ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইকের লাইসেন্স ও রুট পারমিট প্রদান, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও হয়রানি বন্ধসহ ১২ দফা দাবিতে রাজধানীর হাজারীবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছেন রিকশাশ্রমিকেরা।
রবিবার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টায় রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের হাজারীবাগ থানা কমিটির উদ্যোগে বেড়িবাঁধের বউবাজার এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর ও লালবাগ এলাকার রিকশাচালকেরা অংশ নেন। কর্মসূচিতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সব গ্যারেজ ও রিকশা বন্ধ রেখে সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন আয়োজকেরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন ও লাইসেন্সের পাশাপাশি চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। একই সঙ্গে সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী কোন সড়কে কতসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করবে, তা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষা ও নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানান তারা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কর্মসূচিতে শ্রমিকেরা জড়ো হতে শুরু করলে পুলিশ তাদের সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়। পরে বেড়িবাঁধের বউবাজার থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ধানমন্ডি ১৫ নম্বর ও শংকর এলাকা ঘুরে রায়বাজারে শহীদ জিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করাই তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার পরও বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিভিন্ন গ্যারেজের বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন এই শ্রমিক নেতা।
তিনি বলেন, শ্রমিকেরা অটোরিকশা চালানো ও চার্জ দেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছেন। ব্যাটারিচালিত যানবাহন যান্ত্রিক বাহনে পরিণত হওয়ায় এসব যানবাহনের নিবন্ধন ও লাইসেন্স এবং চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আওতায় আনার দাবি তাদের।
আব্দুল কুদ্দুসের ভাষ্য, সরকার অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কথা বললেও শ্রমিকেরা শুরু থেকেই বিআরটিএর মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় কোন পথে কতসংখ্যক রিকশা চলবে এবং কোথায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হলে একদিকে সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ হবে, অন্যদিকে দরিদ্র শ্রমিকদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
বুয়েটের তৈরি অটোরিকশার সঙ্গে শ্রমিকদের ব্যবহৃত যানবাহনের তেমন পার্থক্য নেই বলেও দাবি করেন তিনি। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান এবং যানবাহনের লাইসেন্স নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি, যাতে চালকেরা নিয়ম মেনে সড়কে চলাচল করতে পারেন।
সমাবেশে শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন, চার্জিং গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় তাদের কাজ ও আয় ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলে তা আইন অনুযায়ী নেওয়ার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে বৈধ মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, জুলুম-নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ এবং রেকার ও ডাম্পিংয়ের নামে শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান।
তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে সড়কে লেন পদ্ধতি সচল করা, সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ, শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলের নীতিমালা প্রণয়ন। পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবিকা সুরক্ষায় আইন করা, এসব যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিদ্যমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শ্রমিকদের ১২ দফা দাবি
১. দেশের সড়কের উপযোগী নকশায় ব্যাটারিচালিত যানবাহন আধুনিকায়ন করে বিআরটিএর মাধ্যমে লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দিতে হবে।
২. ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে।
৩. সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলের নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৪. শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নামে বৈধ বিদ্যুৎ মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
৫. শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে।
৬. সড়কে লেন পদ্ধতি সচল করার পাশাপাশি সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে।
৭. ব্যাটারিচালিত যানবাহনসংক্রান্ত সব রিট দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৮. শ্রমিকদের জীবিকা সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৯. ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং বিদ্যমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে।
১০. অসাধু বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে।
১১. শ্রমিকদের জন্য রেশনব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১২. দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনে বিনিয়োগ করা পুঁজি সুরক্ষিত রেখে পর্যায়ক্রমে মানুষকে প্যাডেলচালিত বাহন চালানোর কষ্টসাধ্য শ্রম থেকে মুক্ত করতে হবে।
কর্মসূচিতে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, কেন্দ্রীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, হাজারীবাগ থানা কমিটির সভাপতি সুমন মৃধা ও সাধারণ সম্পাদক নুর আলমসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









