জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে পরিস্থতি। সরকারী দল বিএনপির ‘বাহাত্তরের সংবিধানের বাইরে’ গিয়ে জুলাই সনদ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই বলে অনঢ় অবস্থানের বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোটও গণভোটের রায়কে বাস্তবায়ন দেখতে চায় যে কোনো মূল্যে। তাই দুই শিবিরই যেন ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’ অবস্থায়। তবে সরকারী দলের সাথে যেকোনো মূল্যে সমঝোতায় যেতেও চায় জামায়ত। কিন্তু সেই সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হলে শেষতক সংসদের ভেতরে দাবির পাশাপাশি রাজপথেও রীতিমত জোরালো ‘আন্দোলনের সূনামি’ তুলে দাবি আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। ইতিমধ্যে সে ছক তৈরির কাজও প্রায় শেষ বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ জারির সুযোগ নেই। কারণ ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা রহিত করা হয়। তবে এক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দল বলছে, জিয়াউর রহমানের সময়ে সামরিক আইনে ১৯৭৬ থেকে পরের দুই বছরে ১০বার রাষ্ট্রপতি ফরমান বা আদেশ জারি করেছেন। যেগুলো পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয় চতুর্থ তপশিলে। ১৯৮২ সালের পরের চার বছরেও ফরমান জারি হয়েছে। সেগুলো সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয় চতুর্থ তপশিলে। কিন্তু সেগুলো আদালত অবৈধ ঘোষণা করার পর, পরবর্তীতে শেখ হাসিনার সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সবগুলো ফরমান বাতিল করেছিল। এসব নজির বিবেচনায় বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করতে পারেন না। কারণ জুলাই সনদের মোটা দাগে তিনটি ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি নয় বিএনপি ও সমমনা জোটের দলগুলো।
তারা জানিয়েছে, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। এছাড়া, জুলাই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলে অঙ্গীকারনামায় যে কথা বলা হয়েছে সেটাতেও আপত্তি জানিয়েছেন তারা। পটভূমিতে ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ‘৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং সংগ্রাম স্থান না পাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, দ্বিমত এবং একমতের বিষয়গুলোও সনদে সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি। শব্দ চয়ণ এবং বাক্য গঠনেও ত্রুটি দেখছেন তারা।
তাছাড়া কোনো রাজনৈতিক ‘সমঝোতার দলিল’ সংবিধানের উপরে স্থান পেতে পারে কিনা- সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির ভাষ্য, জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে জায়গা দেওয়ার সুযোগ নেই। এসব বিষয়ে সংসদে আলাপ আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা। এসব বিবেচনায় গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই সনদসহ গণভোটের এগার অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের গঠিত বিশেষ কমিটি।
তবে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট হয়েছিল কীসের ওপর? এমন প্রশ্নে এখন সরব বিরোধী দলীয় জোট। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির দাবি করে বলেন, গণভোটের প্রথম কথাটাই ছিল, “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন?” অর্থ্যাৎ গণভোট হয়েছে জুলাই আদেশের ওপর। জনগণ শুধু রাষ্ট্র মালিক নয়, সকল ক্ষমতারও মালিক। তাদের অভিপ্রায়ই হল, সংবিধান। তো গণভোটে রাষ্ট্রের ও ক্ষমতার মালিক জানিয়ে দিয়েছে, জুলাই আদেশকে তাঁরা অনুমোদন করেছেন। এটাই জুলাই আদেশের বৈধতা। এরচেয়ে বেশি বৈধ আর কিছুই নয়। তাই জুলাই আদেশ নিয়ে কচলাকচলিটা বন্ধ করা উচিত। আদেশ জারি আপনার পছন্দ ছিল না। তাছাড়াও আদেশের সোর্স অব পাওয়ার নিয়ে আসলেই প্রশ্ন আছে। কিন্তু মালিক পক্ষ যখন (দেশের জনগণ) এটাকে অ্যাপ্রুভ করেছে, তখন কী করবেন? মেনে নেন। এটার মধ্যেই ফায়দা।
তিনি বলেন, আদেশ ও গণভোট না মানার কারণটা বুঝতে পারছি না। গণভোটে আদেশ ও সনদের যতটুকু অনুমোদন হয়েছে, এর পুরোটা বাস্তবায়ন হলেও সরকার বা বিএনপির কিছুই হবে না। ক্ষতি তো অনেক পরের আলাপ। এদিকে গণভোট বাতিল করা হলে নির্বাচিত সংসদ আইনগত হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করে শিশির মনির জানান, বিদ্যমান আইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণভোট বাতিলের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী যদি কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তা বাতিল করা হয়, তাহলে সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তবে বিরোধী দলের এসব যুক্তিকে আমলে নিতে নারাজ সরকারী দল। একইসঙ্গে সংসদে আইনি যুক্তিতর্কের বাইরে গিয়ে ‘জুলাই সনদের নামে বিরোধী দলের অনার্য্য আব্দার রক্ষারও কোনো সুযোগ নাই বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সোমবার জাতীয় সংসদেরেএক প্রশ্নের জবাবে সতর্ক করে বলেছেন, দেশে চলমান তথাকথিত মব কালচার এবং দাবি আদায়ের নামে রাস্তাঘাট অবরোধ করে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা বরদাস্ত করা হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর স্পষ্ট উচ্চারণ করেছি— বাংলাদেশে কোনো রকমের মব কালচার আর থাকবে না। দাবি আদায়ের জন্য মহাসড়ক বা সড়ক অবরোধ করার যে প্রবণতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেখা গিয়েছে, সেটাকে আমরা আর কখনো অ্যালাউ করব না। মব এবং সুসংগঠিত অপরাধের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সবকিছুকে মব বলা ঠিক হবে না। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে হামলা বা ভাঙচুর করা সুসংগঠিত পরিকল্পিত অপরাধ। এর বিরুদ্ধে মামলা হয়, তদন্ত হয় এবং আসামিদের বিচারের আওতায় আনা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যকে প্রচ্ছন্ন হুমকি বলেই মনে করছে বিরোধী দল। দলটির নেতারা বলছেন, আন্দোলন ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা নাই। তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আন্দোলন করবে। বুধবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কোনো বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান কোনো সংবিধানের অধীনে হয় না, এটি হয় জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষায়। তিনি বলেন, সংবিধানের অনেক কিছু ছাড়াই এ পর্যন্ত আমরা এসেছি। যেমন-ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের কোনো প্রভিশন নাই। ৯০ দিনের মধ্যে ইলেকশন করতে হবে, যদি এ রকম সিচুয়েশন হয়, সেটা আমরা মানিনি, মানতে পারিনি। অনেক কিছু আইনের অনেক ব্যত্যয় ঘটিয়েই আমরা এই জায়গায় এসেছি।
একদিন পর আন্দোলন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রার ঘোষণাও দেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নেতা। সে হিসেবে আজ (৪ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আগামী ৭ই এপ্রিল ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ১১ দলের লিয়াঁজো কমিটির বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
উল্লেখ্য, গণভোটের ব্যালটের একেবারে শুরুতে লেখা ছিল, আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন? যারা ভোট দিছেন তাদের প্রায় ৭০% এই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছেন।
যদিও ঐক্যমত কমিশনের আলোচনার প্রথম দিকে বিএনপি দলগতভাবে গণভোটের পক্ষে ছিল না। কিন্তু গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথমবার সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তারা গণভোটে রাজি। তবে তা হবে সংসদ নির্বাচনের পর। তিন দিনের সংলাপের পর ৫ অক্টোর তিনি বলেন, নির্বাচন ও গণভোট একদিনে হতে হবে। তিনি বলেন, নিয়ে আদেশ জারির প্রয়োজন নেই। কারণ সংবিধানে আদেশ নেই। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৪২(ক) অনুচ্ছেদ ফিরেছে, মানে গণভোটের বিধান ফিরেছে। তাই একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভোট করা যায়। গণভোটের ফল বাস্তবায়ন বাস্তবায়ন সংসদের জন্য বাধ্যধতামূলক হবে।
কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি সন্দেহ তৈরি করছে উল্লৈখ করে বিরোধী দল অভিযোগ করে জানান, তাহলে কী বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন নিজেদের মতো করে করতে চায়? যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য এত লড়াই সংগ্রাম হয়েছে! এটা হলে তো সবচেয়ে দুঃখজনক। অথচ বিএনপির ৩১ দফায় দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। যদিও বিএনপির ৩১ দফার অষ্টম দফায় বলা হয়েছে, “সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া সকল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠান আইনি সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হবে। শুনানির মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির ভেটিং সাপেক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









