বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্ববৃহৎ উৎসব ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র আবারও বইপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে আয়োজিত এই মেলা কেবল বই কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, মুক্তচিন্তা ও মননশীলতার প্রতীক। ফেব্রুয়ারি জুড়ে চলা এ আয়োজনের প্রতিটি দিনই পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠছে।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত এলাকায় সাজানো হয়েছে শত শত স্টল ও প্যাভিলিয়ন। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, লেখক-পাঠক সংলাপ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন—সব মিলিয়ে বইমেলা যেন এক চলমান উৎসব। বিকেল গড়াতেই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে; পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই আসছেন, আবার তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ বন্ধুদের সঙ্গে সাহিত্য-আড্ডায় মেতে উঠছেন।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) মেলার ষষ্ঠ দিনে বেড়েছে বইপ্রেমীদের উপস্থিতি। এদিন বিকেল ৩টায় মেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে তাজউদ্দিন আহমেদের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহিউদ্দিন আহমদ। এছাড়া বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এবারের মেলায় প্রকাশনা শিল্পে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কথাসাহিত্য, গবেষণাধর্মী গ্রন্থ, প্রবন্ধ, কবিতা, অনুবাদ, শিশুতোষ বই- প্রায় সব শাখাতেই নতুন প্রকাশনা এসেছে। বিশেষ করে তরুণ লেখকদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় অনেক লেখক তাদের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বই নিয়ে হাজির হয়েছেন মেলায়। ফলে তরুণ পাঠকদের ভিড় নির্দিষ্ট কিছু স্টলে বেশি দেখা যাচ্ছে।
প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির পরও তারা বইয়ের মূল্য সহনীয় রাখার চেষ্টা করছেন। অনেক প্রকাশনা সংস্থা বিশেষ ছাড় দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ অফারের ঘোষণা দিয়েছে। এতে বিক্রি কিছুটা চাঙা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা মনে করছেন, পাঠাভ্যাস বাড়াতে হলে বছরজুড়ে পাঠচর্চা ও লাইব্রেরি সংস্কৃতি জোরদার করা জরুরি।
মেলার মূলমঞ্চে প্রতিদিনই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সমকালীন সাহিত্য, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সমাজচিন্তা- বিভিন্ন বিষয়ে বিশিষ্টজনেরা মতবিনিময় করছেন। এতে তরুণদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দলগতভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসছে, যাতে তারা সরাসরি লেখক ও গবেষকদের বক্তব্য শুনতে পারে। এ দিক থেকে বইমেলা জ্ঞানবিনিময়ের উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ভূমিকা রাখছে।
শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা কর্নার ও ‘শিশুপ্রহর’ আয়োজন করা হয়েছে। সপ্তাহান্তে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছোটদের জন্য গল্পপাঠ, চিত্রাঙ্কন ও কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে অভিভাবকদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের যুগে শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রবেশপথে তল্লাশি, সিসিটিভি নজরদারি ও পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দর্শনার্থীদের আস্থা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে। মেলা প্রাঙ্গণে খাবারের স্টল থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালনার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
ডিজিটাল যুগের প্রভাবও বইমেলায় স্পষ্ট। অনেক প্রকাশনা সংস্থা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বইয়ের প্রি-অর্ডার নিচ্ছে এবং ই-বুক সংস্করণও প্রকাশ করছে। তবুও মেলায় সরাসরি এসে বই হাতে নিয়ে দেখার অভিজ্ঞতা যে আলাদা- এ কথা বলছেন অধিকাংশ পাঠক। বইয়ের গন্ধ, লেখকের স্বাক্ষর নেয়া, পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা- এসব অনুভূতি ভার্চুয়াল মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।
অমর একুশে বইমেলা কেবল বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্র হিসেবেও এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সামগ্রিকভাবে, ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ আবারও প্রমাণ করেছে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার মধ্যেও বইয়ের আবেদন অমলিন। পাঠক-লেখক-প্রকাশকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ আয়োজন বাঙালির মননে নতুন আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে মেলায় আরও বেশি পাঠকের সমাগম ঘটবে- এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









