একদিন যদি কোনো মানুষ ভুল করে এমন একটি জাদুঘরে ঢুকে পড়ে, যেখানে ছবিগুলো তাকে দেখে, গন্ধ তার হৃদস্পন্দন অনুসরণ করে, আর বনভূমি তার শরীরের উত্তেজনা অনুযায়ী রং বদলায়—তাহলে সে কি এখনও জাদুঘরে আছে, নাকি কোনো যন্ত্রের স্বপ্নের মধ্যে প্রবেশ করেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউতে, যেখানে আকাশছোঁয়া ভবনগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ডেটাল্যান্ড—শিল্পী রেফিক আনাদোলের কল্পনার এক অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান। এটি বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্প জাদুঘর হিসেবে পরিচিত।

জাদুঘরটির অবস্থানও যেন কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। এটি ফ্র্যাঙ্ক গেহরির নকশা করা গ্র্যান্ড এলএ প্রকল্পের অংশ, আর ঠিক তার বিপরীতে গেহরির বিখ্যাত ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হল। যেন এক স্থপতির পুরোনো স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে অন্য এক শিল্পীর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
আনাদোলের সঙ্গে সিনেমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাই ডেটাল্যান্ডের মধ্যে কখনও কখনও জুরাসিক পার্ক-এর জন হ্যামন্ডকে মনে পড়ে—সেই বিজ্ঞানী, যিনি বিলুপ্ত পৃথিবীকে প্রযুক্তির সাহায্যে আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। পার্থক্য শুধু এই যে হ্যামন্ড মৃত ডাইনোসর ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, আর আনাদোল চেষ্টা করছেন পৃথিবীর দৃশ্য, স্মৃতি ও অনুভূতিকে ডেটার মাধ্যমে নতুন করে জন্ম দিতে।
তার ভাষায়, ডেটাল্যান্ড একটি “কল্পনার গবেষণাগার”। দেয়াল আছে, কিন্তু কল্পনার সীমা নেই।
এখানে ব্যবহৃত হয়েছে অর্ধশত কোটিরও বেশি পিক্সেল। স্মিথসোনিয়ান, গেটি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগৃহীত তথ্য থেকে তৈরি হয়েছে প্রকৃতি, মানুষের শরীর এবং জীবনের অসংখ্য রূপ। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—দর্শক নিজেও এই তথ্যের অংশ হয়ে ওঠেন।
হাতে পরা ব্যান্ড মেপে নেয় হৃদস্পন্দন ও শরীরের প্রতিক্রিয়া। সেই তথ্য প্রবেশ করে শিল্পকর্মের ভেতরে। গলায় থাকা বিশেষ যন্ত্র থেকে ভেসে আসে বিভিন্ন সুগন্ধ। সেই সুগন্ধও বদলায় দর্শকের শরীরের তথ্য অনুযায়ী।
অর্থাৎ এখানে দর্শক কেবল শিল্প দেখে না। শিল্পও দর্শককে দেখে। এটি খুব ছোট একটি বাক্য, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে জাদুঘরের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের বিরুদ্ধে এক বিপ্লব।
হাজার হাজার বছর ধরে আমরা শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়েছি। মূর্তি দেখেছি, ছবি দেখেছি, পাথর ছুঁয়েছি। শিল্প নীরব থেকেছে, আর মানুষ তার অর্থ খুঁজেছে। এখন আনাদোল প্রশ্ন করছেন—যদি শিল্পও আমাদের প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করে? যদি একটি ছবি জানে যে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে?
তখন শিল্পকর্ম আর নিস্তব্ধ বস্তু থাকে না। সে হয়ে ওঠে এক ধরনের সঙ্গী।

ডেটাল্যান্ডের মেশিন ড্রিমস; রেইনফরেস্ট কাজটি এই ধারণাকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। আমাজন সফরের সময় আনাদোল ইয়াওয়ানাওয়া জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেখানে একটি হামিংবার্ডকে ঘিরে তার যে স্বপ্ন, তাই পরবর্তী সময়ে এই শিল্পকর্মের ভিত্তি হয়।
হামিংবার্ডটি তার কাছে প্রকৃতির দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রতীক। কিন্তু আরও গভীরে গেলে পাখিটি যেন হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন; প্রকৃতির কি নিজস্ব স্মৃতি আছে? আনাদোলের লার্জ নেচার মডেল সেই স্মৃতিকে ডেটার মাধ্যমে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু এখানে একটি বিপজ্জনক দার্শনিক প্রশ্নও আছে। আমরা যখন প্রকৃতিকে ডেটায় পরিণত করি, তখন কি আমরা তাকে বুঝতে পারি, নাকি কেবল তার আরেকটি অনুবাদ তৈরি করি?
একটি অরণ্য কি তার গাছের সংখ্যা? একটি পাখি কি তার গতির তথ্য? একটি নদী কি তার প্রবাহের পরিসংখ্যান? সম্ভবত নয়। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে জ্ঞান অর্জনের প্রতিটি নতুন পদ্ধতি প্রথমে এমন অসম্ভব প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়েছে।
ডেটাল্যান্ডের ইনফিনিটি রুমে এই প্রশ্ন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। আয়নায় ঘেরা বিশাল স্থান, আলো, শব্দ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ছবি এবং পরিবর্তনশীল সুগন্ধ মিলিয়ে দর্শক যেন নিজের শরীরের সীমা হারিয়ে ফেলেন।
এক মুহূর্তে মনে হতে পারে, আপনি কোনো বনভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন। পরের মুহূর্তে সেই বন ভেঙে যায় আলোতে। তারপর আলো পরিণত হয় ডেটায়। আর ডেটা আবার ফিরে আসে এক অচেনা স্বপ্নের দৃশ্য হয়ে।

এখানে ইয়াইয়ি কুসামা, ড্যান ফ্লাভিন কিংবা জেমস টারেলের মতো শিল্পীদের প্রভাবও অনুভূত হয়। আলো আর স্থানকে তারা যে প্রশ্ন করেছিলেন, আনাদোল সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে।
তবে ডেটাল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়টি প্রযুক্তি নয়। তা হলো বিস্ময়। এফসুন এরকিলিচের কথায়, প্রকৃতিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে কোনো জাদুর প্রয়োজন নেই। একটি বন নিজেই বিস্ময়কর। মানুষের কাজ শুধু সেই বিস্ময়টি আবার দেখতে শেখানো।
সম্ভবত এই কারণেই ডেটাল্যান্ড দর্শকদের ফোন নামিয়ে রাখতে বলে। ছবি তুলে বাইরে পাঠানোর বদলে তারা যেন কিছুক্ষণ ছবির ভেতর থাকে। কেননা এই জাদুঘরের আসল প্রদর্শনী হয়তো দেয়ালে নেই।
আসল প্রদর্শনী হলো সেই মুহূর্ত, যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে—সে যে শিল্পকর্মটি দেখছে, সেটি আসলে তার নিজের উপস্থিতিকেও ধারণ করছে। হাজার বছর ধরে মানুষ শিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছে, “এটি আমাকে কী অনুভব করায়?”
ডেটাল্যান্ড সেই প্রশ্নটি উল্টে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—“আমি যখন অনুভব করি, তখন শিল্পটি কেমন হয়ে ওঠে?”
সম্ভবত ভবিষ্যতের জাদুঘরের দরজা সেখানেই খুলছে—যেখানে দর্শক আর দর্শক থাকে না, শিল্প আর নিস্তব্ধ বস্তু থাকে না, আর মানুষ ও যন্ত্রের মাঝখানে যে পুরোনো দেয়ালটি ছিল, সেটি ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে আসে।
*ডাটাল্যান্ড শিল্পী রেফিক আনাদোলের পরিকল্পনায় তৈরি একটি নতুন ধরনের শিল্প ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিপুল পরিমাণ তথ্য, প্রকৃতি, শব্দ, আলো ও মানুষের শারীরিক প্রতিক্রিয়াকে একসঙ্গে শিল্পের অভিজ্ঞতায় পরিণত করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউনের গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি ফ্র্যাঙ্ক গেহরির নকশা করা গ্র্যান্ড এলএ কমপ্লেক্সের অংশ।ডাটাল্যান্ডকে বিশ্বের প্রথম এআই-কেন্দ্রিক শিল্প জাদুঘর হিসেবে পরিচিত।
বিস্তারিত আরো জানতে: https://dataland.art/


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









