বিদায়ের সুর বাজতে শুরু করেছে বাঙালির অন্যতম বড় সাহিত্য উৎসব অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। তাই মেলা প্রাঙ্গণে এখন একদিকে যেমন আনন্দের স্মৃতি, অন্যদিকে শেষ হয়ে যাওয়ার এক ধরনের বিষণ্ন অনুভূতি কাজ করছে।
রবিবার (১৫ মার্চ) এই প্রাণের মেলা শেষ হতে হচ্ছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তাকের রহমান মেলা উদ্বোধন করেন।
সমাপ্তির আগে শেষ কয়েক দিনে মেলার পরিবেশ ছিল বেশ প্রাণবন্ত। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার শিশুদের জন্য আয়োজন করা ‘শিশুপ্রহর’ মেলাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এদিন সকাল থেকেই বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় শিশুদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। ছোট ছোট শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলায় এসে বই দেখেছে, নতুন বই কিনেছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিয়েছে।
তাদের আনন্দঘন উপস্থিতিতে মেলা যেন এক উৎসবমুখর পারিবারিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল পাপেট শো ও বায়োস্কোপ প্রদর্শনী, যা তাদের কাছে ছিল নতুন ও দারুণ আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। কাকতাড়ুয়া থিয়েটারের পাপেট শো দেখে শিশুরা হাততালি দিয়েছে, আবার পুরোনো দিনের বায়োস্কোপ দেখে অনেকে বিস্মিত হয়েছে।
শুধু বিনোদনই নয়, শিশুদের জন্য ছিল নানা ধরনের প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও। কবিতা আবৃত্তি, গান ও চিত্রাঙ্কনের মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিশুরা তাদের প্রতিভা তুলে ধরেছে। পরে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হলে আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। শিশুদের হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর উচ্ছ্বাসে মেলা প্রাঙ্গণ যেন এক জীবন্ত চিত্রে পরিণত হয়েছিল।
শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল। এ সময় শিশুরা বিভিন্ন স্টলে ঘুরে রঙিন মলাটের বই দেখেছে, কেউ কেউ বই কিনেছে, আবার অনেকেই মেলার বিভিন্ন স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে। অনেক শিশুর কাছে এটি ছিল স্বপ্নের মতো একটি দিন।
ছুটির দিন শুক্রবার মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে সকালেই মেলা হাজির হন। ফলে সকাল থেকেই শিশু চত্বরে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো ছিল। তবে পুরো মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় সমানভাবে ছিল না। কোথাও মানুষের ভিড় বেশি ছিল, আবার কোথাও তুলনামূলক ফাঁকা দেখা গেছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সংলগ্ন এলাকায় অনেক সময় কিছুটা নির্জনতা লক্ষ্য করা গেছে। তবুও অন্যান্য দিনের তুলনায় শেষ দিনগুলোতে বইপ্রেমীদের উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মেলায় উপস্থিত হয়ে শিশু-কিশোরদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কবি আনিসুল হক এবং প্রখ্যাত অভিনেতা ডা. এজাজুল ইসলাম। প্রিয় তারকাদের কাছে পেয়ে শিশুদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। কেউ অটোগ্রাফ নিতে ভিড় করেছে, আবার কেউ তাদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যস্ত ছিল। এই উপস্থিতি শিশুদের জন্য বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করেছে।
মেলার আনন্দময় পরিবেশের পাশাপাশি প্রকাশকদের মধ্যে কিছুটা হতাশার কথাও শোনা গেছে। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, এবার রমজান মাস চলার কারণে বই বিক্রি আগের বছরের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। অনেক প্রকাশক বলছেন, পুরো মাসে যে পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছে, তা কোনো কোনো বছরে এক দিনের বিক্রির সমানও নয়।
অন্যদিকে মেলায় শুধু বিনোদন নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও চিন্তার চর্চাও হয়েছে। মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় বিশিষ্ট সমাজবিশ্লেষক বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা ও লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আলোচকেরা বলেন, বদরুদ্দীন উমর কেবল একজন লেখক নন, তিনি সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ। তার লেখায় ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষণের গভীরতা রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের পাঠকদের চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। এই আলোচনায় ড. মোহাম্মদ আজম ও সুমন রহমানসহ আরও অনেকে অংশ নেন এবং তার চিন্তাধারার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ফলে মেলার একদিকে যেমন শিশুদের আনন্দধ্বনি শোনা গেছে, অন্যদিকে মূল মঞ্চে চলেছে জ্ঞানচর্চা ও চিন্তার আলোচনা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









