রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

সমঝোতা ভেঙে বিশ্বাসে ‘কোপ’

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫১ পিএম

আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫১ পিএম

সমঝোতা ভেঙে বিশ্বাসে ‘কোপ’

সংসদীয় রীতিতে ‘ওয়াকআউট’ বিরোধী দলের প্রতিবাদের প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পন্থা। তবে গত শুক্রবার সংসদের বিরোধী দল এমন এক অভিযোগে ওয়াকআউট করেছে যা সংসদের ইতিহাসে অনেকটা ‘নজিরবিহীন’বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেদিন বিরোধী দল মূলত ‘রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের’অভিযোগ এনে ওয়াকআউট করেছে। যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘কালো অধ্যায়’বলেও অভিযোগ তাদের। এ নিয়ে স্পিকারের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী স্বীকারও করেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’বিল নিয়ে সমঝোতা ভঙ্গ করা হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, প্রতিশ্রুতি আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বর্তমান সংসদের অধিবেশন ও সংস্কার কার্যক্রম। যা নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম, উভয় প্ল্যাটফর্মে বইছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

সংসদ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার বিকেলে মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ অনুমোদন নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়। অধ্যাদেশটি হুবহু অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি, যেখানে বিরোধী দলেরও দুজন সদস্য ছিলেন। কিন্তু সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এমন তিনটি সংশোধনী প্রস্তাব দেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান। তাঁর তিনটি সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জন্য বিরোধী দলের সদস্যদের সুযোগ না দিয়েই সেদিন বিলটি পাস করে জাতীয় সংসদ। যদিও চলতি অধিবেশনে বা পরের অধিবেশনে ফের সংশোধনী আনা হবে বলে আইনমন্ত্রী প্রতিশ্রুতিও দেন। 

বিলটি পাসের পর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, এখানে সংশোধনী আনার মাধ্যমে সরকারি দল রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ করেছে। দিনদুপুরে ছলচাতুরীর মাধ্যমে সংশোধিত আকারে বিলটি পাস করা হয়েছে। কারণ হিসেবে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সংশোধনীটি একজন বেসরকারি সদস্য এনেছেন। সরকার আনেনি। প্রয়োজনে পরে এ বিলটি আবার সংশোধন করা যাবে। এর আগে অধ্যাদেশটি সংসদে হুবহু ঠিক রেখেই বিল আনা হয়েছিল। 

বিষয়টি নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সঙ্গে বিতর্কের এক পর্যায়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার সংসদে যখন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’বিল তোলা হয়, তখন হঠাৎ সরকারদলীয় একজন এমপি তিনটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন, যা আগে থেকে বিরোধী দল জানত। তবে সংশোধনী তিনটি সরকারদলীয় এমপিদের সমর্থনেই পাস হয় এবং তারা যে দলের নির্দেশেই ভোট দিয়েছে, তা স্পষ্ট। কারণ হুইপরা প্রতিটি প্রস্তাবের আগে আগেই বলে দেন, কোথায় ভোট দিতে হবে। ফলে সংশোধনীটি যে আকস্মিক নয়, বরং শেষ সময়ে চিন্তুাভাবনা করেই আনা হয়েছে সেটা স্পষ্ট, অভিযোগ বিরোধী দলের। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এটা এমন কোনো আহামরি অধ্যাদেশ বা এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীও ছিল না। এর জন্য জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট ভাঙা উচিত হয়নি। সরকারি দল চাইলে, কাজটি জানিয়েই করতে পারত। এতে বিরোধীরা আপত্তি করত না। 

সূত্র জানায়, অথচ সংসদীয় প্রসিডিং অনুযায়ী, মন্ত্রী না চাইলে সংশোধনীগুলো গ্রহণ করা হতো না, স্পিকার ভোটেও দিতেন না। পরে স্পিকারের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী স্বীকার করেন, সমঝোতা ভঙ্গ করা হয়েছে। চলতি অধিবেশনে বা পরের অধিবেশনে ফের সংশোধনী আনা হবে বলে আইনমন্ত্রী প্রতিশ্রুতিও দেন। যদিও ঘটনাটি হঠাৎ ঘটে যাওয়ায় সমঝোতা ভঙ্গের মতো একটি বিশ্রী ব্যাপার ঘটল। কারণ স্পিকার যখন সংস্কৃতিমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সমঝোতা ভঙ্গ করা হয়েছে কিনা?’ তখন তিনি ইতস্তত বোধ করেন। তারপর বলেন, একজন সদস্য সংশোধনী এনেছেন, কিছু করার ছিল না।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, ‘স্বীকার করাটা ভালো কাজ হয়েছে। কিন্তু সমঝোতা ভঙ্গ করা খুব খারাপ নজির হয়েছে। ভবিষ্যতে বিরোধী দল আর সরকারকে বিশ্বাস করতে চাইবে না।’ তিনি বলেন, সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। শুধু আইন নয়, সংবিধানও বদল করতে পারে। বিরোধী জোট কিছুই ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু সমঝোতা ভঙ্গ করা খারাপ কাজ। একতরফা সংসদ ভালো কিছু নয়।’

বিষয়টিকে খোদ বিএনপির অনেক নেতাও ভালোভাবে দেখছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান দৈনিক এদিনকে বলেন, “জাতীয় সংসদে গতকাল (শুক্রবার) যা ঘটল, তাকে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি কালো অধ্যায় বললেও ভুল হবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাবিত ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিল’নিয়ে যে নাটকীয়তা দেখা গেল, তাতে বিরোধী দলের তোলা ‘ছলচাতুরী ও জোচ্চ‍ুরির’অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।”

তিনি বলেন, বিরোধী দলের অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো ‘রাজনৈতিক বিশ্বাসভঙ্গ’। এ পরিপ্রেক্ষিতে যে পয়েন্টগুলো জনসমক্ষে আসা জরুরি ছিল তার মধ্যে বিলটি নিয়ে আগে থেকেই একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। রাজনৈতিক সমঝোতা অনুযায়ী বিলের ধারাগুলো চূড়ান্ত করা হলেও, শেষ মুহূর্তে সরকার পক্ষ থেকে তাতে এমন কিছু সংশোধনী আনা হয় যা আগে আলোচিত হয়নি। 

বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে স্পষ্টতই একটি কৌশলগত প্রতারণা বলেই মনে করা হচ্ছে। 

জানতে চাইলে জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এদিনকে বলেন, ‘সরকারি দল দিনের আলোতে আলোচনার এক কথা বলে রাতের অন্ধকারে বা বিল পাসের আগমুহূর্তে ভাষ্য বদলে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, সরকারের এমন আচরণ কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। কারণ উক্ত বিলের সংশোধনীতে পর্ষদ সদস্য বা সংশ্লিষ্টদের যখন-তখন অপসারণের যে একক ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়েছে, তাকে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’র পরিপন্থী বলে মনে হচ্ছে। সে জন্য ‘দিনের আলোতে যদি এমন ছলচাতুরী চলে, তবে ভবিষ্যতের কোনো আশ্বাসে আস্থা রাখা সম্ভব নয়।’এই অনাস্থার কারণেই তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে বাধ্য হয়েছেন- যোগ করে তিনি আরো বলেন, একটি জাতীয় জাদুঘর যেখানে ত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষিত হওয়ার কথা, সেখানে শুরুতেই কেন এই অস্বচ্ছতা? সমঝোতা ভঙ্গ করে কোনো মহৎ উদ্যোগ কি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?

এদিকে ’ফ্যাসিবাদ বহাল থাকবে ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যাবে’বিএনপি সরকার কেবল এমন বিলগুলো সংসদে উত্থাপন করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের মিনিমাম এক দিন আগে এসব ডকুমেন্ট সাপ্লাই দেওয়ার কথা, সেটাও দেওয়া হয়নি। আমরা গিয়ে বসেছি অধিবেশনে, তখন একটার পর একটা, একেক বস্তা কাগজ আমাদের সামনে এসেছে। তাহলে আমরা যেটা দেখলাম না, যেটা শুনলাম না, যেটা নিয়ে চিন্তা করলাম না; সেখানে আমরা রায় দিই কিভাবে? এর পরও যেহেতু সরকারি দল, বিরোধী দল মিলে বিশেষ কমিটি হয়েছিল এবং যেসব বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন, আমরা তাদের ওপর আস্থা রেখেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে এ আস্থাটাও সরকারি দল ভঙ্গ করেছে।’ 

জামায়াত আমির বলেন, ‘তাঁরা আমাদের বুঝ দিলেন যে এখন এভাবে পাস হয়ে যাক, আগামী দিনে দরকার হয় আপনারা বিল আনবেন, আমরা সহযোগিতা করব। আনা বিলেই আপনারা আপনাদের আস্থা রক্ষা করতে পারলেন না, ওয়াদা রক্ষা করলেন না। আর আগামী দিনে আমাদের আপনারা কমলা লেবু দেখাচ্ছেন। তাঁরা আমাদের সম্ভবত শিশু মনে করেন।’

উল্লেখ্য, সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, অর্ন্তর্বতী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে এই ১৩ অধ্যাদেশও ছিল। অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের শেষ সময় ছিল শুক্রবার। এ সময়ের মধ্যে এগুলো অনুমোদন বা অননুমোদনে কোনো বিল সংসদে আনা হয়নি। ফলে এই অধ্যাদেশগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে।
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.