বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময়ের অন্যতম প্রধান শক্তি এবং ‘কিংমেকার’ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি (জাপা) এবার আক্ষরিক অর্থেই অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে একটিতেও জয়লাভ করতে পারেনি দলটি। দীর্ঘ তিন দশকের সংসদীয় রাজনীতিতে দলটি এই প্রথম কোনো আসন ছাড়াই সংসদ থেকে ছিটকে গেল। ২০০৮ সাল থেকে জাপা আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোটের অংশ ছিল।
২০১৪ এবং ২০১৮-এর নির্বাচনে তারা একদিকে সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিল, আবার অন্যদিকে সংসদের বিরোধী দলও ছিল। এই দ্বিমুখী ভূমিকা জনগণের কাছে এর ইমেজ নষ্ট করে দেয়। ভোটাররা জাপাকে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখা বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ ২০২৪ এর একতরফা দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের কাছে ‘হিরো’ তকমা পেলেও জনগণের কাছে ভিলেন হিসেবে স্বীকৃতি পায় দলটি।
জানা গেছে, সারাদেশের ফলাফল যেমনই হোক না কেন রংপুরে জাতীয় পার্টি দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল কিন্তু এই দুর্গ এবার বিলীন হয়ে গেছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আসন রংপুর-৩ আসনে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন, যা দলটির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপশি দলটির মহাসচিব শামিম হায়দার পাটোয়ারীও পরাজিত হন। অথচ এরশাদ জেলখানায় থাকা অবস্থায়ও রংপুরের ৫টি আসনে পাস করেছেন।
এদিকে সারাদেশে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অধিকাংশ প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যমতে, জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ভোটের হার ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় পার্টির জন্য অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল। নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত জিএম কাদের এবং আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বের কোন্দল ও আইনি লড়াই কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। এ ছাড়া গত তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কখনো মিত্র, কখনো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল‘ হিসেবে ভূমিকা পালন করায় জনগণের কাছে তাদের নিজস্ব কোনো পরিচয় থাকেনি।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফয়সাল মাহমুদ এদিনকে বলেন, ‘এটি জাতীয় পার্টির ইতিহাসের করুণতম অধ্যায়। পুনর্গঠন বা বড় কোনো আদর্শিক পরিবর্তন ছাড়া জাপার রাজনীতিতে টিকে থাকা এখন অসম্ভব প্রায়।’ আগামী দিনগুলোয় জাতীয় পার্টি আগের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে পারবে বলে মনে হয় না।
বিপ্লবোত্তর জনরোষ: ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় পার্টিকে ‘ফ্যাসিবাদ দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে সাধারণ ভোটার ও ছাত্র-জনতা তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দলের শীর্ষ নেতাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও আইনি জটিলতা তাদের নির্বাচনী প্রচারণাকে স্থবির করে দিয়েছিল। নির্বাচনের দিনও অনেক জায়গায় লাঙ্গলের এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংসদে কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় জাতীয় পার্টি একটি ‘নামসর্বস্ব’ দলে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণে অস্তিত্ব সংকট
বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের সমর্থনে জাপা কিছু আসন পেত। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ বা মাঠের বাইরে থাকায় জাপা প্রথমবার সত্যিকারের প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। বিএনপির পুনরুত্থান এবং জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থানের সামনে জাপা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি।
রংপুর দুর্গের পতন
জাতীয় পার্টির জন্য ২০২৬-এর এই নির্বাচন ছিল একটি ‘পলিটিক্যাল ট্র্যাজেডি’, আর সেই ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাদের একসময়ের অভেদ্য দুর্গ রংপুর। যে মাটি থেকে প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কোনো প্রচার ছাড়াই বারবার জিতে আসতেন, সেই মাটিতেই এবার লাঙ্গলের সলিল সমাধি ঘটেছে। আওয়ামী লীগের সাথে অতিরিক্ত মাখামাখির ফলে উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যেও দলটির প্রতি অনীহা দেখা দিয়েছে।
ক্ষমতার অংশীদারত্ব বনাম আদর্শিক বিসর্জন
২০০৮ সাল থেকে জাপা তাদের নিজস্ব ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের চেয়ে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ বা মহাজোটের ছায়াতলে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। এর ফলে তারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছে, সংসদে বিরোধী দলের তকমা পেয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে হারিয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা। ভোটারদের কাছে তারা ‘আওয়ামী লীগের বি-টিম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায়।
ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার অভ্যাস
২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে যখন বড় দলগুলো (যেমন বিএনপি) মাঠের বাইরে ছিল বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ছিল, তখন জাপা আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা নামমাত্র লড়াইয়ে জয়ী হয়ে আসছিল। এই ‘সহজ জয়ের’ অভ্যাস তাদের তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে জাপা যখন প্রথমবারের মতো কোনো বড় সাহায্য ছাড়া (একলা চলো নীতিতে) মাঠে নামল, তখন দেখা গেল তাদের সেই পুরনো ‘ভোট ব্যাংক’ আর অবশিষ্ট নেই। উত্তরবঙ্গের (রংপুর) মানুষও আর তাদের বিশ্বাস করতে পারছে না।
পরনির্ভরশীল রাজনীতির অবসান
জাপার জন্য আওয়ামী লীগের সাথে জোট ছিল অনেকটা ‘লাইফ সাপোর্ট’-এর মতো। আওয়ামী লীগ যখন রাজনীতি থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হলো, তখন জাপার সেই রাজনৈতিক অক্সিজেনের উৎসও বন্ধ হয়ে গেল। পরনির্ভরশীল দলগুলো যখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে যায়, তখন তারা আবিষ্কার করে যে তাদের হাঁটার ক্ষমতাও আর অবশিষ্ট নেই। জাতীয় পার্টি গত ১৫ বছর ধরে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে আওয়ামী লীগের ‘সিট শেয়ারিং’ বা আসন সমঝোতার ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় নৌকা যখন ডুবল, জাপার পক্ষে আর সাঁতরে কূলে ওঠা সম্ভব হয়নি।
জনবিচ্ছিন্নতা ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব
একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকে তার নিজস্ব স্বকীয়তা বা দর্শনের ওপর। কিন্তু গত ১৫ বছরে জাপা তাদের আদর্শকে সুবিধাবাদের কাছে বিসর্জন দিয়েছে।
তারা একইসাথে সরকারের অংশ ছিল আবার নামেমাত্র বিরোধী দলও ছিল। একে রাজনৈতিক ভাষায় ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ বলা হয়। যখন একটি দল তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে কেবল ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ব্যস্ত থাকে, তখনই তার আদর্শিক মৃত্যু ঘটে। এতে ভোটাররা কখনোই বুঝতে পারেনি জাপা আসলে কার পক্ষে। এই দোদুল্যমান নীতি তাদের কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক ভোটব্যাংক তৈরি করতে দেয়নি। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় যখন সাধারণ মানুষ রাজপথে রক্ত দিচ্ছিল, জাপা তখনো নিজেদের অবস্থান নিয়ে দোটানায় ছিল। এই জনবিচ্ছিন্নতা তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ঘৃণার জন্ম দেয়। এতে জনগণের চোখে জাপা হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার একটি অংশ। ফলে ২০২৬-এর নির্বাচনে সাধারণ মানুষ লাঙ্গলকে বর্জন করে জাপাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে।
৩. নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব
এরশাদ পরবর্তী সময়ে দলটি কেবল পারিবারিক কোন্দলে (রওশন বনাম জিএম কাদের) ব্যস্ত ছিল। তৃণমূলের কর্মীদের সাথে কেন্দ্রের কোনো যোগাযোগ ছিল না। নেতারা কেবল সিট শেয়ারিংয়ের আশায় বসে থাকতেন, যার ফলে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছিল। একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকে তার আদর্শ এবং জনগণের আস্থার ওপর। জাপা বারবার অবস্থান পরিবর্তন করায় (কখনো মহাজোট, কখনো মহাজোটের বাইরে থেকেও বিরোধী দল) সাধারণ মানুষের কাছে তাদের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট ছিল না। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর সেই অনাস্থা চরমে পৌঁছায়।
‘কিংশিপ’ থেকে ‘বিলুপ্তি’র পথে
এরশাদের সময় জাপা ছিল ক্ষমতার চাবিকাঠি বা ‘কিংমেকার’। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে তারা যে ‘শূন্য’ হাতে ফিরল, তা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আত্মহত্যারই চূড়ান্ত ফলাফল। নৌকার সাথে তাদের এই সমাধি কেবল নির্বাচনী পরাজয় নয়, বরং একটি দল হিসেবে তাদের প্রাসঙ্গিকতারও সমাপ্তি বলে অনেকে মনে করছেন।
জিএম কাদেরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
রংপুরের সেনপাড়ায় নিজের বাসভবন থেকে নির্বাচনের দিন বের হননি জিএম কাদের। নিজের দুর্গে এই শোচনীয় পরাজয় তাকে কেবল সংসদ থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়নি, বরং দলের ভেতরেও তার নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এ বিষয় জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এদিন-কে বলেন, একমাত্র জিএম কাদেরের অহমিকার কারণে আজ দলটি শেষ হয়ে গেল। এখান থেকে আবার রাজনীতিতে ফেরা অনেক কঠিন ব্যাপার। তা ছাড়া দলের সিনিয়র নেতাদের দল থেকে বাদ দেয়া ছিল চরম খারাপ একটি কাজ। এ সময় যদি আমরা সবাই মিলে নির্বাচনের মাঠে থাকতাম হয়তো এমন পরিণতি হতো না।
এ বিষয়ে অপর এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান প্রয়াত বেঁচে থাকাকালে টের পাননি জিএম কাদের। তবে এবার টের পাবেন রাজনীতি কি জিনিস। এটা গায়ের জোরে চলে না। রাজনীতি কোনো ব্যক্তিগত কাজ না, সবাইকে নিয়েই চলতে হয়। দলের সিনিয়র নেতাদের দল থেকে বের করে দিয়ে তিনি ভাবছিলেন নিজে কিছু একটা হয়ে গেছেন। আসলে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় কেরানি মার্কা লোক দিয়ে রাজনীতি হয় না।
দল থেকে পদত্যাগ করবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদত্যাগ করেই বা এখন কি হবে এখন তো সব শেষ হয়ে গেল। সামনের দিনগুলোয় আর রাজনীতি করতে পারব এমন গ্যারান্টি নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









