বিশেষ পরিস্থিতিতে এবার প্রথমবারের মতো প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক। সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানজট এড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। আজ সোমবার নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আগমন উপলক্ষে সেজেগুজে বসে প্রস্তুত ছিল এনইসি।
সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফোরামের এ বৈঠক সাধারণত হয় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ) সন্মেলন কক্ষেই। নয়া সরকারের এই প্রথম বৈঠকের ভেন্যু ঠিক করা হয়েছিল এনইসিতেই। কমিশন চত্বরে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে ঢালা হয়েছে নতুন পিচ। এবড়োথেবড়ো ভাবটা উধাও হয়ে পথগুলো করা হয় মসৃণ। নিকষকালো রাস্তা সাদা হলুদ রঙ মেখে দিক নির্দেশ করা হয়। শুধু সড়কগুলোকেই মসৃণ করা হয়নি। ফুলসহ নতুন গাছ বসানো হয় রাস্তার দুপাশে। ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে ধুলোবালি। সব ঝকঝকে তকতকে।
বৈদ্যুতিক গোলযোগ এড়াতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দফায় দফায়। কিন্তু সব যখন নিখুঁতভাবে চূড়ান্ত তখনই জানা যায় বৈঠকের ভেন্যু বদলের খবর। শেরেবাংলা নগরের বদলে আবদুল গণি রোডের সচিবালয়েই হবে সভা। বৈঠকের সময়, এজেন্ডা, অংশগ্রহণকারীসহ সবকিছুই ঠিক আছে, শুধু ভেন্যু বদল। যাকে নিয়ে এতো আয়োজন সেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসছেন না পরিকল্পনা কমিশনে। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকটি হবে সচিবালয়ে। এর আগে তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নয়, সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আসার খবরে যে উদ্যম নিয়ে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে নেমেছিলেন, না আসার খবরে তারা মুষড়ে পড়েন। তাদের কণ্ঠে হতাশা, মনটা খারাপ হয়ে গেল। একনেক বৈঠক এনইসি সম্মেলন কক্ষেই হয় সাধারণত। এবারও কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রী আসবেন আমাদের এখানে। দেখা হবে সামনাসামনি। মনে এক ধরনের আনন্দ ছিল। সেটি মাটি হলো। কমিশনের এক কর্মকর্তার মন্তব্য, এভাবে প্রধানমন্ত্রী যদি সব জেলায় যেতেন তাহলে স্থানীয় রাস্তাগুলো চলাচল উপযোগী হতো। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে আরো ভালো। আমরা তো এমনটাই চাই।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রথমেই জায়গা করে নিয়েছে করতোয়া নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প। ব্যয় হবে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকা। ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে। অংশীদারত্বমূলক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হবে ৫৯৫ কোটি টাকা। ৪ কোটি টাকার চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট এবং ৬০ কোটির আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনও রয়েছে। ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য উন্নয়নে ৮ বিভাগীয় শহরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন, ১৩৯ কোটি টাকার গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল উন্নয়ন, ৬৪৯ কোটি টাকার সচিবালয়ে ২১ তলা ভবন নির্মাণ রয়েছে।
১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, ৩০৯ কোটির চট্টগ্রাম সিটি কর্পোারেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাসিক নিবাস তৈরিও রয়েছে। ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহের প্রকল্পও রয়েছে প্রথম একনেকে। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯২০ কোটি টাকা। ৩৮৫ কোটি টাকায় সাভার সোনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সংকট নিরসনে ব্যারাক নির্মাণ, ৩১৯ কোটি টাকায় বৈরাগীপুর-টুমচর-বাউফল জেলা সড়ক উন্নয়ন, ৫০২ কোটি টাকায় বরিশাল-ভোলা-পিরাজপুর জেলা সড়কের বরিশাল থেকে ইলিশা ঘাট পর্যন্ত উন্নয়ন। ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৫টি জেলায় জলবায়ুসহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৯ কোটি টাকা। বৈঠকে ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। টেবিলে (সরাসরি) আরো দুটি প্রকল্প উঠতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নতুন সরকারের প্রথম একনেকে উঠছে না বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প। সব প্রস্তুতি শেষ হলেও আপাতত একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার কোটি ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। একনেকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জনানো হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ করে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে। এর মাধ্যমে পদ্মানির্ভর এলাকার নদী সিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিতকরণসহ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমানো, সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা কমানো এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৫টি নদী সিস্টেম (হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমিয়ে স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার পানি নিষ্কাশন করা হবে।
একনেক কমিটি পুনর্গঠন- জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) পুনর্গঠন করেছে সরকার। গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই শক্তিশালী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রবিবার প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, একনেকের বিকল্প সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। একনেক কমিটিকে সহায়তাদানকারী কর্মকর্তারা হলেন- মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব/প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব,পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব। এই কমিটিতে ‘সচিব’ বলতে সিনিয়র সচিবও অন্তর্ভুক্ত হবেন।
কমিটির কার্যপরিধি হচ্ছে- সব বিনিয়োগ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এবং টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট প্রপোজাল (টিএপিপি)/টেকনিক্যাল প্রজেক্ট প্রপোজাল (টিপিপি) বিবেচনা ও অনুমোদন। সরকারি খাতে ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে মোট বিনিয়োগ ব্যয় সংবলিত প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভার সুপারিশ বিবেচনা ও অনুমোদন। উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা।
বেসরকারি উদ্যোগ, যৌথ উদ্যোগ অথবা অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগসমূহের প্রস্তাব বিবেচনা। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবীক্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী বিষয়সমূহ পর্যালোচনা এবং বৈদেশিক সহায়তার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা ও অনুমোদন এবং উক্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনা। কমিটির বৈঠক প্রয়োজনানুসারে অনুষ্ঠিত হবে। পরিকল্পনা বিভাগ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









