বাংলা সাহিত্যে যারা মানুষের কথা বলেছেন মানুষের ভাষায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্মরণীয়। সমাজের প্রান্তিক মানুষ, অবহেলিত নারী, বঞ্চিত জীবনের দীর্ঘশ্বাস এইসব অনুচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে সাহিত্যের মূল স্রোতে তুলে এনেছিলেন তিনি। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) এই কালজয়ী কথাশিল্পীর ৮৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র। দারিদ্র্যপীড়িত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। ভবঘুরে পিতার সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, যার প্রভাব পড়ে তার শিক্ষাজীবনেও।
অর্থাভাবে স্কুল ছাড়তে হলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ কখনো নিভে যায়নি। আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় আবার পড়ার সুযোগ পান। কলেজে ভর্তি হলেও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হয় তাকে রাতে ছাত্র পড়ানো, বন্ধুর কাছ থেকে বই ধার করে পড়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকেই যায়, কিন্তু আত্মশিক্ষায় তিনি হয়ে ওঠেন সমৃদ্ধ ও গভীর মননের মানুষ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বনেলী রাজ-এস্টেটে কয়েকদিন চাকরি করেন। কিন্তু পিতার ওপর অভিমানবশত তিনি সন্ন্যাসী সেজে ঘর ছেড়ে চলে যান। এই সময় তার পিতার মৃত্যু হলে তিনি ভাগলপুর ফিরে আসেন। পিতার শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে কলকাতা যাত্রা করেন। যেখানে তিনি কলকাতা উচ্চ আদালতের উকিল লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে, হিন্দি বইয়ের ইংরেজী তর্জমা করার জন্য মাসে ত্রিশ টাকা বেতনের চাকরি পান। ১৯০৬ সালে বর্মার পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস (রেঙ্গুন) চাকরি পান। ১৯১২ সালে শরৎচন্দ্র ছুটি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এই সময় ‘যমুনা’ নামে পত্রিকার সম্পাদক ফনীন্দ্রনাথ পাল তাকে পত্রিকার জন্য লেখা পাঠাতে অনুরোধ করেন। সেই অনুযায়ী, শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে ফিরে গিয়ে "রামের সুমতি" গল্পটি পাঠিয়ে দেন। যা যমুনা পত্রিকায় (১৩১৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন ও চৈত্র্য সংখ্যায়) প্রকাশিত হয়। ১৯১৬ সালে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছুটি নিয়ে মনোমালিন্যের কারণে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাংলায় (রেঙ্গুন) ফিরে আসেন। শরৎচন্দ্র ১৯০৫ সালে বার্মা রেলের হিসাব পরীক্ষক হিসেবে ৭৫ টাকা মাইনে কেরেনিগিরির চাকরি লাভ করেন। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছুটি নিয়ে মনোমালিন্যের কারণে শরৎচন্দ্র চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রেঙ্গুন ত্যাগ করে বাংলায় ফিরে আসেন।
শরৎচন্দ্র ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। সাহিত্য ছাড়াও গান, অভিনয় ও লোকজ চিকিৎসায় তার দক্ষতা ছিল। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একান্ত মানবিক। সমাজের রক্ষণশীলতা ও পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতার শিকার নারীদের প্রতি তার সহানুভূতি সাহিত্যে পেয়েছে গভীর ও মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশ। পতিতা ও সমাজচ্যুত নারীদের জীবনকথা তিনি উপস্থাপন করেছেন করুণা নয়, মানবিক সম্মানের আলোয়।
জীবজন্তুর প্রতিও তার ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। দীর্ঘদিন তিনি পশুক্লেশ নিবারণী সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অতিথিপরায়ণ, বন্ধুবৎসল এবং পরিমিত রুচির মানুষ। আত্মপ্রচার থেকে বরাবরই দূরে থেকেছেন তিনি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিজীবন ছিল বেদনাবিধুর। প্রথম স্ত্রী শান্তি দেবী ও একমাত্র পুত্রের অকালমৃত্যু তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। দ্বিতীয় স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবীর সঙ্গে তার জীবন ছিল শান্ত, যদিও নিঃসন্তান।
জীবনের শেষপ্রান্তে যকৃতের ক্যানসারে আক্রান্ত হন শরৎচন্দ্র। ১৯৩৮ সালের ১২ জানুয়ারি তার অস্ত্রোপচার হয়। চার দিন পর, ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টা ১০ মিনিটে (বাংলা ১৩৪৪ সালের ২রা মাঘ) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার অনেক উপন্যাস ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে। বড়দিদি (১৯১৩), পরিণীতা (১৯১৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), দেবদাস (১৯১৭), চরিত্রহীন (১৯১৭), শ্রীকান্ত (চারখণ্ডে ১৯১৭-১৯৩৩), দত্তা (১৯১৮), গৃহদাহ (১৯২০), পথের দাবী (১৯২৬), শেষ প্রশ্ন (১৯৩১) ইত্যাদি শরৎচন্দ্র রচিত বিখ্যাত উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার জন্য তিনি ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ নামে খ্যাত। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক পান৷ এছাড়াও, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ডিলিট’ উপাধি পান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে। শরৎচন্দ্রের অনেকগুলি উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে, এবং সেগুলো প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখকে যে গভীর সহানুভূতি ও সততার সঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্যে তুলে ধরেছেন, তা আজও পাঠককে ভাবায়, আলোড়িত করে। বাংলা সাহিত্যে তার অবস্থান তাই সময়ের ঊর্ধ্বে, চিরকালীন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









