ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, নাট্যকার ও চিন্তাশীল শিল্পী ঋত্বিক কুমার ঘটকের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। কিন্তু তার শিল্প, দর্শন আর সিনেমার ভাষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, জীবন্ত এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার হৃষিকেশ দাশ রোডের ঝুলন বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং মাতা ইন্দুবালা দেবী ছিলেন রাজশাহীর মেয়ে। পদ্মা নদীর সান্নিধ্যে কেটেছে তার শৈশব, যা পরবর্তীতে তার শিল্পভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ ঋত্বিক ঘটকের জীবনে নিয়ে আসে গভীর মানসিক আঘাত। পরিবারসহ তাকে পাড়ি জমাতে হয় কলকাতায়। জন্মভূমি হারানোর বেদনা, শরণার্থীর জীবন এবং ভাঙন এসব অভিজ্ঞতা আমৃত্যু তাড়িয়ে বেড়িয়েছে তাঁকে। তার চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে তাই দেশভাগের ক্ষত, মানুষের সংগ্রাম ও বিচ্ছেদের আর্তনাদ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
কলকাতায় তিনি যোগ দেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)-তে। পাশাপাশি যুক্ত হন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে, কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) এর সদস্যপদ গ্রহণ করেন।
নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তার হাতেখড়ি। এতে অভিনয়ের পাশাপাশি সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
১৯৪৮ সালে লেখেন প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। এরপর একাধিক নাটক রচনা, অভিনয় ও নির্দেশনার মাধ্যমে গড়ে তোলেন নিজের শিল্পীসত্তা। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’।
১৯৫৭ সালে মুক্তি পায় ‘অযান্ত্রিক’ যা তাকে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে স্বতন্ত্র নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর একে একে নির্মাণ করেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক সৃষ্টি- মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) এই তিনটি চলচ্চিত্র আজও ‘ঋত্বিক ট্রিলজি’ নামে পরিচিত, যেখানে দেশভাগ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের যন্ত্রণা শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে।
১৯৭২ সালে তিনি মাতৃভূমি বাংলাদেশে এসে নির্মাণ করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় এবং আন্তর্জাতিকভাবেও সমাদৃত হয়।
১৯৭০ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। একই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ স্বর্ণপদক লাভ করেন।
১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় তার শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’, যা অনেকাংশে তার আত্মজীবনীমূলক সৃষ্টি। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে রজত কমল অর্জন করেন।
মাত্র ৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই ঋত্বিক ঘটক হয়ে উঠেছেন বাংলা ও ভারতীয় সিনেমার এক অনন্য অনুপ্রেরণা। জীবনের শেষ দিকে মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন এই নির্মাতা। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তার জীবনাবসান ঘটে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









