বেনজীর আহমেদ দেশের একসময়কার সবচেয়ে ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন । পুলিশের শীর্ষ পদ তথা মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) দায়িত্ব পালন করেছেন দুই বছরের বেশি। কিন্তু দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ নিয়ে দেশ ছাড়তে হয় তাঁকে। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত এক ই–মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি জানায়।
তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবে।’ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যত জোরালো অভিযোগ রয়েছে, তত অভিযোগ আর কোনো পুলিশপ্রধানের বিরুদ্ধে ওঠেনি। বেনজীরের ‘অপরাধনামা’ আসলে নজিরবিহীন। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অনেক। গুম ও খুনের মামলা রয়েছে। সংখ্যালঘুদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নিজের পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ নিজের পরিবারের সদস্যদের নামেও রেখেছেন তিনি। ফলে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েরাও মামলার আসামি এবং পলাতক। ১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (২০১০–২০১৫) এবং র্যাব মহাপরিচালকের (২০১৫–২০২০) দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালের এপ্রিলে তাঁকে আইজিপি করা হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।বেনজীর আহমেদের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। এই সুবাদে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর সাত সাবেক ও তৎকালীন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নাম ছিল। তখন তিনি আইজিপি ছিলেন। ২০২২ সালে অবসর নেন বেনজীর। তখন তাঁকে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়নি। সাবেক আইজিপিদের অনেককে রাষ্ট্রদূত বা অন্য পদ দেওয়ার ঘটনা আছে। ধারণা করা হয়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বেনজীর আহমেদকে বড় কোনো পদে বসায়নি সরকার। বেনজীর আহমেদ দেশেই ছিলেন। অবসরের পরও তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা পেতেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ছয়জন সাদাপোশাকের পুলিশ সদস্য, দুজন সশস্ত্র দেহরক্ষী এবং তিনজন পাহারাদার তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে ২০২৪ সালের শুরুতে। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যেই ৪ মে তিনি সপরিবার দেশ ছাড়েন। তখন অভিযোগ ওঠে, তৎকালীন সরকারের ‘সিগন্যাল’ পেয়েই তিনি দেশ ত্যাগ করেন। বিমানবন্দরে তাঁকে আটকানো হয়নি।
সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তখন জানায়, ২০২৪ সালের ৪ মে রাতে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে বেনজীর আহমেদ দেশ ছাড়েন। ফুটেজে তাঁর পেছনে এক পুলিশ কর্মকর্তাকেও দেখা যায়। বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে দুদক। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুর্নীতির ছয়টি মামলা রয়েছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় বিচার চলছে। বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান। এসব মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে ৭৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর মধ্যে একটি মামলায় ১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে দুদক। এই মামলায় গত বছরের ৩০ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযোগপত্র দেয় দুদক।গত ৮ মার্চ মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এই মামলাটি এখন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছ বলে জানিয়েছে দুদক। আওয়ামী লীগের আশির্বাদপুষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা হলেও নিজের এলাকা গোপালগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন বেনজীর। নিজের ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েক শ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাঁরা বলেছেন, জমি বিক্রি ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় ছিল না।
ভয় দেখিয়ে, জোর করে এবং নানা কৌশলে তাঁদের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগী টোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর বেনজীর আহমেদ গড়ে তোলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পরে আদালত পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দের নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের জুনেই সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্কের পুকুর, জলাশয়, ইকো রিসোর্ট, কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা ক্রোক করা হয়েছে এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কৃষিজমি দেখভালের দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং পুকুর ও জলাশয়ের দায়িত্ব জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়। সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কে পার্কসহ ২০টি পুকুর রয়েছে।
এর মধ্যে পার্কটি চলতি অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি মূল্যে ৭৩ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুকুরগুলো ইজারা দেওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপ্তি দেওয়া হয়েছে।এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডেমরা-ইছাপুরা সড়কের পাশে ২৪ কাঠা জায়গাজুড়ে একটি বাড়ি রয়েছে বেনজীর আহমেদের পরিবারের। নিজের মেয়ের মালিকানাধীন বাড়িটির নাম দেওয়া হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড। এর আগে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নামে স্থানীয় প্রেমানন্দ সরকারের মালিকানাধীন একটি ৫৫ শতাংশের জলাশয় জোর করে ভরাট করা হয়। পরে ভরাট করা ওই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেন বেনজীর আহমেদ। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি বেনজীর আহমেদ।
এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। আইজিপি থাকার সময় বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। এটাও ছিল তার আরেকটি নজিরবিহীন কান্ড। এর পর থেকেই তিনি নামের আগে ‘ডক্টর’ ব্যবহার শুরু করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, ডক্টরেট প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম শর্ত পূরণের যোগ্যতা তাঁর ছিল না। স্নাতক ডিগ্রি ও শিক্ষাজীবনের সব পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক হলেও সেই শর্ত তিনি পূরণ করেননি বলে অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে ২০১৬ সালে সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন বেনজীর আহমেদ।
বিষয়টি নিয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তর আপত্তি জানায় এবং র্যাব সদর দপ্তরে চিঠিও পাঠানো হয়। পরে র্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুরোধে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর পাসপোর্ট নবায়ন করা হয়। ছবি ও আঙুলের ছাপও তাঁর বাসায় গিয়ে নেওয়া হয়। সরকারি চাকরিবিধি ও পাসপোর্ট আইনের বিধান অনুযায়ী, এটি অনিয়ম হলেও এ ঘটনায় তখন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে পাসপোর্ট কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান শেষে একটি মামলা করেছে। ওই মামলার তদন্ত এখনো চলমান।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উঠেছে, এত অভিযোগ অন্য কোনো আইজিপির বিরুদ্ধে ছিল না। তাঁর লাগামহীন হয়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁর দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা উচিত। পুলিশের শীর্ষ পদে থেকে বেনজীর আহমেদ দুর্নীতি ও অপরাধের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, সেটি প্রকৃতপক্ষেই ‘বে–নজির’। একসময়ের ক্ষমতাধর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ছয়টি মামলার তদন্ত ও বিচার চলছে। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা, ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি কেনা এবং ভুয়া পিএইচডি ও পাসপোর্ট কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে ওঠা এসব অভিযোগ ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহারের ধ্রুপদি উদাহরণ। শুধু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নয়; ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল পদে থেকে কেউ যাতে এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই বেনজীরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার হওয়ার খবরটি স্বস্তির এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি। তবে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও বিচারের মুখোমুখি করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তার করে ১২ জুন ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানায়। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতি ও বিপুল সম্পত্তি অর্জন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করলে ওই বছরের ৪ মে সপরিবার দেশ ছাড়েন তিনি।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের মামলায় তাঁর বিচার শুরু হলে ২০২৫ সালের মে মাসে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়। বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর অর্থ শুধু একজন পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন সাবেক পুলিশপ্রধানকে তাঁর কৃতকর্মের জন্য আইনের মুখোমুখি করার নজির।
বেনজীরকে গ্রেপ্তার করার মধ্য দিয়ে ইন্টারপোল তার দায়িত্ব পালন করেছে, এখন তাঁকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত করবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় কূটনৈতিক যোগাযোগ এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে মামলার পুরো প্রেক্ষাপট, আদালতের আদেশ, বেনজীর আহমেদ কেন বাংলাদেশে ‘ওয়ান্টেড’—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠাতে হবে। আমরা মনে করি, পুরো প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে করা হবে, তার ওপরই বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নির্ভর করছে। প্রভাবশালী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারলেই বিচার এড়াতে পারেন, এ রকম একটি ধারণা আমাদের দেশে পাকাপোক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই ধারণা ভাঙার একটি বড় সুযোগ সরকারের সামনে এসেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর বিকল্প নেই। বেনজীর আহমেদের সফল প্রত্যর্পণ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—নিখুঁত ও শক্তিশালী আইনি নথিপত্র, অভিযুক্তের পরিচয় ও মামলার তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপন এবং ধারাবাহিক ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা। এই তিন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হলে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে। দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি বিরাজ করছে তাতে সংশয় জাগে,শেষ পর্যন্ত এই কুখ্যাত পুলিশ শীর্ষ কর্মকর্তার আদৌ বিচারকাজ সম্পন্ন করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি? তার কৃত অপরাধের জন্য যদি উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে এদেশের কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত উর্ধ্বতন অধস্তন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য এমন অপরাধের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আর দুঃসাহসী হবে না। এটা একটা নজির মানে দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









