দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শুরু হয় বইমেলার স্টলের পর্দা ওঠা। নির্জন মেলায় শুধু বইকর্মীরা অলস দিন কাটায়। এরই মধ্যে অস্ত যায় সূর্য, ইফতারের আয়োজন চলে স্টলে স্টলে। চলে বিরতী। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে দেখা মেলে পাঠকের, তবে প্রত্যাশিত পাঠক নয়। বলছিলাম গতকালের বইমেলার কথা। আজ শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন।
গত কয়েকদিন যাবত এদিনের অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন প্রকাশকরা। কারণ এমন দিনে পাঠকদের ঢল নামে অমর একুশে বইমেলায়। বরাবরের মতো আজ ছুটির দিনে মেলায় ঢল নামবে এমন প্রত্যাশা প্রকাশকদের। তবে, গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্ম দিবসে মেলার অষ্টম দিন ফাঁকা ছিলো স্বাধীনতার স্মৃতি বিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তীর্ণ প্রান্তর।
জনমানবহীন মেলা প্রকাশকদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বসন্তের কোকিলের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কুহুতান অনুরণিত হলেও রাজ্যের নিস্তব্ধতা প্রাণহীন করে তুলেছিলো বসন্তের কোকিলের মিষ্টি সুরের ধারাকে। এদিন দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত অলস সময় কাটিয়েছিলেন বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীরা।
হতাশা প্রকাশ করে শিলা প্রকাশনীর নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, যা বিক্রি হয়েছে তা দিয়ে স্টলের স্টাফদের ইফতার কেনার টাকাও উঠেনি। বাসা থেকে টাকা এনে স্টাফদের ইফতারি কিনলাম। এরকম নাজুক পরিস্থিতির করোনাকালীন মেলাতেও হয়নি বলে জানান তারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রকাশনা শিল্প ধবংস হতে বেশি সময় লাগবে না বলেও মনে করেন এই প্রকাশক।
বর্ণমালা প্রকাশনীর স্বত্তাধিকারী মামুনুর রশীদ বলেন, রমজানে মেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি আমাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, এবারের মেলায় অংশ নিয়ে আমরা নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছি। সৃজনশীল প্রকাশক ঐক্য এর ব্যানারে আমরা ৩২১ জন প্রকাশক এবারের মেলায় অংশ নিতে চাইনি। বাংলা একাডেমি বিনাভাড়ায় স্টল দিলেও স্টল নির্মাণের খরচটাও আমরা তুলতে পারবো না। এরকম পরিস্থিতি করোনাকালীন মেলাতেও হয়নি। আজ শুক্রবার মেলায় ভিড় নামবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, অবসর প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক মাসুদ রানাও জানান তারা শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, কোনোমতে এই সপ্তাহ কাটিয়ে দিয়ে আমরা শুক্রবারের অপেক্ষায় ছিলাম। কাল (আজ) শুক্রবার থেকে মেলা চিরচেনা রূপে ফিরে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন মাসুদ রানা। নতুন বই বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল বৃহস্পতিবার অমর একুশে বইমেলার অষ্টম দিনে নতুন বই বের হয়েছে ৯২টি। আর গত আটদিনে মেলায় মোট নতুন বই প্রকাশ হয়েছে ৩৭৪টি। মূল মঞ্চবিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় "জন্মশতবর্ষ : সুকান্ত ভট্টাচার্য" শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুমন সাজ্জাদ। আলোচনায় অংশ নেন আহমেদ মাওলা।
সভাপতিত্ব করেন আবদুল হাই শিকদার।সুমন সাজ্জাদ বলেন, বাংলা সাহিত্যে ‘কিশোর—কবি’ আখ্যা পেলেও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা মোটেই কিশোরসুলভ চপলতায় আচ্ছন্ন নয়। ভাবাদর্শিকভাবে কবি সুকান্ত হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক। তাই তাঁর কবিতায় চিত্রিত হয়েছেকাশ্মীর, স্তালিনগ্রাদ ও প্যারিসের সংগ্রামী ছবি। মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসবাদ সুকান্তকে সহায়তা করেছে। তাঁর কবিতায় আমরা পাই উপনিবেশ কিংবা ‘বিদেশি শাসনে’র সুস্পষ্ট উল্লেখ।
ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা আর ভারতীয় অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলন ও মুক্তির আকাঙ্খা উচ্চারিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। হিন্দু—মুসলমান বিতর্কের বাইরে গিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাঠ করার মতো অগ্রসর মন ছিল সুকান্তের। তাঁরকবিতা শাসক ও শোষিতের সংগ্রামকে দ্যোতিত করেছে।
সুকান্তের সমগ্র সাহিত্যশেষপর্যন্ত হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের সাহিত্য।আহমেদ মাওলা বলেন, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জীবনের খুব অল্প সময়ই কাব্যচর্চার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁরকাব্যপ্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। তিনি লোকজীবনের ভাষাকে কাব্যভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মার্কসবাদে উদ্বুদ্ধ কবি শ্রেণিচেতনাকে তাঁর কবিতায় মূর্ত করে তুলেছেন। কবিতাকে তিনি সমাজবদলের প্রধান হাতিয়ারহিসেবে ব্যবহার করেছেন।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, সাম্রারাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও সামাজিক অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের যোগ্য উত্তরসূরি। বাংলাদেশের সকল লড়াই—সংগ্রামে সুকান্তের প্রতিবাদী পঙ্কতি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। আলোচনা পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শোভা চৌধুরী। আবৃত্তি করেন শাকিলা মতিন মৃদুলা এবং সালমা সুলতানা। সংগীত পরিবেশন করেন আব্দুল লতিফ শাহ, এলাহী মাসুদ, ডলি মণ্ডল, শামীম সালাম, সাইফুল ইসলাম, মো. আলতাফ হোসেন ও জাকির হোসেন আখের।
আজকের সময়সূচিআজ ৬ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার মেলা শুরু হবে দুপুর ১১:০০টায় এবং চলবে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। বিকেল ৩:০০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : কলিম শরাফীশীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেবেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করবেন সাধন ঘোষ। বিকেল ৪:০০টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









