প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে আরো একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। পুরনো ১ নম্বর ভবন ভেঙে ২১ তলাবিশিষ্ট ভূমিকম্প সহনীয় নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। চারটি বেইজমেন্টে গাড়ি পাকিংয়ের সুবিধা, সুপরিসর লিফটের সংস্থান, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, কার পার্কিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমসহ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রেখেই প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই ভবনটি প্রথমে ২৫ তলা হওয়ার কথা থাকলেও এখন ৪ তলা বাদ দিয়ে ২১ তলা ভবন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বাধার মুখে কমছে ভবনের উচ্চতা। আগামী সোমবার অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উঠতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলা নতুন অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
জানা গেছে, সচিবালয় সরকারের প্রশাসনিক কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড এবং সার্বিক সেবামূলক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় স্থান সংকট দেখা দিয়েছে। কেননা এখানে কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, প্রতিদিন জনপ্রতিনিধি, বিদেশি প্রতিনিধি, উন্নয়নসহযোগীরা, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাধারণ মানুষ নিজ প্রয়োজনে আসেন। কিন্তু সেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো ক্রমবর্ধমান ব্যবহারকারীর চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে না।
সচিবালয়ের বিদ্যমান অফিস স্পেস রয়েছে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭২ বর্গফুট। এর বাইরে অতিরিক্ত চাহিদা রয়েছে ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। প্রথম প্রস্তাবিত ২৫ তলা ভবনটি হতো ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুটের। ফলে বর্তমান চাহিদার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ পূরণ করতে পারত। কিন্তু এখন ২১ তলা হওয়া কিছুটা স্পেস কমে যাবে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে নতুন এই টাওয়ার ভবন নির্মাণকালীন সেখানে থাকা অন্য ভবন বা মন্ত্রণালয়গুলো অর্থ বিভাগের নতুন বহুতল ভবনে স্থনান্তর করা হবে।
এ ছাড়া বর্তমানে সচিবালয়ের একটি নতুন মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণ হলে প্রস্তাবিত নতুন ভবনে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অন্যান্য অফিসকে (সচিবালয়ের বাইরে অবস্থিত) বরাদ্দ দেওয়া যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সবিচালয়ের বর্তমানে ভূমিকম্পসহনীয়তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত নাজুক ১ নম্বর ভবর ভেঙে সেখানেই প্রস্তাবিত নতুন ভবনটি নির্মাণ করা হবে। এতে চারটি বেইজমেন্টে গাড়ি ব্যয় ধরা হয় ৭২৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পিইসি সভা। বর্তমানে ২১ তলা ভবনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার বলেছেন, এ প্রকল্পটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের সুপারিশ করা ছিল। তাই আগামী একনেক বৈঠকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবাকাঠামো বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) কবির আহামদ বলেছেন, প্রথম পর্যায়ে ২৫ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেটি বাদ দিয়ে এখন ২১ তলা করা হবে।
কমিশনের অপর এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকল্পটির প্রস্তাব যখন আসে তখন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় যেসব প্রশ্ন উঠেছিল সেগুলো বিষয়ে তারা (প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা) জবাব দিয়েছেন। পিইসি সভায় দেওয়া সুপারিশগুলো প্রতিপালন করেছে বলেই একনেকে উপসস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন, ‘সিভিল এভিয়েশনের আপত্তি ছিল যাতে ২৫ তলা করা না হয়। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সিভিল এভিয়েশন একসঙ্গে বসে ২১ তলা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, পিইসি সভায় যেসব ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল সেগুলো হলো, ১ হাজার ৬০০ কোজির ২৯ স্টপের প্যাসেঞ্জার লিফট ৮টি, ১ হাজার ২৫০ কেজির ২৯ স্টপের দুটি বেড লিফট, ১ হাজার ২৫০ কেজির ২৫ স্টপের চারটি ফায়ার লিফটসহ মোট ১৪টি লিফটের ব্যয় ধরা হয়ছে ৩৪ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে প্রতিটি লিফটের গড় ব্যয় ২ কোটি ৪৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এই ১৪টি লিফটের প্রয়োজনীয়তা এবং এগুলো ব্যয় বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় পিইসি সভায়। প্রস্তাবিত ভবনে ২৪০০ টনের এসি বাবদ ৬০ কোটি টাকা ধরা হয়।
কিন্তু কতটি এসি এবং ২৪০০ টনের এসির প্রয়োজন আছে কিনা এবং এগুলো ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় পিইসি সভায়। আরও আছে, অফিস ভাড়া বাবদ ৩৬ লাখ টাকা এবং ইউটিলিটি চার্জের জন্য ১০ লাখ টাকার প্রস্তাব তুলনামূলক অত্যাধিক বলে মনে করে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া চুক্তিভিত্তিক ৩টি যানবাহন ভাড়ার জন্য ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু সচিবালয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে যানবাহণ ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।
এক্ষেত্রে অর্থবরাদ্দ বাদ দিয়ে প্রয়োজনে বাস্তবায়নকারী সংস্থা নিজস্ব অফিস অথবা আগের কোনো প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করতে পারে কি না সেই মতামত দেওয়া হয়। মান নিশ্চিতকরণ এবং কাঁচামালের নমুমা সংগ্রহ ও পরীক্ষা বাবদ ৩ কোটি টাকা, বিভিন্ন নকশা তৈরির জন্য ৫৫ লাখ টাকা, স্টেশনারি-সিল ও স্ট্যাম্প বাবদ ১০ লাখ টাকা, টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরিতে ৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। এগুলো অত্যাধিক বলে মনে করেছিল কমিশন।
বিজ্ঞাপনের জন্য ১০ লাখ, ওয়াসার চার্জ ১০ লাখ এবং সম্মানী ও আপ্যায়ন বাবদ ২৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়। এসব ব্যয়ও অত্যাধিক বলে মনে করে প্রশ্ন তোলে পরিকল্পনা কমিশন। এছাড়া প্রকল্পে ২০০০ কেভিএ দুটি সাব স্টেশন তৈরি বাবদ ৬ কোটি ২ লাখ টাকা, ৩২০ কিলোওয়াট সোলার সিস্টেম বাবদ ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকা এবং পাম্প বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বাবদ সাড়ে ৩ কোটি টাকার প্রস্তাব অত্যধিক বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি চার সেট পাম্প মোটর বাবদ ৫০ লাখ টাকা, কারপার্কিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য ৪২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, পাঁচ সেট জেনারেটরের জন্য ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য সাড়ে ৩ কোটি টাকার প্রস্তাবও বেশি বশি ধরা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, মাটি পরীক্ষা ১০ লাখ, একটি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্য ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, বৃষ্টি পানি সংরক্ষণে ১১ লাখ ৭০ হাজার এবং স্যুয়ারেজ লাইন-পয়ঃনিষ্কাশন, পিট কভারের জন্য ২০ লাখ টাকার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আরও আছে, স্পেশাল লাইট ফিটিংস-এ ২ কোটি, নেটওয়ার্কিং সিস্টেমে ১ কোটি ৯৮ লাখ, সার্জ প্রটেকশন সিস্টেমে ৯ লাখ, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ৩৩ লাখ এবং সিসিটিভির জন্য ৯৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকার প্রস্তাবের বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছিল। এছাড়া ভূগর্ভস্থ ১৫ লাখ গ্যলনের জলাধার নির্মাণে ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর প্রয়োজনীয়তা এবং এটিসহ অন্যান্য প্রস্তাবিত ব্যয়গুলো কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে সেসব জানতে চেয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









