রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

মিরপুরের আওয়ামী ‘দুর্গ’ জামায়াতের দখলে

প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

মিরপুরের আওয়ামী ‘দুর্গ’ জামায়াতের দখলে

রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মিরপুর। একসময় যা ছিল আওয়ামী লীগের অভেদ্য দুর্গ, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই এলাকা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক মানচিত্র। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর মিরপুরের আসনগুলোতে (ঢাকা-১৪, ১৫ ও ১৬) আওয়ামী লীগের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় লড়াই হয়েছে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এই তিনটি আসনেই জামায়াত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। 

বিএনপি এবারের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় লাভ করলেও বৃহত্তর মিরপুরের মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিশাল এলাকায় তাদের শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। গত ১৫ বছর মিরপুর (ঢাকা-১৪, ১৫ ও ১৬ আসন) আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, জুলাই বিপ্লবের পর নেতারা পালিয়ে গেলে দলটির তৃণমূলের লোকজন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আর এবারের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কারণে তাদের দীর্ঘদিনের সেই ‘দুর্গ’ এখন হাতছাড়া।

এদিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে শূন্যস্থান পূরণ করেছে জামায়াত। আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘ দমন-পীড়নের মধ্যেও জামায়াত তাদের গোপন সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রেখেছিল। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে তারা সামাজিক সংস্কার, বন্যার্তদের সাহায্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরাসরি মাঠে নেমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। এমনকি তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন এবং হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার মতো বৈচিত্র্যময় পদক্ষেপও নিয়েছে।

ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। তিনি জামায়াতের প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মীর আহমাদ বিন কাসেম মোট ১ লাখ ১ হাজার ১১৩ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সানজিদা ইসলাম পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৩২৩ ভোট।

ঢাকা-১৫ আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ৮৫ হাজার ১৩১টি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৬৩ হাজার ৫১৭ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে জামায়াতের আমির ২১ হাজার ৬১৪ ভোট বেশি পেয়েছেন।

ঢাকা-১৬ আসনের ভোটে বেসরকারি ফলে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. আমিনুল হকের চেয়ে ৩ হাজার ৩৬১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। আব্দুল বাতেন মোট ৮৮ হাজার ৮২৮ ভোট পেয়েছেন। আর আমিনুল হক পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৬৭ ভোট।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি দলের জয় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত। 

এ বিষয়ে অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান (গবেষক ও বিশ্লেষক) এদিনকে বলেন, আওয়ামী লীগের সেই বিশাল ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩০ শতাংশ) এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। তার মতে, যারা বিএনপিকে ভোট দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি, তারা জামায়াতকে একটি ‘সুশৃঙ্খল বিকল্প’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এদিনকে বলেন, জামায়াত গত ১৫ বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলেও তাদের সাংগঠনিক চেইন ভাঙেনি। আওয়ামী লীগের পতনের পর তারা যেভাবে দ্রুত মাঠ দখল করেছে এবং ত্রাণকার্য ও সামাজিক কাজে অংশ নিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘নিরাপত্তাবোধ’ তৈরি করেছে। মিরপুর-১৫ আসনে আমিরের বিজয়ই দলটির সাংগঠনিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিফলন। তিনি বলেন, জামায়াত এবার একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের ‘মডারেট’ বা মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে, যা অনেক দোদুল্যমান ভোটারকে আশ্বস্ত করেছে।

এদিকে বিএনপির ভোট কমার বা ভোটারদের একাংশের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পেছনে এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের কারণে এমন পরাজয় হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ বিদায় নিলে মিরপুরের বিভিন্ন সেক্টরে (যেমন: ঝুট ব্যবসা, পরিবহন সেক্টর এবং ফুটপাত) ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগের পরিবর্তে স্থানীয় অনেক বিএনপি নেতা-কর্মী এসব খাতের নিয়ন্ত্রণে জড়িয়ে পড়েন। ভোটারদের একটি অংশ মনে করেছে, ‘পুরনো দখলদারদের বদলে কেবল নতুন দখলদার এসেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।’

জামায়াতে ইসলামীর ‘ইমেজ’ ও সুশৃঙ্খল প্রচারণা
জামায়াত নিজেদের একটি সুশৃঙ্খল এবং দুর্নীতিমুক্ত দল হিসেবে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে মিরপুরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের কাছে তারা ‘বিএনপির চেয়েও নির্ভরযোগ্য’ একটি বিকল্প হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের মিরপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং তাদের সামাজিক কাজ (যেমন: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ) ভোটারদের ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।

তরুণ ভোটার ও এনসিপি জোট
নতুন প্রজন্মের ভোটারদের একটি বড় অংশ গতানুগতিক বিএনপি-আওয়ামী লীগ ধারার বাইরে পরিবর্তনের আশা করেছিল। ছাত্র আন্দোলনের ফলে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ায় তরুণদের ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপি থেকে সরে গিয়ে এই জোটের বাক্সে পড়েছে।

আওয়ামী লীগ ভোটারদের কৌশলগত অবস্থান
আওয়ামী লীগের প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ ভোট ব্যাংক এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর ছিল। জরিপ অনুযায়ী, যারা বিএনপিকে চিরশত্রু মনে করেন, সেই সব আওয়ামী ভোটারের একটি বড় অংশ (প্রায় ১৩-১৫ শতাংশ) বিএনপিকে ঠেকাতে জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন অথবা নির্বাচনে ভোটদানে বিরত ছিলেন, যা বিএনপির ভোট কমিয়ে দিয়েছে।

সংস্কার বনাম নির্বাচনের তাড়াহুড়ো
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কাজের চেয়ে বিএনপি নির্বাচনের জন্য বেশি তাড়া দিচ্ছিল এমন একটি ধারণা সাধারণ জনগণের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটারদের একটি অংশ মনে করেছে বিএনপি ক্ষমতার জন্য বেশি মরিয়া, যা তাদের প্রতি আস্থায় কিছুটা চির ধরিয়েছে।

বিএনপি ভীতি ও প্রতিহিংসা থেকে সুরক্ষা
আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা মনে করেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা ভয়াবহ প্রতিহিংসা ও মামলার শিকার হতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ দিয়েছে এই শর্তে যে, তারা নির্বাচনে জামায়াতকে সমর্থন করবে। অর্থাৎ, বিএনপির হাত থেকে বাঁচতে তারা জামায়াতকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর সাধারণ ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজিতে বিরক্ত ছিল। তাদের কাছে মনে হয়েছে, জামায়াত অনেক বেশি সুশৃঙ্খল এবং তাদের নেতা-কর্মীরা অন্তত সরাসরি চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্বে জড়ায়নি। এই ‘শৃঙ্খলার’ প্রতি আকর্ষণ থেকে অনেক ভাসমান আওয়ামী ভোটার জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন।

কৌশলগত প্রতিশোধ 
আওয়ামী লীগের কিছু কট্টর সমর্থক মনে করেছেন, বিএনপি যেহেতু তাদের প্রধান রাজনৈতিক শত্রু, তাই একে ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতকে শক্তিশালী করা। এটি ছিল অনেকটা ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ নীতির প্রতিফলন।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.