জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জলবায়ু কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তবে এ ইস্যুতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান ধরে রাখলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি স্পষ্ট।
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট। মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা এসবের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ধীরগতি ও দুর্বলতার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। জাতিসংঘে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো অবস্থান বজায় রাখলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের জলবায়ু ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ জাতিসংঘে শক্ত কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হলেও অভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য সেই অবস্থান নষ্ট হচ্ছে দিনকে দিন।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ কাঠামো কনভেনশনের (ইউএনএফসিসি) আওতায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস (কপ) সম্মেলনগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছে। বিশেষ করে কপ২৬, কপ২৭ ও কপ২৮-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ও ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ নিয়ে জোরালো দাবি তুলেছে। এসব সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের দাবি তুলে ধরে দেশটি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন করেছে।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, “কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকলেও দেশের ভেতরে বাস্তবায়নের অগ্রগতি সেই তুলনায় সন্তোষজনক নয়।”
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জলবায়ু ইস্যুতে ‘বাংলাদেশের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর ঠিকই, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাস্তবায়ন সেই গতিতে এগোচ্ছে না।’অবশ্য এর পেছনে নানা কারণকে দায়ী করছেন তারা। এর মধ্যে প্রকল্পে ধীরগতি ও দুর্বল বাস্তবায়নকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পগুলো কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। ফলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে। এছাড়া অর্থায়নে স্বচ্ছতার প্রশ্নের বিষয়টিও আছে। কারণ আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ব্যবহারে জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীরা মাঝে মাঝে অর্থ ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে থাকাসহ নানা কারণে আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রভাব কমছে বাংলাদেশের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একাধিক নীতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে ধীরগতি বিরাজমান। অনেক প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময়মতো শেষ হয় না। ফলে উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাচ্ছে না। এর ফলে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা ও বায়ুদূষণ জলবায়ু ঝুঁকিকে আরো তীব্র করছে। এ খাতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সবুজ জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা বললেও বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বললেও বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এখনো বেশি। অথচ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সক্রিয় সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ।
এ সবকিছু জলবায়ু ঝুঁকিকে আরো তীব্র করছে। অথচ নগর পরিকল্পনায় কার্যকর কোনো সমাধান দৃশ্যমান হচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক থেকেই যাচ্ছে। এসব অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করছে। এতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক বাড়ছে। একইসঙ্গে উন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী হিসেবে সহানুভূতি পাচ্ছে, অন্যদিকে নেতৃত্বের দাবিও তুলছে। এমতাবস্থায় শক্তিশালী নেতৃত্ব দেখাতে হলে নিজ দেশেই সফল মডেল তৈরি করতে হবে বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, শুধু দাবি নয়, বাস্তব ফলাফল দেখাতে হবে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে কর্মরত স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা ইউনিটের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ইফফাত মাহমুদ এদিনকে বলেন, “জলবায়ু ক্ষতির শিকার দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ খুবই পরিচিত নাম। কিন্তু নানা কারণ ও বাস্তবতায় এখানকার জলবায়ু সমস্যার সমাধান এখনো খুব বেশি দূর সফলতা পায়নি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশা করি আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ তার প্রতিশ্রুতির প্রমাণে কাজ করবে।”
তবে বাংলাদেশ যদি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে, তাহলে এটি শুধু ভুক্তভোগী দেশ নয় বরং জলবায়ু মোকাবিলায় একটি সফল মডেল হিসেবেও বিশ্বে পরিচিত হতে পারবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









