শহরের যানজট নিরসনে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নির্মিত ফ্লাইওভারগুলো এখন নিজেই সংকটের মুখে। ফ্লাইওভারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি ওজনের ট্রাক ও লরি চলাচল করছে। প্রকৌশলগত নকশায় যে ‘ডেড লোড’ ও ‘লাইভ লোড’ ধরা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তা ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে ফ্লাইওভার বা হাইওয়ে ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সেখানে শুধু রাস্তা তৈরি করা হয় না, বরং সেই রাস্তার ‘ডিজিটাল মনিটরিং’নিশ্চিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশের বড় বড় ফ্লাইওভারগুলো পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে। ওভারলোডে ফ্লাইওভারের ক্ষতির বিষয়টি কেবল একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল ‘আর্থিক বোঝা’। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আগামী এক দশকে এর ফলে কয়েক হাজার কোটি টাকার লোকসান হতে পারে।
জানা গেছে, দেশের দীর্ঘতম মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। এই ফ্লাইওভারে নিয়মিত সবচেয়ে বেশি ১০ চাকার বড় ট্রাক ও ট্রেইলার চলাচল করে। ওজনের চাপে এর বিভিন্ন অংশে বিটুমিন উঠে গিয়ে ঢালাই উঠে যাচ্ছে। বিশেষ করে সায়দাবাদ ও শনির আখড়া অংশে সংযোগস্থলে বড় ধরনের ফাঁকা সৃষ্টি হয়েছে। এরপর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারেরও একই চিত্র। এখানে হালকা ও মাঝারি যানের জন্য ডিজাইন করা হলেও রাতে ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে পিলারের বিয়ারিং প্যাডগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া ঢাকার বাইরে গাজীপুর এলাকার বিআরটি (গাজীপুর-ঢাকা) নবনির্মিত এই প্রকল্পের বিভিন্ন অংশেও অতিরিক্ত ওজনের ট্রাক চলাচলের কারণে ডেক স্ল্যাবে কম্পন অনুভূত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরপর চট্টগ্রাম (আখতারুজ্জামান ও এম এ মান্নান ফ্লাইওভার) ফ্লাইওভারগুলো দিয়ে সরাসরি বন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী কন্টেইনারবাহী লরি চলাচল করে। অনেক ক্ষেত্রে একটি লরির ওজন থাকে ৪০-৬০ টন, যা নকশাকৃত ওজনের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া ভৈরব ও রূপসা সংযোগ ফ্লাইওভারে ওভারলোডিংয়ের কারণে রেলিং ও ডিভাইডারগুলোতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এছাড়া মাহাখালী ও খিলগাঁও ফ্লাইওভার তো অকেজো হওয়ার কাছাকাছি রয়েছে।
এ বিষয় বুয়েটের একজন প্রকোশলী ও বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা যখন ফ্লাইওভার ডিজাইন করি, তখন একটি ‘সেফটি ফ্যাক্টর’রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ওভারলোডিংয়ের মাত্রা সেই সেফটি লিমিটও পার করে যাচ্ছে। ডাইনামিক লোড বা চলন্ত গাড়ির ওজন যখন নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ হয়, তখন কাঠামোর ভেতরে ‘মাইক্রো-ক্র্যা ‘ তৈরি হয় যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হঠাৎ ধসের কারণ হতে পারে।’ তবে যখনই নিরাপত্তার কথা ওঠে তখন এক সেক্টরের ওপরে দায় চাপায় কিন্তু কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না।
এ বিষয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, ‘সারা দেশে আমাদের অনেকগুলো ফ্লাইওভার এখন সংস্কারের অপেক্ষায়। আমরা ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন’ বসাচ্ছি, কিন্তু ট্রাক চালকরা অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় বা রাতে লুকিয়ে ওভারলোডেড গাড়ি নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে পড়ছে।’ এটাকে ঠেকানো সম্ভব হয় না।
এ বিষয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান এদিন-কে বলেন, ফ্লাইওভারে ওভারলোডে যে পরিমান ক্ষতি হয় তা, কোনোভাবে পুশিয়ে নেয় সম্ভব নয়। পরিবহনের মালিক সব সময় চায় এক ট্রিপে কত মাল পরিবহন করা যায়, এতে তার লাভের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু এটা নিয়মিত চলতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সম্পদ। এজন্য এই ওভারলোড প্রতিরোধ করতে ডিজিটাল স্কেল স্থাপন জরুরি। পাশাপাশি প্রতিটি ফ্লাইওভারে সেন্সর বসাতে হবে জরুরি ভিত্তিতে একং কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
আইনে কি আছে-
বাংলাদেশে ফ্লাইওভার রক্ষা এবং অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা রয়েছে। তবে প্রধান সমস্যা হলো এই আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগের অভাব। দেশের প্রচলিত আইনে যা বলা আছে, কোনো মোটরযান বা যানবাহন প্রস্তুতকারক বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত ওজন সীমার অতিরিক্ত ওজন বা পণ্য পরিবহন করতে পারবে না। সরকার বা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে (যেমন ফ্লাইওভারের আগে বা ব্রিজের মুখে) ওজন মাপার যন্ত্র বা এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করবে। যদি কোনো যানবাহন নির্ধারিত ওজনের বেশি পণ্য পরিবহন করে, তবে ওই যানবাহনের মালিক বা চালককে অনধিক ১ (এক) বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এছাড়া চালকের ক্ষেত্রে ‘পয়েন্ট’ কাটার নিয়মও আছে। যদি কোনো চালক এই সংকেত অমান্য করে ফ্লাইওভারে ওঠেন, তবে তাকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে মামলা ও জরিমানা করা যায়। আইন অনুযায়ী, ওভারলোডেড গাড়ি ধরা পড়লে শুধুমাত্র জরিমানা করলেই হবে না, অতিরিক্ত পণ্য নামিয়ে তারপর গাড়িটি ছাড়ার বিধান রয়েছে।
আইন প্রয়োগে প্রধান অন্তরায়-
কাগজে-কলমে আইন কঠোর হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ না থাকার পেছনে বেশকিছু আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং কাঠামোগত কারণ রয়েছে। মূলত একটি ‘চক্রাকার অব্যবস্থাপনা’র কারণে ফ্লাইওভারগুলো অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। একটি ফ্লাইওভারের মালিকানা বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ভাগ করা থাকে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে (যেমন: রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, সওজ)। যখন ওভারলোডিং থামানোর প্রশ্ন আসে, তখন এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপায়। ট্রাফিক পুলিশ বলে তাদের কাজ শুধু জট কমানো, ওজন মাপা নয়। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশন বলে তাদের কাজ শুধু রাস্তা মেরামত করা।
এদিকে ট্রাফিক পুলিশের কাছে গাড়ির ওজন মাপার কোনো তাৎক্ষণিক যন্ত্র নেই। শুধু ‘চোখের আন্দাজে’ বেশি মাল আছে মনে করে মামলা দিলে সেটি আদালতে টেকানো কঠিন হয়। বিদেশে সেন্সর দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা হয়, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পুলিশ দিয়ে গাড়ি থামাতে হয়। ব্যস্ত ফ্লাইওভারে ট্রাক থামালে বিশাল যানজট তৈরি হয়, তাই পুলিশ অনেক সময় জট এড়াতে ওভারলোডেড গাড়ি ছেড়ে দেয়।
এ ছাড়া কঠোর আইন প্রয়োগ করতে গেলে অনেক সময় পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি দেয়া হয়। পণ্য সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ভয়ে সরকার বা প্রশাসন অনেক সময় নমনীয় ভূমিকা পালন করে। প্রভাবশালী মালিকদের গাড়ি আটক করা হলে ওপর মহল থেকে ফোনের মাধ্যমে তা ছাড়িয়ে নেয়ার প্রবণতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মনোবল ভেঙে দেয়। অভিযোগ, নির্দিষ্ট অংকের মাসোয়ারা বা ‘টোকেন’ থাকলে ওভারলোডেড ট্রাকগুলো পুলিশের চোখের সামনে দিয়েই অনায়াসে ফ্লাইওভারে উঠে যায়। ফলে ১ লাখ টাকা জরিমানার আইন কেবল কাগজে রয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের হাতের ওপর নির্ভর না করে ‘সিস্টেম’ তৈরি করতে হবে। যদি ফ্লাইওভারের মুখে এমন একটি স্মার্ট গেট থাকে যা ওজন বেশি হলে নিজে থেকেই খুলবে না, তবে সেখানে পুলিশ বা গার্ডের আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। দুর্নীতির সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে।
এ বিষয অধ্যাপক ড. মো. মফিযুর রহমান (সাবেক অধ্যাপক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট) স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি ফ্লাইওভারের অভ্যন্তরীণ রড ও কংক্রিটের ক্লান্তি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি এদিনকে বলেন, ‘একটি ফ্লাইওভারের ডিজাইন লাইফ থাকে সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ বছর। কিন্তু যখন এর ওপর দিয়ে অনুমোদিত ওজনের চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের ট্রাক চলে, তখন এর স্টিল এবং কংক্রিটের মধ্যে ক্লান্তি স্ট্রেস তৈরি হয়। এটি মানুষের হাড়ের মাইক্রো-ফ্র্যাকচারের মতো। বাইরে থেকে হয়তো বড় ফাটল দেখা যাবে না, কিন্তু ভেতরের বন্ডিং দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ১০০ বছরের একটি কাঠামো ২০ বছরেই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।’
তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে ফ্লাইওভারগুলো মূলত যাত্রীবাহী বাস এবং হালকা যানবাহনের গতি বাড়ানোর জন্য করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে ২০-৩০ টনের ট্রাক যখন ৫০ টন মালামাল নিয়ে ওঠে, তখন সেই ওভারলোড সহ্য করার ক্ষমতা কাঠামোর থাকে না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সম্প্রসারন সংযোগ ও গেজ বিয়ারিং। এগুলো নষ্ট হলে পুরো ফ্লাইওভার কাঁপতে থাকে যা পিলারের ফাউন্ডেশনে গিয়ে আঘাত করে। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।’
এ বিষয়ে অপর এক বিশেষজ্ঞ ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া (জ্যেষ্ঠ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও স্থপতি) এদিন-কে বলেন, ওভারলোডেড ট্রাকের চাকার চাপে ফ্লাইওভারের বিটুমিনাস সারফেসে দেবে যাওয়ার সৃষ্টি হয়। যখন চাকা এই গর্তে পড়ে ঝাঁকুনি দেয়, তখন ইমপ্যাক্ট লোড বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে গার্ডারগুলো তাদের জায়গা থেকে বিচ্যুত হতে পারে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ফ্লাইওভারের নিচে হাজারো মানুষ থাকে; এখানে একটি ছোট কাঠামোগত ত্রুটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









