চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক দেড় বছর পর চলতি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তি হয়েছে হালে। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার এক দিন পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিন অগ্রাধিকার ঠিক করে সরকার।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এরপর কেটেছে ১৮০ দিন। স্বাভাবিকভাবেই সেই অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে, ছয়মাস পরে সেই প্রশ্নই সামনে আসছে। মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান কঠিন। তবে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা রয়েছে, এটা মানতেই হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।
গত ছয় মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে যে বাংলাদেশকে আবার নতুন করে পুনর্গঠন শুরু হয়েছে, সেখানে মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান করে ফেলা হয়ত কিছুটা দুরূহ। কারণ, দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী স্বেচ্ছাচারি দুঃশাসনে দেশের প্রতিটি সেক্টরে চরম বিপর্যয় এবং অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা আর লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। রেখে গিয়েছিল শূন্য ভাণ্ডার। লুটপাট এবং বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের অর্থপাচার আমাদের গোটা অর্থনীতিকে রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত করেছে।
দেশকে একটা মগের মুল্লুকে পরিণত করেছিল স্বৈরাচারী, স্বেচ্ছাচারি আওয়ামী লীগ সরকার। দলীয়করণ ও দখলদারির রামরাজত্ব কায়েম হয়েছিল সেই ১৬ বছর ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকা দুঃশাসনের আমলে। তবে একটি বিষয় আজ নিশ্চিতভাবে বলা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই নির্বাচিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের রয়েছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই ডাইন্যামিক মানুষটি তার সহযোগী কর্মীবাহিনী নিয়ে ।
তাঁর আন্তরিকতা সততা ও নিষ্ঠার অভাব নেই বিন্দুমাত্র। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তির ভেতরে রয়েছে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলটির সুদৃঢ় রাজনৈতিক দর্শন। এই ইশতেহারেই প্রতিফলিত হয়েছে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯ দফা, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সেই ‘ভিশন ২০৩০’, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রণীত বিএনপির ২৭ দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক সব রাজনৈতিক দলকে এক কাতারে নিয়ে আসা সেই ৩১ দফা। সুতরাং ঐতিহাসিক ১৯ দফা, ভিশন ২০৩০, ২৭ দফা ও ৩১ দফা- এই চারটি মৌলিক বিষয় এবং নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত ইশতেহারের আলোকেই আজ দেশ পরিচালিত হচ্ছে।
ঠিক যেভাবে নোট অব ডিসেন্টসহ বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল, ঠিক সে অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হবে বলে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সততা নিয়ে কারো মনে সন্দেহ কিংবা সংশয় নেই। একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবেই শুধু নয়, একজন সত্যিকারের যুগোপযোগী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানের সক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চমকপ্রদ একটি বিষয় হলো, ভোট দেওয়ার পর হাতের কালি শুকানোর আগেই নির্বাচনী ইশতেহারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল।
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ভেতর সবার আগে যে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করা হয়েছিল, তা হলো কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করা। প্রথম মন্ত্রিসভার সেই অনুমোদিত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়েছে। এ সময় কৃষকদের ক্ষমতায়নে কৃষক কার্ড, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসীদের অধিকার ও সহায়তায় প্রবাসী কার্ড এবং দেশজুড়ে প্রতিটি জেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর উদ্যোগ, ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, যাজক ও বৌদ্ধ অধ্যক্ষদের জন্য সম্মানী, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে ,যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
বিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে যখন বিএনপি সরকার যাত্রা শুরু করেছিল তখন একের পর এক ভয়াবহ সংকট এসে হানা দিয়েছে। যা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যেকার যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের মতো দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। সেটি ছিল ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো অবস্থা।
কারণ, দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো রেখে গিয়েছিল, যা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। তাঁরা দায়িত্ব গ্রহণের পরই পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। সরকার গঠনের অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় যাতে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে না পারে এবং কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি না পায়, সে বিষয়ে কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় দীর্ঘকাল পর কোনো ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি।
গত ছয় মাসে বাক্স্বাধীনতা, আইনের অনুশাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখার দৃষ্টান্ত দেখা গেছে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন হয়নি। আমরা দেখেছি সর্বোচ্চ বাক্স্বাধীনতা। অনেক সময় তা সীমা লঙ্ঘন করেছে, উসকানি দেওয়া হয়েছে কিংবা অশোভন আচরণ করা হয়েছে। তবু সরকারের সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে ঠিক যেভাবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটিকে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছে জনগণের এই সরকার। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং সম্পূর্ণ নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে যেই শিক্ষার্থীর যে গ্রেড বা নম্বর প্রাপ্য, ঠিক সেভাবেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ভাতা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ফ্যাসিবাদের সরকার লোপাট করে দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ২০২২ সালের পর থেকে বিগত চার বছর ধরে সম্মানিত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা তাঁদের অবসর ও কল্যাণের ন্যায্য টাকা পাননি। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে অর্থের সংস্থান করে দেন। দুই দিন আগে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ২ হাজার কোটি টাকার চেক প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যক্রমে চতুর্থ শ্রেণিতে দুটি এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা, প্রথম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ প্রদান শুরু হয়েছে। প্রাইমারি গোল্ডকাপে ছেলে, মেয়েসহ মোট ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে দেশজুড়ে একটি অভূতপূর্ব ক্রীড়া বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ‘ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং কম্পিটিশন’ আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায়, মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে মিড-ডে মিল কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে চালু হয়েছে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং তৃতীয় ভাষায় দক্ষ বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে বাইরে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার কিছুটা প্রভাব এ দেশের ওপরও পড়েছে। বিগত এক মাস ধরে গ্যাসের যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। দেশের সর্বত্র হাহাকার লেগে গেছে। ঘরে ঘরে চুলা জ্বলছে না গ্যাসের অভাবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় বহু কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক প্রস্তুতের কারখানা বন্ধ থাকায় বিদেশি অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে সারা দিন অপেক্ষা করেও গাড়ির জন্য গ্যাস পাওয়া দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই আশ্বস্ত করেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশায়, এই সংকট অচিরেই কেটে গিয়ে অর্থনীতিতে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণ, একতরফা নির্বাচন কিংবা সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি ওঠে। এই সংস্কার বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করেছিল। তাদের সুপারিশগুলো নিয়ে একটি ঐকমত্য কমিশনও গঠন হয়। এসব সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছিল, যার ওপর গণভোটও হয়। সেই গণভোটে 'হ্যা' বিজয়ী হয়। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে জয়লাভের পর ওই গণভোট আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় শুরুতেই বিরোধী দলের সাথে একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়াও স্বাধীন বিচার বিভাগ, গুম কমিশন গঠন কিংবা দুর্নীতি দমনের মতো বেশ কিছু ইস্যুতে ছয় মাস পার হতে চললেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন অনুমোদন করা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা না রাখা, পুলিশ সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হতাশা তৈরি করেছে। বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি পরিবর্তন বা সংস্কারে গুরুত্ব দিবে। কিন্তু নির্বাচনের পর গত ছয় মাসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন মানুষ দেখতে পায়নি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বা সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির এই অবস্থানের কারণে ছয় মাস যেতে না যেতেই এরই মধ্যে মাঠের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি জোট। সরকারি পদে দলীয় নিয়োগ পাওয়া নেতারা দলের পদ ছাড়ছেন না বলেও খবর মিলছে। এতে তাঁরা দল ও রাষ্ট্রের কাজ কোনোটিতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না ঠিকমতো। ৪০০-৫০০ গুরুত্বপূর্ণ আমলা-সংগঠক নিয়ে শিগগিরই বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে পারে।
যে আন্দোলন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিশ্চিত করেছে এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে, তার মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়োগে ‘কোটার বদলে মেধা’কে অগ্রাধিকার দেওয়া। ছয় মাসে সেই প্রত্যাশার কতটা মর্যাদা রাখা হলো, সেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ ফেরানো বিএনপির বড় ‘কৃতিত্ব’। রাজনৈতিকভাবে আরো সহনশীল হতে হবে সরকারকে। অর্থনীতির দুর্গতি রয়ে যাওয়াটা বিএনপি সরকারের জন্য একধরনের অস্বস্তি নিঃসন্দেহে। এটা কাটিয়ে উঠতে সিরিয়াস তৎপরতা চালাতে হবে। তা না হলে পরবর্তীকালে সংকট আরো ঘনীভূত হয়ে সরকারের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলতে পারে। এই সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন তো অর্থনীতি একেবারে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল।
সেটিও তারা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। অর্থনীতি এতটাই জটিল ও দুরাবস্থার মধ্যে ছিল যে, এই ছয় মাসে খুব একটা সমস্যার সমাধান সম্ভব না, সমস্যা সমাধানের জন্য এটি খুব অল্প সময়।এই সময়ের মধ্যেও অর্থনীতিতে কিছু কিছু বিষয়ে ভালো হয়েছে- তা হলো বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। এটা এখনো বাড়ছে, ৩২ বিলিয়ন ডলারের উপরে উঠে গেছে। সেই সঙ্গে বিনিময় হার স্থিতিশীল আছে। মূল্যস্ফীতি এখন খুব একটা বেশি না কমলেও দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে না। ছয় মাসে অর্থনীতির সার্বিক দুর্গতিটা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। কিছু জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে, যেমন রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা বাড়ানো। ব্যাংক খাত কিছুটা ঠিক হওয়ার পথে থাকলেও আরো দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারলে সার্বিক দুর্গতি শেষ হবে। তাহলেই অর্থনীতি আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
ছয় মাসে সরকারকে বিচার করার সুযোগ নাই। এটা কঠিন যে, এটা এতো বেশি সময় নয়। দেশের উন্নয়নে, অগ্রগতি এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক। তবে সরকারের আরো দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ যেসব দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, সে-সব সমাধানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। দ্রুত গ্যাস, বিদ্যুতের সমাধান দরকার। সাধারণ জনগণ সরকারকে সমর্থন করে, কিন্তু এটা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা দরকার। বিএনপি সরকারের শুরুটা ভালো।
একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণভুত্থান পরবর্তীতে; অনেক আশা নিয়ে মানুষ গণঅভ্যুত্থান করেছে, কিন্তু যারা বিবেকবান, তারা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কার্যকলাপে আশাহত হয়েছে। সেখান থেকে একটা অপেক্ষাকৃত স্বস্তির জায়গায় এসেছে নির্বাচনের পরে। মানে অপেক্ষাকৃতভাবে একটা স্থিতিশীল এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এসেছে। সেটা হলো, নির্বাচনের পরবর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন পথে বাংলাদেশের অভিযাত্রা আমাদের আশাবাদী করেছে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









