পৃথিবীর ক্ষমতার মসনদ বড়ই অদ্ভুত এক গোলকধাঁধা, যেখানে আজ যিনি মুকুট পরেন, কাল হয়তো তাকে শূন্যহাতে ও ইমিগ্রেশন ছাড়াই দেশ ছাড়তে হয়। ইতিহাসের পাতা ও ওড়ার ডায়েরি উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতা কীভাবে নিমেষেই পাসপোর্ট-ভিসার তোয়াক্কা না করে সীমানা পার করায়। এই ভ্রমণ বড় রোমাঞ্চকর, যেখানে ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয় না, কেবল বিদায়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে।
ইতিহাসের নির্মম এক বাঁকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস গণআন্দোলনের মুখে ১৯৮৬ সালে মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টারে করে হোয়াইট হাউসের সহায়তায় হাওয়াইতে পালিয়ে যান।
কোনো ধরনের ইমিগ্রেশন বা কাস্টমস চেকিংয়ের পাটাতনে পা না রেখে তিনি সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। ক্ষমতা হারানোর পর এই দ্রুততম প্রস্থান বিশ্ব রাজনীতির এক চিরন্তন দৃশ্য হয়ে রয়েছে।
ভিয়েতনামের শেষ প্রেসিডেন্ট দুওং ভান মিন ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল সাইগন পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। কোনো পাসপোর্টে সিল বা ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সময় বা সুযোগ তার ছিল না, কেবল একটি বিদায়ী রেডিও ভাষণ দিয়ে তাকে অদৃশ্য হতে হয়েছিল। ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে তাকে অচেনা বাতাসে ভাসতে হয়েছিল।
ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের মুখে দেশ ছাড়েন এবং মিশর ও মরক্কোর উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠেন। রাজকীয় তখ্তেতাউস হারিয়ে তার এই প্রস্থান ছিল সম্পূর্ণ দাপ্তরিক ইমিগ্রেশনের সীমানা ছাড়িয়ে এক শূন্যতার যাত্রা। দেশের মাটি যখন পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছিল, তখন কোনো ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার লাল কালির সিলের অপেক্ষা করার বিলাসিতা তার ছিল না।
ইউপান্ডার ত্রাস ইদি আমিন ১৯৭৯ সালে তানজানিয়ার বাহিনীর অগ্রগতির মুখে লিবিয়ায় আশ্রয় নেন এবং পরে সৌদি আরবে স্থায়ী হন। রক্তক্ষয়ী শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি যখন বিমানে চড়েছিলেন, তখন ইমিগ্রেশন বা পাসপোর্টের কোনো বালাই ছিল না, ছিল কেবল বেঁচে থাকার তীব্র এক তাড়া। স্বৈরশাসকদের এই পলায়নপর যাত্রা বিশ্ব ইতিহাসের এক অদ্ভুত রম্য অধ্যায়।
হাইতির প্রেসিডেন্ট জঁ-ক্লোদ দুভালিয়া ওরফে বেবি ডক ১৯৮৬ সালে এক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্রান্সে পালিয়ে যান। স্বর্ণবার আর ডলারে ভরা স্যুটকেস নিয়ে তার সেই দ্রুত প্রস্থানে কোনো ইমিগ্রেশনের সিল মারার লোক ছিল না, ফরাসি রিভিয়োরার হাওয়া তাকে টানে। দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে সেদিন তিনি ইমিগ্রেশন ছাড়াই বিমিটারে দেশত্যাগ করেছিলেন।
আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট প্রেসিডেন্ট বাবরাক কারমাল ১৯৮৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সোজা মস্কোর ফ্লাইটে চড়েন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়াতলে তার এই প্রস্থানে কাবুলের ইমিগ্রেশন বিভাগ কোনো বাধা দেয়নি বা পাসপোর্টের পাতা ওল্টায়নি। এক মতাদর্শের পতন যখন নিশ্চিত হয়েছিল, তখন ইমিগ্রেশনের তোয়াক্কা না করে তাকে গোপনে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।
ইথিওপিয়ার একনায়ক মেনিজিতু হেইলে মারিয়াম ১৯৯১ সালে বিদ্রোহীদের রাজধানী দখলের প্রাক্কালে জিম্বাবুয়েতে পালিয়ে যান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হারানোর পর অত্যন্ত গোপনে সামরিক বিমানে তার এই প্রস্থান ছিল ইমিগ্রেশনের গণ্ডির সম্পূর্ণ বাইরে। নিজ দেশের মাটিতে যার একচ্ছত্র ইশারা আইন ছিল, তাকেই শেষ মুহূর্তে পাসপোর্টহীন এক যাযাবর হিসেবে ভিন্দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট স্যামুয়েল ডো ১৯৯০ সালে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার সেই পলায়ন ও দেশত্যাগের প্রচেষ্টা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ইমিগ্রেশনের কোনো নিয়মের মধ্যে না থেকে জীবন বাঁচানোর মরিয়া এক তাড়া। ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিণতি তাকে চরম মূল্য দিতে বাধ্য করেছিল।
চাদের প্রেসিডেন্ট হিসেন হাব্রে ১৯৯০ সালে ইদ্রিস দেবির কাছে ক্ষমতা হারিয়ে সেনেগালে পালিয়ে যান। ইমিগ্রেশনের দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সীমান্ত পার হয়ে তার এই প্রস্থান প্রমাণ করে যে মসনদ হারানোর পর রাজারা কত দ্রুত সাধারণ প্রজার চেয়েও অসহায় হয়ে পড়েন। তার এই শূন্যে বা অদৃশ্য যাত্রার ইতিকথা আফ্রিকা মহাদেশের রাজনীতিতে এক সতর্কবার্তা হয়ে রয়েছে।
হাইতির আরেক প্রেসিডেন্ট জঁ-বের্নাক আররিস্টাইড ২০০৪ সালে এক অভ্যুত্থানের মুখে মার্কিন সামরিক বিমানে করে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। সেই রাতের অন্ধকারে কোনো ইমিগ্রেশন সিল ছাড়াই তার প্রস্থান বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল।
কিউবার স্বৈরশাসক ফুলচেনসিও বাতিস্তা ১৯৫৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের মুখে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে পালিয়ে যান। ক্রিসমাসের ঠিক পরপরই অর্জিত সম্পদের থলি নিয়ে তার সেই আকস্মিক বিমানযাত্রা ছিল ইমিগ্রেশনের সীমানা অতিক্রমকারী এক নাটকীয় পলায়ন। দেশের সাধারণ মানুষের বিজয় উল্লাসের আগেই তিনি পাসপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই হাভানা ছেড়েছিলেন।
প্যারাগুয়ের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আলফ্রেডো স্ট্রয়েসনার ১৯৮৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে ব্রাজিলে আশ্রয় নেন। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার পর শেষ মুহূর্তে তাকে কোনো ইমিগ্রেশন চেকের মুখোমুখি হতে হয়নি, সামরিক সুরক্ষায় তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।
রুমানিয়ার শেষ কমিউনিস্ট একনায়ক নিকোলাই চওসেস্কু ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরের বিপ্লবের সময় হেলিকপ্টারে করে রাজধানী থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। জনতার রোষানল থেকে বাঁচতে তার সেই পলায়ন ছিল রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও ইমিগ্রেশনের সমস্ত নিয়মকানুনের বর্হিভূত। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি, তবুও সেই পলায়নের চেষ্টা বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য ও ট্র্যাজিক উদাহরণ হয়ে আছে।
তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলী ২০১১ সালের আরব বসন্তের সূচনালগ্নে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। দেশজুড়ে গণবিক্ষোভের মুখে রাজকীয় বিমান বহর নিয়ে তার সেই নাটকীয় প্রস্থানে কোনো ইমিগ্রেশনের অপেক্ষা ছিল না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ২০১৪ সালে ইউরোমেইদান বিপ্লবের পর গোপনে রাশিয়ায় পালিয়ে যান। রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বলয় ভেঙে তার এই পলায়ন ছিল দাপ্তরিক পাসপোর্টের সিলমুক্ত এবং ইমিগ্রেশনবিহীন এক রহস্যময় যাত্রা। নিজের দেশের সংসদ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তার এই সীমান্ত পার হওয়া বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছিল।
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে ২০২২ সালে গণআন্দোলনের মুখে সামরিক বিমানে করে প্রথমে মালদ্বীপ এবং পরে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান। চরম অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষুব্ধ জনতার গণভবন দখলের পর তার এই প্রস্থান ছিল কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া ছাড়াই সম্পন্ন হওয়া এক ঐতিহাসিক ঘটনা। দ্বীপরাষ্ট্রটির মসনদ ছেড়ে তার এই পলায়ন দ্বীপের রাজনীতিতে এক নতুন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল।
আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবাজেদের কাবুল দখলের সময় গোপনে হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়েন। বিশাল অংকের অর্থ সাথে নিয়ে তার এই পলায়ন ছিল আফগান নাগরিকদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে করা এক আকস্মিক প্রস্থান। ইমিগ্রেশনের কোনো সিল বা দাপ্তরিক ছাড়পত্র ছাড়াই তার এই দেশত্যাগ বিশ্ব রাজনীতিতে এক তীব্র ধিক্কার ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের আকস্মিক অগ্রযাত্রার মুখে ক্ষমতা হারিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। দামেস্কের পতন নিশ্চিত হওয়ার পর সামরিক বিমানে তার এই অত্যন্ত গোপন ও দ্রুত প্রস্থান ছিল যেকোনো ধরনের ইমিগ্রেশনের হিসাব-নিকাশের বাইরে।
মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই রাজোলিনা ২০২৩ বা পরবর্তী সময়ে তীব্র ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ও সামরিক চাপে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। দ্বীপরাষ্ট্রটির উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার এই প্রস্থানও ছিল প্রথাগত আইন ও ইমিগ্রেশনের সীমানা ছাড়িয়ে এক আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র রাজনৈতিক সংকট ও গণআন্দোলনের মুখে কুরমিতোলা বিমানঘাঁটি হতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০জে হারকিউলেস সামরিক বিমানে করে দেশত্যাগ করতে হয়। এই যাত্রার প্রাক্কালে কোনো প্রথাগত বা সাধারণ ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়নি, বরং সামরিক ব্যবস্থাপনায় তিনি রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করেন। সংকটের সেই মুহূর্তে নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুততম সময়ে এই প্রস্থান সম্পন্ন হয়েছিল, যা দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বা দেশটির নিরাপত্তা ও বিমান বাহিনী এই সামরিক বিমানটিকে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণের অনুমতি প্রদান করে এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাকে গ্রহণ করে। সেখানে পৌঁছানোর পর ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়। এই পুরো গ্রহণ প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ কূটনৈতিক ও বিশেষ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার অধীনে, যা প্রচলিত সাধারণ ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের গণ্ডির বাইরে একটি ব্যতিক্রমী ভূরাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাসের এই বর্ণিল ও রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়গুলো আমাদের কেবল ক্ষমতার ভঙ্গুরতাই মনে করিয়ে দেয় না, বরং বুঝিয়ে দেয় যে মাটির টানে গড়া সিংহাসন একদিন বাতাসে মিলিয়ে যায়। পাসপোর্ট-ভিসার ক্ষুদ্র গণ্ডি তখন পরাক্রমশালীদের বাঁচাতে পারে না, শূন্যতার মাঝে শুরু হয় তাদের আরেক অজানা যাত্রা। মানবসভ্যতার এই অন্তহীন নাটকে রাজা ও প্রজা শেষ পর্যন্ত সময়ের নিখুঁত এক খেলায় কেবলই ক্ষণস্থায়ী চরিত্রের মতো মিলিয়ে যান।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









