বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম শহরটি কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চল কিংবা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী নয়। ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং আধুনিক বিশ্ব বাণিজ্যের মূল সংযোগস্থল হিসেবে এই বন্দরনগরী মূলত সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড। আধুনিক বাংলাদেশ ও সামুদ্রিক ভূ-রাজনীতির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজও এই মহাসত্যটি ধ্রুব- চট্টগ্রামের স্থায়িত্ব, সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপরই সার্বিকভাবে নির্ভর করছে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সার্বিক স্বাবলম্বিতা।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের গতিশীলতা চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। এটি কেবল কোনো পণ্য ওঠানামার স্থান নয়, বরং বাংলাদেশের শতভাগ প্রস্তুতকৃত পোশাক শিল্প, ইস্পাত, সিমেন্ট, সার, রাসায়নিক, ওষুধ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের মতো জাতীয় অর্থনীতির মূল স্তম্ভগুলোর কাঁচামাল সরবরাহের প্রধান ধমনি।
কন্টেইনার খালাসে বিলম্ব কিংবা বহির্নোঙরে জাহাজের ওয়েটিং সময় ও টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বেড়ে গেলে আমদানি-রপ্তানি খাতের লজিস্টিক খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা বা অবকাঠামোগত অচলাবস্থার কারণে এই বন্দর থমকে গেলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে দেশের পুরো লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনের চাকা। এর সরাসরি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এবং অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি।
অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিংহভাগ রাজস্ব সংগৃহীত হয় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে। এর পাশাপাশি দেশের প্রথম ও অন্যতম সফল চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা, কর্ণফুলী ইপিজেড, ভাটিয়ারীর বিশ্বখ্যাত জাহাজ পুনর্প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম 'জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল' (মিরসরাই) চট্টগ্রামকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক চলাচলের পাশাপাশি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও এভিয়েশন কার্গো পরিবহন ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসী আয় প্রবাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্পকৌশল ও পরিকাঠামো থেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থায়ন পায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে চট্টগ্রাম হলো সমগ্র অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সমুদ্র গেটওয়ে। নতুনভাবে যুক্ত হওয়া মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের লজিস্টিক অবকাঠামোকে এক অভূতপূর্ব বিশ্বমানের স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। এটি চালু হওয়ায় বড় আকারের মাদার ভেসেল সরাসরি ভিড়ানোর ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ফিডার জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং প্রতি কন্টেইনারে পরিবহন খরচ ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় করবে।
পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল পুরো নগরীকে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে উন্নীত করে নদীর দক্ষিণ পাড়ের বিশাল আনোয়ারা ও পটিয়া শিল্পাঞ্চলকে মূল শহরের লজিস্টিক হাবের সাথে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের 'সেভেন সিস্টার্স' রাজ্যগুলো ছাড়াও নেপাল ও ভুটানের মতো ল্যান্ডলকড বা ভূ-বেষ্টিত দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান সুযোগ বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত গুরুত্বের বাইরে প্রকৃতির অপার সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী চট্টগ্রামেই অবস্থিত। এটি রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক পোনা ও রেনু এবং দেশীয় মিষ্টি পানির মৎস্য জিন ব্যাংকের মূল উৎস। একই সাথে বঙ্গোপসাগরের বিশাল এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ বালি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ 'ব্লু-ইকোনমি' বা নীল অর্থনীতি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধানতম চালিকাশক্তি এই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল।
অথচ বিশাল সম্ভাবনা ও জাতীয় অর্থনীতিতে বিপুল অবদান থাকা সত্ত্বেও এই চট্টগ্রাম নগরী আজ চরম পরিবেশগত, অবকাঠামোগত ও নগর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য বৃষ্টিপাত কিংবা অমাবস্যা-পূর্ণিমার অতিরিক্ত উচ্চ জোয়ারের পানিতে নগরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পলিযুক্ত পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আগ্রাবাদের মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বছরের পর বছর জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়াতে প্রতিবছর ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকার খাদ্যপণ্য ও কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে, যা প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির কারণ।
একই সাথে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমিখেকো চক্রের অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটার ফলে প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ধসে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, যা প্রকৃতির স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম ও ভৌগোলিক ভারসাম্য ধ্বংস করছে। অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও পলি জমে জমে দেশের অর্থনৈতিক জীবনরেখা কর্ণফুলী নদী তার স্বাভাবিক নাব্যতা হারাচ্ছে এবং মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে হালদা নদীর সংবেদনশীল বাস্তুসংস্থান। চট্টগ্রামের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের নিরসন করা কেবল কোনো সাধারণ আঞ্চলিক উন্নয়ন এজেন্ডা নয়, এটি সামগ্রিক জাতীয় অস্তিত্বের মূল প্রশ্ন।
চট্টগ্রামকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি, কঠোর ও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে পরিচালিত মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ নির্ধারিত সময়ে ও স্বচ্ছতার সাথে শেষ করতে হবে। অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটাচালিত প্রাচীন খালগুলো উদ্ধার করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপকূলীয় বলয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক পাম্পিং স্টেশন ও জোয়ার প্রতিরোধক স্লুইস গেট স্থাপন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পাহাড় কাটার সাথে যুক্ত অসাধু ও প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে পার্বত্য ও টিলা এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি হালদা নদীকে বিশেষ পরিবেশগত সংরক্ষণ অঞ্চল হিসেবে শতভাগ রক্ষা করা এবং কর্ণফুলী নদীকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য রাখা ও কারখানার শিল্পবর্জ্য ফেলার আগে বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি ব্যবহারে শিল্পমালিকদের বাধ্য করা অত্যন্ত জরুরি।
তৃতীয়ত, চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক গতিশীলতা বাড়াতে বন্দরে শতভাগ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন সম্পন্ন করা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগামী ডেডিকেটেড রেল কার্গো ট্র্যাক নির্মাণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এর ফলে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের সময় ও পরিচালন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রসমূহে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কাস্টমস সংক্রান্ত অনুমোদনের কাজে ঢাকার ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে চট্টগ্রামেই শক্তিশালী 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' হাব কার্যকর করতে হবে। একই সাথে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ-র মতো স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী ৫০ বছরের উপযোগী একটি স্মার্ট, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল আন্তর্জাতিক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
পরিশেষে, চট্টগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন জেলা কিংবা সাধারণ বাণিজ্যিক শহর নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতীক, বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল সোপান এবং সার্বভৌম অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রধান কেল্লা। চট্টগ্রাম থমকে যাওয়া মানে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য স্থবির হওয়া, রপ্তানি প্রবাহ থমকে যাওয়া এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ভয়াবহ ধস নামা।
সুতরাং, চট্টগ্রামকে রক্ষা করে একটি বৈশ্বিক মানের স্মার্ট, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক হাবে রূপান্তর করা কোনো স্থানীয় দাবি নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশ রক্ষার সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার। চট্টগ্রাম রক্ষা পেলেই সুসংহত থাকবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সুরক্ষিত থাকবে আমাদের সমৃদ্ধ আগামীর সম্ভাবনা।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









