ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুরু হলো নজিরবিহীন এক প্রেক্ষাপটে। একই মঞ্চে, একই সময়ে, দুই ধরনের শপথ—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। আর এই দ্বৈত শপথের মধ্য দিয়েই প্রথম দিনেই স্পষ্ট হয়ে গেল নতুন সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণ। সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বনাম রাজনৈতিক অঙ্গীকার—এই দ্বন্দ্বেই শুরু হলো সংসদের যাত্রা।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। অনুষ্ঠানে দেওয়া হয় দুই রঙের দুটি পৃথক ফরম—সাদা ফরমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ এবং নীল ফরমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ। এখানেই দৃশ্যমান হয় রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য।
বিএনপির অবস্থান: সংসদে ‘হ্যাঁ’, সংস্কার পরিষদে ‘না’
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নবনির্বাচিত সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সাদা ফরমে স্বাক্ষর করলেও নীল ফরমে সই না করে তারা কার্যত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
শপথ শুরুর আগে কক্সবাজার–১ থেকে নির্বাচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় এমপিদের উদ্দেশে বলেন, তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিধান তৃতীয় তফসিলে যুক্ত এবং শপথ পাঠকারীর বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হলে তবেই সেই শপথ গ্রহণ সম্ভব। দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ীই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা–৬ থেকে নির্বাচিত বিএনপির ইশরাক হোসেন পরে এসে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথে অংশ নেননি।
আপত্তি থেকে অংশগ্রহণ: জামায়াত ও এনসিপির কৌশল
সকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ঘোষণা দিয়েছিলেন—বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়, তবে জামায়াতও কোনো শপথ নেবে না। কিন্তু নির্ধারিত সময়েই তারা প্রথমে সংসদ সদস্য এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়। শপথ বাক্য পাঠ করান সিইসি নাসির উদ্দিন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র ছয় সদস্যও প্রথমে আপত্তি তুললেও শেষ পর্যন্ত দুটি শপথই গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
ব্যতিক্রমী প্রেক্ষাপট: সিইসির মাধ্যমে শপথ
সাধারণত নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান স্পিকার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রকাশ্যে নেই এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তাই প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পাঠ করান—যা এ সংসদের সূচনাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা।
সংখ্যার ভাষায় নতুন সংসদ
২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১৪টি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি এবং স্বতন্ত্ররা ৭টি আসন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রায় ৭৬ শতাংশ সদস্যই নতুন—প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন ২২৭ জন। পাঁচটি দলের প্রধান এবারই প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন—যা রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করছে।
প্রথম দিনের বার্তা:
প্রথম দিনেই পরিষ্কার—সংসদের ভেতরে ‘সংস্কার’ ইস্যুই হবে প্রধান রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র। সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বনাম রাজনৈতিক অঙ্গীকারের এই টানাপোড়েনই নির্ধারণ করবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের গতি-প্রকৃতি। শপথের মঞ্চে যে বিভাজনের রেখা আঁকা হলো, তা আগামী দিনের আইন প্রণয়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলবে—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









