শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

সোনাদিয়ার ‘সবুজে’  লুটেরার থাবা

প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

সোনাদিয়ার ‘সবুজে’  লুটেরার থাবা

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার পরিবেশ বিপন্ন এলাকা সোনাদিয়া দ্বীপে উপকূলীয় সুরক্ষার অন্যতম ভরসা প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) নিধনের ঘটনায় আবারও মামলা দায়ের করেছে বন বিভাগ। বৃহস্পতিবার দায়ের করা এ মামলায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নেতাসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, আগের মামলাগুলোর মতো এবারও প্রকৃত প্রভাবশালী ‘রাঘব-বোয়ালদের’ আড়ালে রেখে মামলাটি সাজানো হয়েছে।

সোনাদিয়া বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ। এটি জীববৈচিত্র্যের দ্বীপ নামেও পরিচিতি এবং এ দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য পিপাসুদের জন্য অন্যতম সেরা পর্যটন স্থান। চারদিকে সমুদ্রের ঢেউ সমৃদ্ধ এটি মুলত প্যারাদ্বীপ নামে পরিচিতি। তিনদিকে সমুদ্র সৈকত, সাগরতলায় ঢাকা বালিয়াড়ি, কেয়া-নিশিন্দার ঝোপ, ছোট-বড় খাল বিশিষ্ট প্যারাবন। বিচিত্র প্রজাতির জলচর পাখি দ্বীপটিকে করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এখানকার ম্যানগ্রোভ বন এবং উপকূলীয় বনভূমি, সাগরে গাঢ় নীল পানি, কেয়া বন, লাল কাঁকড়া, বিভিন্ন প্রকারের সামুদ্রিক পাখি পর্যটকদের মনে দোলা দেয়। এই দ্বীপটি বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। আর এটি দেশের প্রধান শুঁটকি মাছ উৎপাদন কেন্দ্র। 

এই অপরূপ সোনাদিয়া দ্বীপের সংরক্ষিত উপকূলীয় বনভূমি দখল, গাছ কাটা এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে বন বিভাগ। প্রায় পাঁচ হাজার একর বনভূমি দখল ও ব্যাপক গাছ নিধনের ঘটনায় পরিবেশের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫–২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদিকে যৌথ অভিযানে ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঘটিভাঙ্গা বিটের বিট কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) বিভাষ কুমার মালাকার (৪৬) বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। তিনি উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের অধীন মহেশখালী উপজেলার গোরকঘাটা রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সোনাদিয়া দ্বীপের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধভাবে প্রবেশ করে বনভূমি দখল করে আসছে এবং নির্বিচারে গাছ কেটে বন উজাড় করছে। এজাহারে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে বনভূমির গাছ কেটে সেখানে ঘরবাড়ি, কটেজ ও বিভিন্ন অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করছে। ফলে শুধু বনভূমিই ধ্বংস হচ্ছে না, বরং দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় সুরক্ষাব্যবস্থাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে।

জানা গেছে, গত ১ মার্চ বন বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে সোনাদিয়া এলাকায় একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বনভূমি দখল, গাছ নিধন ও অবৈধ স্থাপনার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে মো. মারুফুল ইসলাম (২০) নামে এক ব্যক্তিসহ দুইজনকে আটক করা হয়। তারা কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

মামলায় আসামি করা হয়েছে— কুতুবজোম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ কামাল, মো. ছিদ্দিক রিমন, মোস্তফা আনোয়ার চৌধুরী, মো. শমসের, সাজেদুল করিম, সৈয়দুল হক সিকদার, মহসিন আনোয়ার, একরামুল হক, কালু মিয়া, কাইছার সিকদার, মোহাম্মদ শাহেদ, ডা. আমজু, রবি আলম, ওসমান আলী, জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ আমিন, ইমতিয়াজ উদ্দিন নকিব, নজরুল ইসলাম, সাজ্জাদ, নাজিম উদ্দিন, জয়নাল আবেদীন, শামশুল আলম, আবদুর রহিম, আব্বাস মিয়া, নুরুল আমিন খোকা, আজিজুল হক, নুরুল আজিম ও মোহাম্মদ রফিকসহ আরও অনেকে।

সূত্র আরো জানায়, সোনাদিয়া দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে গাছ কাটা, জমি দখল এবং নতুন বসতি গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল। স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন মহল বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানের মাধ্যমে বন বিভাগ বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসে।

মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোলতান বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপে সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও গাছ নিধনের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এরইমধ্যে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস ও বনভূমি দখলের মতো অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপের বনভূমি দেশের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় পরিবেশের অংশ। কোনোভাবেই সংরক্ষিত বনভূমি দখল বা গাছ নিধন বরদাশত করা হবে না। প্রশাসন, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও বন রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী আজিজ সিকদার বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপের উপকূলীয় বনাঞ্চল শুধু স্থানীয় পরিবেশ নয়, পুরো উপকূলীয় এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় এসব বনভূমি ঢেউয়ের গতি কমিয়ে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি এই এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, মাছ ও বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও গাছ নিধনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সোনাদিয়া দ্বীপের বনভূমি রক্ষায় নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

এদিকে স্থানীয়দের দাবি, সোনাদিয়ার বনভূমি দখল ও ধ্বংসের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী দখলদার চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা প্রভাব খাটিয়ে বনভূমি দখল করে সেখানে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ করছে। ফলে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, মামলা দায়েরের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হলেও, রাঘব বোয়ালরা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বন রক্ষা করতে হলে ‘রাঘব বোয়ালদের’আইনের আওতায় আনা, দখলদারদের উচ্ছেদ, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.