বাংলায় একটি নিষ্ঠুর রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন ওপেন সিক্রেট—আন্দোলন-সংগ্রাম ত্যাগীদের সাজে, আর ক্ষমতার চেয়ার এমপি-মন্ত্রীর ছেলে-মেয়ের ভাগে রাজে। একটা সময় ছিল যখন রাজনীতি ছিল মানবকল্যাণ ও দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ ব্রত, যেখানে জেল-জুলুম, হুলিয়া ও আত্মত্যাগই ছিল নেতার প্রধান যোগ্যতা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সচেতন নাগরিক মাত্রই দেখছেন, আমাদের রাজনীতি ক্রমান্বয়ে একটি নব্য 'জমিদারি প্রথায়' রূপান্তর হচ্ছে। যেখানে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, বছরের পর বছর রাজপথে রক্ত ও ঘাম ঝরিয়ে আন্দোলন টিকিয়ে রাখেন; আর ক্ষমতার বসন্ত এলে সেই ত্যাগের ফসল ঘরে তোলেন কোনো এক প্রভাবশালী নেতার সন্তান বা উত্তরাধিকারী। এই বংশানুক্রমিক ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেধা, ত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে জমিদারি প্রথার গোড়াপত্তন করেছিলেন, ১৯৫০ সালে কাগজের কলমে তার সমাপ্তি ঘটলেও মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগতভাবে সেই সামন্ততান্ত্রিক প্রথা যেন আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভর করেছে। জমিদারি প্রথার মূল কথা ছিল—যোগ্যতা যাই হোক না কেন, জমিদারের সন্তানই পরবর্তী জমিদার হবে এবং প্রজারা বংশানুক্রমিকভাবে খাজনা দিয়ে যাবে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও আমরা একই সমীকরণ দেখতে পাচ্ছি। দলগুলোর ভেতরে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় এবং নিয়মিত ও স্বচ্ছ কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত না হওয়ায়, কোনো একটি নির্বাচনী এলাকা বা নির্দিষ্ট পদ যেন কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবারের 'তালুক' বা 'জমিদারি' হয়ে উঠেছে। একজন এমপি বা মন্ত্রী মনে করেন, তাঁর এলাকার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তাঁর পরিবারের বাইরে যাওয়া মানেই তাঁর 'সাম্রাজ্য' চ্যুত হওয়া। ফলে নিজের সন্তান, স্ত্রী বা ভাইকে উত্তরাধিকারী বানানোর এক অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যা প্রতিটি দলেই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অথচ একটি রাজনৈতিক সংগঠন political party দাঁড়িয়ে থাকে তার তৃণমূল এবং মধ্যম সারির নেতাকর্মীদের ওপর। যেকোনো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, হরতাল, সমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক সংকটে বুক পেতে দেয় এই সাধারণ কর্মীরাই। বিরোধী দলে থাকার সময় হামলা, মামলা, হুলিয়া, বছরের পর বছর কারাবরণ এবং শারীরিক নির্যাতন যেন সাধারণ কর্মীদের নিয়তি। এই দীর্ঘ সংগ্রামে অনেকে নিজের ব্যবসা ও চাকরি খোয়ান, পরিবারকে ঠেলে দেন চরম সামাজিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে, এমনকি রাজপথে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হন। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, দল যখন ক্ষমতায় আসে তখন এই 'রক্ত ও ঘাম' দেওয়া কর্মীদের ভাগ্যে বড় কোনো নীতিনির্ধারণী পরিবর্তন আসে না।
বড়জোর তারা পান কিছু লোকাল দাপট বা ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের উচ্ছিষ্ট। কিন্তু সংসদ সদস্যের টিকিট, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদ কিংবা মন্ত্রীত্ব—এসবে তাদের প্রবেশাধিকার থাকে প্রায় শূন্যের কোঠায়। রাজপথের সাহসী লড়াকু কর্মীরা বড়জোর ব্যবহৃত হন স্রেফ ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে, যাদের কাঁধে চড়ে উত্তরসূরিরা ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছায়।
বিপরীত দিকে, যখন দল ক্ষমতায় আসে বা নির্বাচন আসে, তখন দৃশ্যপটে হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে একদল 'অভিজাত' তরুণ-তরুণীর, যারা বর্তমান বা সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের ছেলে-মেয়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দলের দুঃসময়ে যখন সাধারণ কর্মীরা পুলিশের তাড়া খাচ্ছিলেন বা রাজপথে মার খাচ্ছিলেন, তখন এই রাজপুত্র ও রাজকন্যারা দেশের দামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে অথবা বিদেশের কোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বা বিলাসী জীবনযাপনে ব্যস্ত ছিলেন। দলের আদর্শ, মাঠের রাজনীতি কিংবা সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে তাদের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতাই থাকে না। কিন্তু নির্বাচনের সময় হঠাৎ করেই আকাশ থেকে নাজিল হওয়ার মতো তারা এলাকায় আসেন এবং বাবার 'উত্তরাধিকার' দাবি করে দলীয় প্রতীক পকেটে পুরে নেন। এটি মাঠের ত্যাগী নেতাদের জন্য চরম অবমাননাকর। সাধারণ কর্মীদের রক্তকে পুঁজি করে এভাবে এক রাতেই তৈরি হয় নব্য ভিআইপি রাজনীতিবিদ, যারা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের স্রেফ তাদের হুকুমের গোলাম মনে করে।
এই রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্রের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে রাজনীতির চরম ব্যবসায়ীকরণ। বাংলাদেশের সংসদগুলোর হলফনামা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য পেশায় ব্যবসায়ী। রাজনীতি এখন আর শুধু জনসেবা বা আদর্শের বিষয় নয়, এটি বিপুল অর্থ উপার্জনের, কর ফাঁকি দেওয়ার, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি সহজ করার এবং নিজেদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রক্ষার সবচেয়ে বড় লাইসেন্স। ফলে এমপি-মন্ত্রীরা তাদের অর্জিত 'আর্থিক সাম্রাজ্য' ও রাজনৈতিক প্রভাব পরিবারের বাইরে কাউকে দিতে চান না। এই 'ব্যবসায়ী-পরিবারতন্ত্র' মিতালীর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্ররাজনীতি করে আসা সাধারণ পরিবারের ত্যাগী ও মেধাবী নেতারা ছিটকে পড়ছেন। তারা যখন দেখেন কোনো political background বা ত্যাগ ছাড়া একজন মন্ত্রী,এমপি'র সন্তান এসে তার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে, তখন দল ও রাজনীতির ওপর থেকে তাদের আস্থা উঠে যায়। রাজনীতি তখন হয়ে ওঠে কোটিপতিদের ক্লাব, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।
এখানেই শেষ নয়, এই নতুন প্রজন্মের এলিট সন্তানরা কোনো কষ্ট ছাড়াই ক্ষমতার শীর্ষে আসায় তাদের মনে এক ধরনের তীব্র অহমিকা কাজ করে। তারা রাজনীতিকে 'পাবলিক সার্ভিস' বা জনসেবা হিসেবে দেখে না, বরং তাদের বিলাসী লাইফস্টাইল ও ক্ষমতার দাপট দেখে একে নিজেদের জন্মগত অধিকার মনে করতে শুরু করে। ত্যাগী নেতারা যেখানে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছাকাছি পৌঁছাতেই পারেন না, সেখানে এই সন্তানেরা পারিবারিক পরিচয়ে নীতিনির্ধারকদের ড্রয়িংরুমে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়ে যান। বাবারা তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সন্তানদের জন্য দলের শীর্ষ মহলে এক ধরনের 'লবিং সিন্ডিকেটের' রাজপথ বানিয়ে রাখেন। এর সাথে যোগ হয় আমাদের মাঠপর্যায়ের 'ব্যক্তিপূজা' বা অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি। প্রভাবশালী নেতারা মাঠের কর্মীদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে কর্মীরা নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে গিয়ে এক সময় তাঁর সন্তানদেরও অবলীলায় পরবর্তী হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বই নব্য জমিদারি প্রথাকে যুগের পর যুগ জ্বালানি জুগিয়ে টিকিয়ে রাখছে।
রাজনীতিতে মেধার চেয়ে রক্তের সম্পর্ক বা বংশমর্যাদা যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কষ্ট না করে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে বসায়, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট বা তৃণমূলের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা এই নতুন প্রজন্মের এলিট নেতাদের থাকে না। ফলে আমলাতন্ত্রের ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ে এবং জনগণের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। ত্যাগী কর্মীরা যখন দেখেন আদর্শ দিয়ে ওপরে ওঠা যায় না, তখন তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়। এই হতাশা থেকেই রাজনীতিতে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও পেশী শক্তির চর্চা বৃদ্ধি পায়, কারণ তারা বোঝে যে নিয়মতান্ত্রিক ও আদর্শিক উপায়ে শীর্ষে যাওয়া অসম্ভব। এতে একটি সুস্থ গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত 'সমান সুযোগ' বা সমান অধিকার ধ্বংস হয়ে যায়। এই সংকট আরও ঘনীভূত হয় যখন দেখা যায় যে, এই পরিবারতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিচার বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে ও সাম্রাজ্য রক্ষায় ব্যবহার করতে শুরু করে। যোগ্য আমলা ও কর্মকর্তারাও তখন এই নব্য জমিদারদের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হন, যার ফলে সুশাসনের কবর রচিত হয়।
এই বৃত্ত থেকে বের হতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পদায়নে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত হয়ে গোপন ব্যালটে নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচনে টিকিট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর বিগত দিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, দলের জন্য অবদান এবং জনগণের সাথে তার সম্পৃক্ততাকে প্রধান শর্ত করা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া দলগুলোর নীতিনির্ধারণী ফোরামে অন্তত একটি নির্দিষ্ট অংশ মাঠ থেকে উঠে আসা তরুণ ও পেশাজীবী মেধাবীদের জন্য বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন, যাদের কোনো রাজনৈতিক পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। একই সাথে, নির্বাচনী ব্যয়ের লাগাম কঠোরভাবে টেনে ধরতে হবে যাতে কেবল কোটিপতি বা তাদের সন্তানরাই নয়, একজন সৎ, আদর্শবান ও মধ্যবিত্ত ত্যাগী নেতাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস পান। ভোটারদেরও অন্ধ পারিবারিক আনুগত্যের বাইরে এসে প্রার্থীর নিজের সততা, যোগ্যতা ও জনকল্যাণের মানসিকতাকে মূল্যায়ন করতে হবে।
রাজনীতি কোনো পারিবারিক সম্পত্তি বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি নয়। যে কর্মীরা নিজের জীবন-যৌবন বাজি রেখে একটা দলকে টিকিয়ে রাখেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বসার প্রথম অধিকার তাদেরই। যদি আমরা একটি সাম্যবাদী, গণতান্ত্রিক এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গড়তে চাই, তবে এই "ত্যাগী বনাম ভোগী"র বৈষম্যমূলক সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। এমপি-মন্ত্রীর সন্তান হিসেবে নয়, একজন নাগরিকের পরিচয় হোক তার মেধা, কর্ম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। যেদিন রাজপথের লড়াকু সৈনিকটি তার ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন পেয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসতে পারবেন, যেদিন উত্তরাধিকারের যোগ্যতা রক্তের বদলে মেধা ও ত্যাগে নির্ধারিত হবে, সেদিনই কেবল আমাদের রাজনীতি প্রকৃত অর্থে 'জনগণের রাজনীতি' হয়ে উঠবে এবং নব্য জমিদারি প্রথার কবল থেকে মুক্ত হবে দেশ।
লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









