চারদিকে নদী, যোগাযোগে নানা সীমাবদ্ধতা, এমন এক জনপদ মেহেন্দিগঞ্জ। বরিশাল জেলার সবচেয়ে দুর্গম এ উপজেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষি, মৎস্য ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল।
গুরুতর অসুস্থতা কিংবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে জেলা শহরে ছুটে যাওয়া তাদের জন্য সময় ও অর্থ দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই স্থানীয় মানুষের কাছে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই শেষ ভরসা।
৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকেন প্রায় ১০০ রোগী। কখনো কখনো সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০ থেকে ১৪০ জনে। ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে শয্যার সংকট চরমে উঠেছে। জায়গা না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের বারান্দায় শুয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ।
অথচ বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ছয়জন। অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ৫০। ৩৬টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাত্র দুজন। নেই পর্যাপ্ত ওয়ার্ড বয়, আয়া ও ল্যাব-সংশ্লিষ্ট কর্মী। ফলে রোগীর চাপ যত বাড়ছে, ততই দীর্ঘ হচ্ছে চিকিৎসা পাওয়ার অপেক্ষা। মেহেন্দিগঞ্জের দুর্গমতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে। হাসপাতাল থেকে জটিল রোগীকে বরিশালে পাঠানো হলে স্বজনদের শুরু হয় নতুন দুশ্চিন্তা।
মেহেন্দিগঞ্জ থেকে বরিশাল সদরে যেতে স্বাভাবিকভাবে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। দ্রুতগতির স্পিডবোটেও লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।
একসময় দুর্গম মেহেন্দিগঞ্জের রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরই সেটি অচল হয়ে পড়ে। এখন জরুরি রোগী নিয়ে বরিশালে যেতে হলে অনেকটাই নির্ভর করতে হয় ভাড়ায় চালিত স্পিডবোটের ওপর।
একটি স্পিডবোট রিজার্ভ করতে খরচ হয় প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। দরিদ্র পরিবারের জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন। সামর্থ্য না থাকলে অনেকে লঞ্চে করে রোগী নিয়ে বরিশালের উদ্দেশে রওনা দেন। এতে জরুরি চিকিৎসা পেতে আরও সময় লাগে। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি অচল। অন্যটি সচল থাকলেও সেটির অবস্থাও নাজুক। পুরো উপজেলার রোগী পরিবহনের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকায় একজন রোগীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় অন্য রোগীর স্বজনদের। তখন বিকল্প হিসেবে থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশাই হয়ে ওঠে ভরসা। অথচ সড়কের বেহাল অবস্থায় অসুস্থ রোগী নিয়ে এসব যানবাহনে চলাচলও কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ রোগী ভর্তি থাকেন। কোনো কোনো দিন তা ১৪০ জন পর্যন্ত পৌঁছায়। শয্যা না পেয়ে রোগীদের বারান্দায় অবস্থান করতে হয়। একই সঙ্গে বহির্বিভাগে কয়েকশ রোগীর চাপ থাকায় পুরো হাসপাতালজুড়েই তৈরি হয় ভিড় ও বিশৃঙ্খলা। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক কম হওয়ায় একজন চিকিৎসককে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। নার্স সংকটেও বাড়ছে কর্মরতদের ওপর চাপ। চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।
হাসপাতালের কয়েকটি টয়লেট দীর্ঘদিন ধরে অপরিচ্ছন্ন। কোথাও দরজার লক নষ্ট, কোথাও দরজা ভাঙা। ফলে রোগী ও স্বজনদের জন্য টয়লেট ব্যবহারও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে এত বড় হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ওয়ার্ড বয়ের সংকট থাকায় রোগীদের দৈনন্দিন সহায়তার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি ভোগান্তি।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফও) ডা. মোহাম্মদ ইমরানুর রহমান বলেন, ‘‘হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অনেক কম। ৫০ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ছয়জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে ৫০ জনের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয় ও ল্যাব অ্যাটেনডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদেও জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে সেবা দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘শূন্য পদে জনবল নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে সচিব ও বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, সেল কাউন্টার না থাকায় সিবিসিসহ অনেক পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম বরাদ্দ দেওয়া হলে আমরা আরও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারব।’’
বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘‘মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা জানা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’
মেহেন্দিগঞ্জের মানুষের কাছে চিকিৎসার জন্য বরিশাল শহরে ছুটে যাওয়া শুধু দূরত্বের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়, অর্থ ও জরুরি মুহূর্তে জীবন বাঁচানোর প্রশ্ন। একটি ৫০ শয্যার হাসপাতালে যখন প্রতিদিন দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন, চিকিৎসকের ৫০টি পদের বিপরীতে কর্মরত থাকেন মাত্র ছয়জন, নেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি এবং একটি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হয় পুরো উপজেলার মানুষকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
স্থানীয়দের দাবি, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কেবল একটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে নয়, দুর্গম নদীবেষ্টিত উপজেলার মানুষের জীবনরক্ষার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্রুত চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, শয্যা বৃদ্ধি, এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ, অ্যাম্বুলেন্স ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সচল এবং পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা না গেলে পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থলটি সংকটের বৃত্তেই আটকে থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









