দেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে গত ১৭ বছরের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, অতীতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি অডিটোরিয়ামে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর আওতাধীন ফাউন্ডেশনের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অগ্রগতি, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘৫ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘‘দেশের বিদ্যুতের যে সংকট, তা ১৭ বছরের সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। এ বিষয়ে দেশের বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। বর্তমান সরকার এই সংকটকে আড়াল না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এগোচ্ছে।’’
জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে এনার্জি মিক্সে পরিবর্তন আনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও কমানো যাবে।’’
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে মোটা দাগে দুই গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন করা হবে এবং এর অর্থায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনার খসড়া গ্রহণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাজেটে বরাদ্দ রাখা ২ হাজার কোটি টাকা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও সরকার পরিকল্পনা করছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘গ্রাহককে শুধু বিদ্যুতের ব্যবহারকারী হিসেবে না দেখে উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করছে সরকার। এ জন্য নেট মিটারিং ব্যবস্থার যেসব জটিলতা ছিল, সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে তিন শতাধিক আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছিল না, ইতোমধ্যে সেগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এখন আরও বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অর্থায়নের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।’’
অর্থায়ন ব্যবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এ ক্ষেত্রে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এবং বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) মতো প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেওয়া হবে। কোনো গ্রাহক বা উৎপাদক মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ দেবেন। আরেকটি প্রতিষ্ঠান বা অ্যাগ্রিগেটর ২০ শতাংশ দেবে এবং বাকি ৬০ শতাংশ সরকারি ঋণের মাধ্যমে দেওয়া হবে।’’
এভাবে অর্থায়ন করা গেলে ঋণের সুদের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে জানান উপদেষ্টা। এতে ব্যাপকসংখ্যক গ্রাহক বিদ্যুতের উৎপাদকে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আর্থিক সুফলও তুলে ধরেন রাশেদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘‘গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে তুলনামূলক কম খরচ হলেও এলএনজি ব্যবহার করলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬৪ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে পারলে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার মতো বিদ্যুৎ ভর্তুকি কমানো সম্ভব হতে পারে। এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।’’
সৌরবিদ্যুৎকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে না দেখে গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবেও দেখছেন বলে জানান উপদেষ্টা। তার মতে, গ্রামীণ মানুষ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হলে তারা শুধু ভোক্তা থাকবেন না, উৎপাদক হিসেবেও ভূমিকা রাখবেন। এতে তাঁদের স্বাবলম্বিতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে।
অতীতের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে রাশেদ তিতুমীর বলেন, ‘‘এসব কাজ অতীতেও করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তখন আমদানিনির্ভর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর ফলে দেশে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার পরিবর্তে নির্ভরতার কাঠামো তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এর ফলেই বর্তমান সরকারকে সংকটের উত্তরাধিকার নিতে হয়েছে। এখন সরকার সেই ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে যেতে চায়।’’
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গেও ব্রিফিংয়ে কথা বলেন রাশেদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘‘সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনও নিজস্ব উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা মিলিয়ে সংখ্যাটি এক কোটিরও বেশি হতে পারে।’’
রাশেদ তিতুমীর বলেন, ‘‘সরকারের লক্ষ্য শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা ঘোষণা করা নয়, বরং বাস্তবে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা। এ জন্য পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।’’
দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় আয় ও জাতীয় হিসাবের তথ্য নিয়ে ফরেনসিক অডিট করা হচ্ছে। স্বাধীন উৎসের তথ্য ব্যবহার করে যাচাই করা হচ্ছে এবং আগের হিসাবে কতটা গরমিল ছিল, তা বেরিয়ে আসবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









