বাংলাদেশের মানুষের জীবনে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও খরার মতো দুর্যোগ এক কঠিন বাস্তবতা। এসব দুর্যোগে কখনো ভেসে যায় ঘরবাড়ি, তলিয়ে যায় ফসলের মাঠ, আবার কখনো নদীর গর্ভে হারিয়ে যায় মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয়। দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন জরুরি হলেও কেবল ক্ষয়ক্ষতি পূরণের উদ্যোগ দিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া, ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর ইউএনডিআরআর (UNDRR) নির্ধারিত প্রতিপাদ্য `Resilience Starts at Home’, যার বাংলা ভাবানুবাদ `ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’। এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু হয় পরিবার ও বসতবাড়ি থেকে, আর সেই প্রস্তুতির বিস্তার ঘটে সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তীর্ণ নদীব্যবস্থা, মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও বঙ্গোপসাগরের নৈকট্য দেশটিকে বহুমুখী দুর্যোগের ঝুঁকিতে রেখেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা এই ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ৬০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রাথমিক মূল্যায়নে ওই বন্যায় বিভিন্ন খাতে প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬৭ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে কৃষি খাতে ক্ষতি ছিল প্রায় ৪৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, দুর্যোগ শুধু মানুষের জীবন বিপন্ন করে না, জাতীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগসমূহকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি পড়ে কৃষি ও কৃষকের জীবনে। কয়েক মাসের শ্রম, সঞ্চয় ও ঋণ করে কেনা কৃষি উপকরণে গড়ে ওঠা ফসল অল্প সময়ের পানিতে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তলিয়ে যায় বীজতলা, নষ্ট হয় সবজি ও মাছের ঘের, দেখা দেয় গবাদিপশুর খাদ্যসংকট। ফসলের সঙ্গে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে কৃষকের পরিবারের খাদ্য জোগান, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষের পুঁজি। যাঁর সারা বছরের জীবিকা জমির ফসলের ওপর নির্ভরশীল, তাঁর কাছে বন্যা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রামও কঠিন করে তোলে।
পানি নেমে যাওয়ার পর জলাবদ্ধতা ও কৃষি উপকরণের সংকট পুনরায় চাষাবাদে বাধা সৃষ্টি করে। এ ক্ষতি কমাতে কৃষকের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পৌঁছানো, জলসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত সম্প্রসারণ, নিরাপদ স্থানে বীজ সংরক্ষণ এবং সময়মতো ফসল কাটার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত বীজ, সার ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধে যৌক্তিক সময়সীমা এবং কার্যকর ফসলবিমার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষককে সুরক্ষা দেওয়া মানে শুধু উৎপাদন রক্ষা নয়, একটি পরিবারের জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মানুষের জীবন, বসতভিটা ও জীবিকাকে বারবার বিপর্যস্ত করে। প্রবল বাতাসে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল, মাছের ঘের ও সুপেয় পানির উৎস। পূর্বাভাস পাওয়ার পরও অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চান না। দূরত্ব, যাতায়াতের অসুবিধা, গবাদিপশু ফেলে যাওয়ার ভয় এবং আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব এর অন্যতম কারণ। তাই শুধু সতর্কবার্তা প্রচার নয়, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয়, টেকসই বেড়িবাঁধ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন, উপকূলীয় বন সংরক্ষণ এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের চাষ সম্প্রসারণও জরুরি। অন্যদিকে, নদীভাঙন মানুষের জমি, বসতভিটা ও জীবিকার ভিত্তি কেড়ে নেয়। বারবার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো অনেক সময় শহরে গিয়ে অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, নদীর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তীর সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে পরিকল্পিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবারের আগাম প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’, এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। দুর্যোগ সহনশীলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিটি পরিবার ও বসতবাড়িতে। এ জন্য জরুরি যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ, শুকনো খাবার ও নিরাপদ পানি মজুত রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চ, প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জলরোধী প্যাকেটে রাখা জরুরি। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে নিকটবর্তী আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান ও নিরাপদে সেখানে যাওয়ার পথ জানতে হবে। বন্যাপ্রবণ এলাকায় ঘরের উচ্চতা, মজবুত নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। তবে, দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এককভাবে নিরাপদ ঘর নির্মাণ কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ- সব সময় সম্ভব নয়।
তাই সরকারি সহায়তা, স্থানীয় সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত দুর্যোগ মহড়া, বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন এবং কৃষকের কাছে সহজবোধ্য আগাম পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সতর্কবার্তা পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়, সেই বার্তা অনুযায়ী দ্রুত নিরাপদ পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। এভাবেই ঘরের প্রস্তুতি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রের দুর্যোগ সহনশীলতা শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের কার্যক্রম প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে, অর্জিত সাফল্যে সন্তুষ্ট থাকার সুযোগ নেই। দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি আগেই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত মানচিত্র হালনাগাদ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানো, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত দুর্যোগ মহড়া এবং আশ্রয়কেন্দ্রে সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ব
ন্যাপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ স্থানে বীজ সংরক্ষণ, জলসহিষ্ণু ফসলের জাত সম্প্রসারণ ও জরুরি কৃষি উপকরণ প্রস্তুত রাখতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আশ্রয়কেন্দ্রের উন্নয়ন এবং গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা না করে সড়ক, বাঁধ, আবাসন কিংবা অন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়। প্রতিটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সম্ভাব্য বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু কত মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে কত প্রাণ রক্ষা পেল, কত ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতির হাত থেকে বাঁচল এবং কত পরিবার দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারল, তার ওপর। দুর্যোগের পর ত্রাণ দিয়ে ক্ষতি সামলানোর চেয়ে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষতি ঠেকানোই হোক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য।
দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণ মানবিক দায়িত্ব, কিন্তু দুর্যোগের আগেই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি নেওয়া দূরদর্শী রাষ্ট্র ও সমাজের পরিচয়। নিরাপদ বসতবাড়ি, সচেতন পরিবার, প্রস্তুত জনগোষ্ঠী, দুর্যোগসহনশীল কৃষি এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা পরস্পরের পরিপূরক। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, কৃষক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ঘর নিরাপদ হলে পরিবার সাহস পায়, পরিবার প্রস্তুত থাকলে সমাজ শক্তিশালী হয়, আর সমাজের সক্ষমতা বাড়লে রাষ্ট্রও দুর্যোগের আঘাত সামলে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই দুর্যোগের পর ত্রাণের অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগেই পরিকল্পিত প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হবে।
ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক নিরাপত্তার চর্চা, কৃষিতে জোরদার হোক দুর্যোগসহনশীলতা, আর সবার সম্মিলিত উদ্যোগে বাংলাদেশ হয়ে উঠুক দুর্যোগ মোকাবিলায় আরো সক্ষম, নিরাপদ ও মানবিক দেশ।
লেখক : কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









