দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করাসহ চার দফা দাবিতে সিলেটের ২৩টি চা-বাগানে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিকেরা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালেও তারা কর্মবিরতি পালন করেন। বুধবার থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে সিলেট ভ্যালির প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক অংশ নিয়েছেন। কর্মবিরতির কারণে বাগানগুলোর স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মালনীছড়া, লাক্কাতুরা, বুরজান ও খাদিমসহ সিলেট ভ্যালির ২৩টি বাগানে কর্মবিরতি চলছে। শ্রমিকদের অন্য দাবিগুলো হলো শ্রমিক স্বার্থবিরোধী গেজেট-২০২৩ বাতিল, চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা।
এর আগে গত ৯ আগস্ট চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন শ্রমিকেরা। তখন সরকারকে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়। দাবি পূরণ না হওয়ায় বুধবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন তারা। দাবি আদায় না হলে টানা কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিকেরা।
মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিক ও চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অজিত রায় বাড়াইক বলেন, একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। এই টাকা দিয়ে পরিবারের দুবেলা খাবার জোগানোও কঠিন। ৫০০ টাকা মজুরিসহ চার দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
বুরজান চা-বাগানের শ্রমিক সাইদুল রহমান সোহেল বলেন, চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে ভারপ্রাপ্ত কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চলছে। এতে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নির্বাচন চান তারা।
চা শ্রমিকেরা বলেন, প্রতিবছর দেশে চা উৎপাদন বাড়লেও তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়নি। দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অধিকাংশ বাগানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকারও যথাযথভাবে পূরণ করা হয় না।
তারাপুর চা-বাগানের এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘যে টাকা মজুরি পাই, সেটা দিয়ে সংসারের খরচ চলে যায়। ডাক্তার দেখানোর টাকাও নেই। বাজারে গিয়ে সবজি, মাছ খাব, টাকা নেই।’
লাক্কাতুরা বাগানের শ্রমিক সুনির্মল বলেন, ‘ওই ২০০ টাকা দিয়ে যদি দিন গুজরান হয়, তাহলে বাচ্চাকাচ্চা কীভাবে লেখাপড়া করবে বা আমরা কীভাবে চলব। বাজারে জিনিসপত্রেরও দাম বেশি।’
মজুরির পাশাপাশি অধিকাংশ চা শ্রমিকের বাসস্থানও জরাজীর্ণ বলে অভিযোগ করেন তারা। এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘বৃষ্টির সময়ে আমাদের থাকার মতো জায়গা, বাসা নেই। চারাগাছের নিচে আমরা হামাগুড়ি দিয়ে কোনোরকম বসে থাকি।’
চা শ্রমিক রঘু বলেন, চার-পাঁচজনের পরিবার নিয়ে পেট চালানোর মতো মানসম্মত মজুরি তাঁরা পান না। বাগানের চিকিৎসাব্যবস্থার মানও নিম্নমানের। কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নেই।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, ১৫০ থেকে ২০০ বছর ধরে চা-বাগানে বসবাস করলেও শ্রমিকদের অনেকের কোনো ভিটেমাটি নেই। শ্রমিকেরা ভূমির অধিকার, চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ পানীয় জল, চাকরি ও শিক্ষা কোটা সংরক্ষণ এবং কল্যাণ তহবিল চালুর দাবি জানিয়েছেন।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা এদিনকে বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের। গত বৃহস্পতিবার তিনিসহ কয়েকজন ঢাকায় শ্রম সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সচিব আশ্বস্ত করেছেন, দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
রাজু গোয়ালা বলেন, শ্রমিকেরা পুরোদমে কাজে ফিরতে চান। তবে দাবি মেনে নেওয়া না হলে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো ও জীবনমান উন্নয়নে শ্রম মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করেছে। কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে মতামত দেবে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়াও চলছে।
অন্যদিকে বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি, চায়ের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। লোকসানে থাকা অনেক মালিক শ্রমিকদের বেতন দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কর্মবিরতির কারণে বাগানগুলোর স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন কর্মসূচি চললে চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









