। কাগজের টুকরোগুলো জেলের সীমানাপ্রাচীরের ওপর দিয়ে ছুড়ে ফেলা হবে। কিন্তু তাতে যদি সেগুলো কারও নজরে না পড়ে? কিংবা হাওয়ায় উড়ে কোথাও হারিয়ে যায়? শেষ পর্যন্ত আরেকটি বুদ্ধি বেরোল। কাগজগুলো পাথরের সঙ্গে বেঁধে ছুড়ে ফেলা হবে। সেই কাগজে লেখা ছিল এক ভয়াবহ সংবাদ—কোসুগান্তি ভূমাইয়া এবং গুন্নালা কিস্তা গৌড়কে পরদিন, ১ ডিসেম্বর, ফাঁসি দেওয়া হবে।
এর আগে দুবার এই দুই বিপ্লবীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। জরুরি অবস্থা বা ইমার্জেন্সি জারির পর ভারতীয় রাষ্ট্রের সামনে আবারও সেই সুযোগ এল। ১৯৪৬ সালের তেলেঙ্গানা সশস্ত্র বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়। নিজামের শাসন এবং সামন্ত জমিদারদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল সেই বিদ্রোহ। এই আন্দোলন এমন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছিল, যার পরিণতিতে ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদ ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফাঁসির মঞ্চে শেষ মুহূর্তেও কিস্তা গৌড়ের পায়ে মাটি লাগেনি। অথচ তার উরুতে তখনও গেঁথে ছিল নিজামের সৈন্যদের ছোড়া একটি গুলি।
বরাভরা রাওয়ের সাম্প্রতিক তেলুগু বই ঈ তালারি ব্যবস্থনু রদ্দু চেদ্দাম (চলুন, এই জল্লাদের ব্যবস্থার অবসান ঘটাই) মৃত্যুদণ্ডের এই ইতিহাসকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জনসাহিতি থেকে প্রকাশিত বইটিতে মৃত্যুদণ্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য অনুসন্ধান করেছেন লেখক। বরাভরা রাও, যিনি সাধারণত ভিভি নামে পরিচিত, নিজেও মুশিরাবাদ জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে কারাবন্দি ছিলেন। সেকেন্দ্রাবাদ ষড়যন্ত্র মামলায় আরও পাঁচজন লেখকের সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৪ সালের ২০ মে তিনি জেলে প্রবেশ করেন। তাঁর থাকার জায়গাটি ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সেলের কাছের একটি ব্যারাক।
তত দিনে ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড় একবার ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে গেছেন। দ্বিতীয়বারও তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১ ডিসেম্বর তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর যখন জেলের বন্দিদের কাছে পৌঁছাল, তাঁরা প্রতিবাদে অনশন শুরু করলেন। সারা রাত ধরে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানালেন। সেই বন্দিদের মধ্যে ছিলেন ভিভিও।
মৃত্যুর সঙ্গে ভিভির দীর্ঘ পরিচয়
মৃত্যুর সঙ্গে ভিভির সম্পর্কের ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়। ৩৪ বছর বয়স থেকে গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং আইনি হয়রানির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। এক অর্থে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের সামাজিক মৃত্যুর অভিজ্ঞতা বহন করছেন। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ২৪টি ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি মামলাতেই তিনি খালাস পেয়েছেন। তার কবিতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কংগ্রেস কিংবা বিজেপি—কোনো সরকারই তাকে রেহাই দেয়নি। যে সমাজে তার থাকার কথা নয়, বারবার তাকে সেই জায়গায় আটকে রাখা হয়েছে; এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়েছে, যেখানে তার মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত করে তোলে, তা বোঝার জন্য দার্শনিক মিশেল ফুকোর চিন্তাভাবনা প্রাসঙ্গিক। ফুকো দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেবল সরাসরি শাস্তি বা হত্যার মধ্য দিয়ে কাজ করে না; মানুষের সামাজিক ও নাগরিক অস্তিত্বকেও ক্রমাগত দুর্বল করে দিতে পারে। ভিভির জীবনের অভিজ্ঞতা এই তত্ত্বের আলোকে পড়া যায়। ২০১৮ সালে ভীমা কোরেগাঁও মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখনও তিনি কঠোর শর্তে জামিনে রয়েছেন।
তবে ভিভির জীবনে সামাজিক মৃত্যুর অভিজ্ঞতাই একমাত্র বিষয় নয়। রাষ্ট্রের হাতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। দীর্ঘ কারাবাসের সময়ে সহবন্দিদের রোগে ভুগে মারা যেতে দেখেছেন। রাষ্ট্রের অনুমোদনে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের পরিণতিও প্রত্যক্ষ করেছেন। জেলের বাইরেও পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি। পুলিশের ভাষায় যেসব হত্যাকাণ্ডকে প্রায়ই ‘এনকাউন্টার’ বলা হয়, তাতে বহু আদিবাসী ও কথিত মাওবাদী প্রাণ হারিয়েছেন।
রেভল্যুশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত দুটি পর্বের একটি ভিডিও সিরিজে ভিভির সঙ্গে অমরুলা বন্ধু মিত্রুলা সংঘম (এবিএমএস) বা শহিদদের বন্ধু ও পরিজনদের সংগঠনের কাজের বিবরণ পাওয়া যায়। সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য পদ্মা কুমারী তাদের কাজ সম্পর্কে বলেছেন, ‘২০০২ সালে অমরুলা বন্ধু মিত্রুলা সংঘমের জন্ম। গত ১৮ বছরে তেলুগুভাষী দুই রাজ্যের যেখানেই এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছি। পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছি, শত শত মৃতদেহ উদ্ধার করে তাদের গ্রামে ফিরিয়ে এনেছি, শোকাহত পরিবারের পাশে থেকেছি, স্মরণসভা করেছি এবং শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিবছর স্মরণানুষ্ঠান করেছি। এ রকম আরও বহু কর্মসূচি নিয়েছি।’
ভিভি ও তার সহযোদ্ধাদের কাছে এই কাজ কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। এর মধ্যে ছিল গভীর মানবিক দায়বদ্ধতাও। মৃত মানুষের মর্যাদা রক্ষা, হত্যার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পরিবারগুলোর প্রিয়জনকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। মৃত্যুর সাক্ষ্য বহন করা, কীভাবে মৃত্যু ঘটেছে তার বিবরণ সংরক্ষণ করা এবং কার জীবন কেড়ে নেওয়া যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো—ভিভির রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের দীর্ঘদিনের অংশ।
মৃত্যুর এই বিস্তৃত অভিজ্ঞতাই তার বইয়ের ভাবনার ভিত তৈরি করেছে। ভিভি মৃত্যুদণ্ডকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও সামাজিক অবিচারের বৃহত্তর পরিসরের মধ্যে দেখতে চান। সেই পরিসরে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের হত্যা, আদিবাসীদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন, জাতিগত নিধন, মুসলিম ও দলিতদের গণপিটুনিতে হত্যা, পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানুষের তৈরি পরিবেশগত বিপর্যয়ে প্রাণহানির ঘটনা।
তবে তিনি এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের একটি মৌলিক পার্থক্যও তুলে ধরেন। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রকাশ্যেই আইন ও বিচারের নামে মানুষ হত্যার অধিকার দাবি করে। ফাঁসির মঞ্চ, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদ্যুতিক চেয়ার ও প্রাণঘাতী ইনজেকশন—এসব কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নয়; রাষ্ট্রের হাতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতার প্রতীকও। আইনকে সামনে রেখে হত্যাকে আনুষ্ঠানিক ন্যায়বিচারে পরিণত করার এই আয়োজন জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতার ইতিহাসেরই অংশ। ভিভির কাছে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শেষ কথা নয়, বরং সেই লড়াই শুরু করার অন্যতম জরুরি জায়গা।
শাস্তির রাজনৈতিক অর্থনীতি
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে নিজের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে ভিভি ফিরে যান শ্রী রঙ্গম শ্রীনিবাস রাওয়ের লেখায়। তিনি শ্রী শ্রী নামেই বেশি পরিচিত। রেভল্যুশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়ের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিলেন শ্রী শ্রী। তার একটি যুক্তিতে ব্যঙ্গের সুর ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, রাশিয়ার জার পর্যন্ত ফিওদর দস্তয়েভস্কির লেখক পরিচয় জানার পর তাঁকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিতে রাজি হয়েছিলেন। অথচ ইন্দিরা গান্ধী যেন সেই জারের চেয়েও কম দয়ালু।
তবে শ্রী শ্রীয়ের সমালোচনা এবং ভিভির বইয়ের বক্তব্য কেবল মানবিক আবেদন বা সহানুভূতির জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন—শাস্তি দেওয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর সম্পর্ক কী? শ্রী শ্রীয়ের কবিতায় উঠে আসে এক মৌলিক প্রশ্ন:
‘যে সমাজে একজন মানুষ আরেকজনকে শোষণ করে,
যেখানে একটি জাতি আরেকটি জাতিকে পিষে মারে,
সেই সমাজব্যবস্থা আর কত দিন টিকে থাকতে পারে?’
এই প্রশ্নের মধ্যেই ভিভির রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তি নিহিত। তার বইয়ে মৃত্যুদণ্ডকে তিনি এমন এক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখেছেন, যাকে তিনি ‘জল্লাদের ব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করছেন। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার সমালোচনা মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত। ১৮৫৩ সালে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কার্ল মার্কসের সমালোচনার সূত্র ধরে ভিভি প্রশ্ন তোলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে কে? কে ঠিক করেছে, সমাজের একটি অংশ শাসন করবে, আর অন্য অংশকে সেই ক্ষমতার বেদিতে বলি হতে হবে?’
ভিভির মতে, বিচারব্যবস্থা, সশস্ত্র বাহিনী কিংবা কারাগারকে সমাজের ক্ষমতাকাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা যায় না। এগুলো বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেও ভূমিকা পালন করে। বিশেষত যারা সম্পত্তির মালিক এবং যাদের শ্রমের ওপর সেই সম্পত্তি ও উৎপাদনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যকার বিভাজন বজায় রাখার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। এই দৃষ্টিতে মৃত্যুদণ্ড কেবল ব্যক্তির অপরাধের শাস্তি নয়; রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখার বৃহত্তর ব্যবস্থারও একটি অংশ।
শাস্তি ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ
ভিভি তাঁর বইয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিস্তৃত ঐতিহাসিক বিবরণ দেননি। তার মূল আগ্রহ সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে। তবে এই যুক্তি বোঝার জন্য ইতিহাসের কিছু দিক গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস এবং মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কাজ করেছেন ইতিহাসবিদ পিটার লাইনবাঘ। ইংল্যান্ডে ভূমি ঘেরাও বা এনক্লোজারের সময় কীভাবে মৃত্যুদণ্ড শ্রমজীবী দরিদ্রদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, তা তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।
ইংল্যান্ডে একসময় সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত জমিগুলো ধীরে ধীরে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যেতে থাকে। সাধারণ মানুষ তাদের চিরাচরিত জমি, জীবিকা ও সম্পদের অধিকার হারায়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভূমিহীন ও সম্পত্তিহীন হয়ে পড়ে। এই নতুন পরিস্থিতিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শাস্তিমূলক আইনের বিস্তার ঘটে। অর্থাৎ, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, শ্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর শাস্তির মধ্যে তৈরি হয় এক গভীর সম্পর্ক।
উত্তর আমেরিকায় ইংরেজ উপনিবেশ স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়েও এই শাস্তিব্যবস্থার প্রভাব দেখা যায়। ১৬১০ সালে ভার্জিনিয়া কোম্পানির কর্তৃত্বে প্রবর্তিত হয় দ্য লজ ডিভাইন, মোরাল অ্যান্ড মার্শাল। উপনিবেশে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নামে এই বিধিতে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সেখানে উল্লেখ করা ৩৭টি অপরাধের মধ্যে ২৫টির শাস্তিই ছিল মৃত্যুদণ্ড। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, উপনিবেশিক সমাজ পরিচালনার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল মৃত্যুদণ্ড।
ব্রিটিশ ভারতে এই শাস্তিব্যবস্থা নতুনভাবে গড়ে ওঠে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ঔপনিবেশিক শাসন ইংল্যান্ডের আইন হুবহু ভারতে চাপিয়ে দেয়নি। বরং স্থানীয় সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে মিলিয়ে আইনকে সাজিয়েছে। মনোজ মিত্তার তাঁর কাস্ট প্রাইড বইয়ে দেখিয়েছেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বেনারসের ব্রাহ্মণদের মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতো। অর্থাৎ, শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও জাতপাতের বিভাজন প্রভাব ফেলত।
একই সময়ে ঔপনিবেশিক প্রশাসন বিভিন্ন আদিবাসী ও যাযাবর জনগোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। ১৮৭১ সালের অপরাধী জনজাতি আইন বা ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট ছিল তার অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ। এই আইনের মাধ্যমে বহু জনগোষ্ঠীকে তাদের পরিচয়ের ভিত্তিতে নজরদারি ও নানা বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়। অন্যদিকে, ১৮৬০ সালে প্রণীত ভারতীয় দণ্ডবিধি অপরাধ ও শাস্তির একটি তুলনামূলক অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু সেই আইনও কার্যকর হয়েছিল গভীর সামাজিক বৈষম্যে জর্জরিত একটি ঔপনিবেশিক সমাজে।
বিংশ শতাব্দীর আগে ভারতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, ১৯২৫ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে ভারতে ১১ হাজার ৫৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যা শাস্তিব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক তৈরি করে। বিভিন্ন সংস্কারবাদী সংগঠন এবং পরবর্তী সময়ে গণপরিষদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ কয়েক দশকেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবি উঠতে শুরু করেছিল। ভগৎ সিং ও তার সহযোদ্ধাদের ফাঁসি ঠেকানোর প্রচেষ্টাও ছিল সেই আন্দোলনের অংশ। কিন্তু স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোয় মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবি শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নীতি হয়ে উঠতে পারেনি। মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং তার পর নাথুরাম গডসের ফাঁসি রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা বজায় রাখার পক্ষে নতুন যুক্তি তৈরি করে।
ফলে স্বাধীন ভারত উত্তরাধিকারসূত্রে এমন একটি শাস্তিব্যবস্থা পেয়েছিল, যার শিকড় ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। ভিভির প্রশ্ন, যে সমাজ নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, সে কি এমন একটি শাস্তি বহাল রাখতে পারে, যার ইতিহাস ভারতের পুঁজিবাদী আধুনিকতার বিকাশ এবং ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত?
মৃত্যুদণ্ড কি সত্যিই অপরাধ কমায়?
মৃত্যুদণ্ডের ভয় কি সহিংসতা ঠেকাতে পারে? নাকি মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেই সহিংসতাকেই নতুন করে জিইয়ে রাখে, যে সহিংসতা নির্মূল করার কথা বলে রাষ্ট্র?
নাথুরাম গডসের ফাঁসির কথাই ধরা যাক। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কি তার রাজনৈতিক আদর্শের অবসান ঘটেছিল? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত মতাদর্শের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি বরং প্রশ্ন তোলে, মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কি কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নির্মূল করা সম্ভব?
মানবাধিকারকর্মী কে বালাগোপাল মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। তার আপত্তির অন্যতম জায়গা ছিল ভারতের তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা। তার মতে, যে ব্যবস্থায় তদন্তে ত্রুটি থাকতে পারে, বিচারপ্রক্রিয়ায় পক্ষপাত কাজ করতে পারে, সেখানে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া বিপজ্জনক।

ভারতের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সমালোচকেরা বারবার দেখিয়েছেন, যৌন সহিংসতা, গণপিটুনি এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হয় না। উল্টো ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়। জিয়া উস সালামের লিঞ্চ ফাইলস বইয়ে গণপিটুনির রাজনীতি এবং এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষত গরুর মাংস পরিবহনের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই কীভাবে মামলা করা হয়েছে, তারও বিবরণ রয়েছে।
এই ঘটনাগুলো আইনের প্রয়োগে এক গভীর বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে। কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেই যে আইন নিরপেক্ষভাবে কার্যকর হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া যদি সামাজিক পক্ষপাত কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হয়, তাহলে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় একাধিক অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কিছু অপরাধেও মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের গণধর্ষণের নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা, নির্দিষ্ট ভিত্তিতে পাঁচ বা তার বেশি ব্যক্তির সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ড, মৃত্যুর কারণ হওয়া সংগঠিত অপরাধ এবং প্রাণঘাতী সন্ত্রাসবাদী হামলা।
মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের এই বিস্তার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—কঠোর শাস্তি কি সহিংসতার মূল কারণগুলো দূর করতে পারে, নাকি এর ফলে কেবল রাষ্ট্রের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাই আরও বিস্তৃত হয়?
ভারত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইসিসিপিআর-এ স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তিতে মানুষের বেঁচে থাকার সহজাত অধিকার স্বীকার করা হয়েছে এবং খামখেয়ালিভাবে কারও জীবন কেড়ে নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা হয়নি, সেখানে এই শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। অপরাধের গুরুতর প্রকৃতি, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এবং ক্ষমা বা সাজা লঘু করার আবেদন জানানোর অধিকারের মতো বিষয়গুলো সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে।
জরুরি অবস্থার সময় ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাকে তাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুরক্ষার পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে।
এই বিতর্ক নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ২০১৩ সালের ঝিরাম ঘাটি হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডকে ঘিরে। ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস নেতাদের একটি কনভয়ে অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছিল। সেই হামলায় মহেন্দ্র কর্মাসহ ২৯ জন নিহত হন। মহেন্দ্র কর্মা সালওয়া জুডুম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাষ্ট্রসমর্থিত এই মাওবাদীবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, যৌন সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং অন্যান্য নির্যাতনের বহু অভিযোগ উঠেছিল। এক লাখেরও বেশি মানুষ, যাদের অধিকাংশই আদিবাসী, ঘরবাড়ি ছেড়ে ছত্তিশগড়ের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএর বিশেষ আদালত ঝিরাম ঘাটি হামলায় অভিযুক্ত ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
নাগরিক অধিকারকর্মীরা এই মামলার তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, হামলার জন্য কারা দায়ী, তা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ, হামলার পরিকল্পনাকারীদের পরিচয় এবং ঘটনার সময় কয়েকজন অভিযুক্ত অন্যত্র ছিলেন বলে তাদের পরিবারের দাবিও আলোচনায় এসেছে। এগুলো গুরুতর অভিযোগ। সেগুলোর সত্যতা অবশ্যই প্রাপ্ত প্রমাণ ও বিচারিক নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে তদন্তের নির্ভরযোগ্যতা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। ভিভির মতে, যে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় দমন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে কিছু জনগোষ্ঠী, সেখানে মৃত্যুদণ্ডকে বৃহত্তর সামাজিক বৈষম্য থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। অমীমাংসিত প্রশ্নে ঘেরা কোনো মামলায় অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে রাষ্ট্রের প্রতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়তে পারে।
ভারত আইসিসিপিআরের দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রটোকল অনুমোদন করেনি। এই প্রটোকলে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো মৃত্যুদণ্ড বিলোপের অঙ্গীকার করে। যদিও মূল আইসিসিপিআর চুক্তি প্রতিটি স্বাক্ষরকারী দেশকে অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করতে বাধ্য করে না, তবু এর ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দিকে আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতির স্বীকৃতি রয়েছে। ফলে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের প্রশ্ন কেবল নৈতিক অবস্থানের বিষয় নয়; মানবাধিকারের বৃহত্তর বিকাশের সঙ্গেও তা যুক্ত।
ভারতে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই শাস্তির মুখোমুখি হওয়া মানুষের বড় অংশই সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। দিল্লির ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির ডেথ পেনাল্টি রিসার্চ প্রজেক্টের গবেষণায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বহু বন্দির আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা অবস্থার কথা উঠে এসেছে। এই গবেষণা বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ এবং তদন্তের মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এই বৈষম্যই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ভিভির মূল যুক্তির কাছে। যারা রাষ্ট্রের কঠোরতম শাস্তির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের অনেকেরই সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার মতো অর্থ, সামাজিক অবস্থান কিংবা আইনি সহায়তা থাকে না। ফলে মৃত্যুদণ্ডকে কেবল ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একে দেখতে হবে সমাজের বৃহত্তর বৈষম্য ও ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হিসেবে।
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে যুক্তি
শ্রী শ্রী যখন কবিতার ভাষায় প্রশ্ন করেন, কাটা মাথা কী গোপন সত্য প্রকাশ করে, তখন ভিভির উত্তর আমাদের আইন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিমূর্ত ধারণার বাইরে নিয়ে যায়। তার মতে, সেই বিচ্ছিন্ন মাথা প্রকাশ করে মৃত্যুদণ্ডের আড়ালে থাকা বস্তুগত স্বার্থকে। দেখিয়ে দেয়, সম্পত্তি, সামাজিক স্তরবিন্যাস ও অসম ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে কীভাবে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহৃত হতে পারে।
ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়ের ঘটনায় এই যুক্তির বাস্তব ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভূমাইয়ার মৃত্যুর পর তার মালিকানাধীন জমি গ্রামের এক সামন্ত জমিদার জবরদখল করেছিলেন বলে জানা যায়। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু দুজন মানুষকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি; সেই শাস্তির পরিণতি গিয়ে পড়েছিল জমি ও সম্পত্তির মালিকানার ওপর চলমান সংঘাতের মধ্যেও।
ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়কে জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সত্তরের দশকের এক সকালে বর্তমান তেলেঙ্গানার আসিফাবাদ অঞ্চলের গিন্নেদারি গ্রামের প্রায় ৩০০ মানুষ এক জমিদারের বাড়ি ঘিরে ফেলেন। তারা তার সম্পত্তির দলিলপত্র পুড়িয়ে দেন এবং জমিদারকে হত্যা করেন। এই ঘটনায় ভূমাইয়া, কিস্তা গৌড়সহ প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একমাত্র এই দুই বিপ্লবীরই মৃত্যুদণ্ড হয়।
সম্পত্তির দলিলপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত আরও বড় এক সংঘাতের অংশ হয়ে ওঠে। সেই সংঘাতের কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন—জমির মালিক কে হবে, কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে এবং প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর অধিকার কার?
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বালাগোপালের যুক্তি ছিল, এই শাস্তি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর নয়। পাশাপাশি একটি অসম্পূর্ণ ও ভুলত্রুটিতে ভরা বিচারব্যবস্থার হাতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অপরিবর্তনীয় ক্ষমতা তুলে দেওয়াও বিপজ্জনক। ভিভি এই সমালোচনাকে আরও বিস্তৃত করেন। তার বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে মৃত্যুদণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না, বিশেষত যখন এই শাস্তির ইতিহাস শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ন্ত্রণ, সম্পত্তির অধিকার রক্ষা এবং প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর দমনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
এই দৃষ্টিতে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ কেবল ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি সংস্কার নয়। এটি রাষ্ট্রের হাতে থাকা মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সবচেয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতাগুলোর একটির বিরুদ্ধে অবস্থান।
ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়ের ফাঁসি কোনো সাধারণ ফৌজদারি মামলার শেষ পরিণতি ছিল না। তা আজও মনে করিয়ে দেয়, গভীর সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের জীবন ও মৃত্যুর ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সেই কারণেই ভিভি নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগঠনগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর—যেদিন ভূমাইয়া ও কিস্তা গৌড়কে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল—দিনটিকে স্মরণ ও প্রতিবাদের দিন হিসেবে পালন করা হোক।

ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনের জন্য লিখেছেন বিপঞ্চিকা এস. ভাগ্যনগর (উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতে জাতপাতের বিভাজন এবং ঔপনিবেশিক কারাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন।)
পরিচিতি
ভারাভারা রাও তেলেঙ্গানার একজন কবি, লেখক, শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মী। তেলুগু সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী কবি হিসেবে তিনি পরিচিত। তার কবিতায় মিশে আছে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, শ্রেণিসংগ্রাম, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শোষিত মানুষের জীবনের কথা। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত রেভল্যুশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তার কাছে কবিতা নিছক সৌন্দর্যচর্চা নয়; কবিতা মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, প্রতিবাদের ভাষা এবং সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখার এক শক্তিশালী মাধ্যম। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও লেখালেখির কারণে জীবনের দীর্ঘ সময় তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। একাধিকবার গ্রেপ্তার, মামলা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখেও তার লেখনী থেমে থাকেনি। তার কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা বৃহত্তর সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। শব্দের মধ্যে তিনি খুঁজে ফেরেন মানুষের মুক্তির সম্ভাবনা। তার কাছে কবিতা মানে শুধু সময়কে ধারণ করা নয়, সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন পৃথিবীর ভাষা নির্মাণ করা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









