মানুষের জন্মের সময় তার হাতে কিছুই থাকে না। সে হাঁটতে জানে না, কথা বলতে জানে না, নিজের ক্ষুধার অর্থও বোঝে না। তাকে কোলে নিতে হয়, খাওয়াতে হয়, পাহারা দিতে হয়। পৃথিবীর অন্য অনেক প্রাণী জন্মের পরপরই নিজের শরীরের ওপর ভরসা করতে পারে। মানুষ পারে না।
তবু এই অসহায় প্রাণীটিই পৃথিবী বদলে দিয়েছে।
সে নদীর ওপর সেতু বানিয়েছে, মরুভূমিতে শহর গড়েছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে সেখানে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছে। সে মৃত মানুষের কথা মনে রেখেছে এবং অনাগত মানুষের জন্য বই লিখেছে। সে এমন জিনিস তৈরি করেছে, যার কোনো অস্তিত্ব প্রকৃতিতে ছিল না—রাষ্ট্র, আইন, টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্ম, অধিকার, সীমান্ত।
মানুষের শক্তি তার শরীরে নয়। তার শক্তি হলো সে একসঙ্গে অনেক মানুষের মনে একটি গল্প বুনতে পারে।
এই গল্প কখনো মুক্তির, কখনো ঈশ্বরের, কখনো জাতির, কখনো সম্পদের। কখনো সেই গল্প মানুষকে একত্র করেছে। কখনো সেই গল্পের নাম করে মানুষ মানুষকে মেরেছে।
মানুষের ইতিহাস তাই শুধু অগ্রগতির ইতিহাস নয়। এটি স্মৃতি ও বিস্মৃতির ইতিহাস। নির্মাণ ও ধ্বংসের ইতিহাস। ভালোবাসার পাশাপাশি ভয়, সহমর্মিতার পাশাপাশি নিষ্ঠুরতার ইতিহাস।
স্টিভেন পিংকার মানুষের এই দ্বৈত স্বভাবের দিকে তাকান বিজ্ঞানের চোখে, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত দর্শনের প্রশ্ন। মানুষ কীভাবে চিন্তা করে? কেন সে ভাষা তৈরি করে? কেন সে অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে, আবার সেই মানুষটিকেই শত্রু বলে হত্যা করতে পারে? এবং এতসব অন্ধকারের মধ্যেও কি মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ আছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই ফিরে আসতে হয় ভাষার কাছে।
ভাষা মানুষের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়গুলোর একটি। আমরা ভাষার সাহায্যে শুধু কথা বলি না; আমরা পৃথিবীকে নাম দিই। নাম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কিছুকে স্মৃতিতে রাখা যায়, অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাকে নিয়ে চিন্তা করা যায়।

একটি শিশু যখন ‘গতকাল’ শব্দটি শেখে, তখন সে শুধু একটি শব্দ শেখে না। সে সময়কে ধরে ফেলার একটি উপায় শেখে। যখন সে বলে, ‘আগামীকাল যদি বৃষ্টি হয়, আমি বাইরে যাব না’, তখন সে ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত—তিনটি অদৃশ্য জিনিসকে একসঙ্গে যুক্ত করে।
মানুষের ভাষা এমন একটি ঘর, যার দেয়াল নেই।
এই ঘরের ভেতর আমরা মৃতদের সঙ্গে কথা বলি। যারা এখনো জন্ম নেয়নি, তাদের জন্য পরিকল্পনা করি। দূরদেশের মানুষের দুঃখ অনুভব করি। এমনকি যে মানুষটির সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, তার জীবন নিয়েও কাঁদি।
অন্য প্রাণীরাও সংকেত দেয়। বিপদ এলে সতর্ক করে, খাদ্যের সন্ধান জানায়, সঙ্গীকে ডাকে। কিন্তু মানুষের ভাষা আলাদা, কারণ মানুষ এমন জিনিস নিয়ে কথা বলতে পারে যার কোনো দৃশ্যমান শরীর নেই।
একটি দেশ। একটি আইন। একটি ন্যায়বিচার। একটি ভবিষ্যৎ। এই অদৃশ্য ধারণাগুলোই মানুষের সম্মিলিত জীবনের ভিত্তি।
একজন কৃষক যখন মাটিতে বীজ বোনার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, তার জ্ঞান শুধু তার নিজের থাকে না। ভাষা সেই জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়। একটি মানুষের অভিজ্ঞতা তখন বহু মানুষের সম্পদ হয়ে ওঠে। সভ্যতা এভাবেই তৈরি হয়—একটি মস্তিষ্কের ভেতরের আলো আরেকটি মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পৌঁছাতে।
মানুষের কোনো আবিষ্কারই সম্পূর্ণ একা আবিষ্কৃত হয়নি। প্রতিটি নতুন জ্ঞান পুরোনো জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি বই আরেকটি বইকে ডাকে। একটি প্রশ্ন আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। মৃত মানুষের চিন্তা জীবিত মানুষের হাতে এসে নতুন জীবন পায়। এই অর্থে ভাষা শুধু যোগাযোগ নয়। ভাষা হলো মানুষের সম্মিলিত স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতি যেমন আমাদের বাঁচায়, তেমনি স্মৃতির ভেতরও অন্ধকার থাকে।
মানুষ মনে রাখতে পারে কে তাকে আঘাত করেছে। সে প্রতিশোধের গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করতে পারে। একটি অপমান একটি পরিবারের ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে। একটি হত্যার স্মৃতি বহু বছর ধরে নতুন হত্যার কারণ হতে পারে মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে সহিংসতা তাই কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। বরং বহু সমাজে সেটিই ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। প্রাচীন পৃথিবীতে একজন মানুষের নিরাপত্তা নির্ভর করত তার পরিবার, গোত্র বা শাসকের শক্তির ওপর। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ছিল ন্যায়বিচারের একটি স্বীকৃত রূপ। যুদ্ধ ছিল রাজাদের গৌরবের ভাষা। দাসত্ব ছিল অর্থনীতির ভিত্তি। নির্যাতন ছিল শাস্তির পদ্ধতি।
মানুষ তখনও মানুষকে ভালোবাসত। কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রায়ই সীমাবদ্ধ ছিল নিজের মানুষদের মধ্যে। অপরিচিত মানুষ ছিল সন্দেহের। ভিন্ন ভাষার মানুষ ছিল বিপদের। ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল শত্রুর সম্ভাব্য নাম। এই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই মানবসভ্যতা বহু শতাব্দী কাটিয়েছে। পিংকারের ‘দ্য বেটার অ্যাঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার’ বইটি এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্থাপন করে—যদি মানুষ এত সহিংস হয়, তবে কি সময়ের সঙ্গে সহিংসতা সত্যিই কমেছে? তার উত্তর চট করে দেয়া যায় না, কিন্তু তা গুরুত্বপূর্ণ। পিংকার দেখান, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনে সহিংসতার অনেক রূপ কমেছে। যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড, দাসত্ব, নির্যাতন এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বহু জায়গায় আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।
এটি কোনো অলৌকিক পরিবর্তন নয়।
মানুষ ধীরে ধীরে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে, যা তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জায়গায় এসেছে আদালত। গোত্রীয় শত্রুতার জায়গায় এসেছে রাষ্ট্রীয় আইন। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যুদ্ধের বদলে বাণিজ্য অনেক সময় হয়ে উঠেছে বেশি লাভজনক। একজন অপরিচিত মানুষকে হত্যা করলে সে আর কোনো কাজে আসে না। কিন্তু তার সঙ্গে বাণিজ্য করলে উভয়ের লাভ হতে পারে। এই সাধারণ অর্থনৈতিক সত্যটি মানুষের নৈতিক ইতিহাসেও পরিবর্তন এনেছে। মানুষ বুঝতে শুরু করল, অন্য মানুষ কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সে সহযোগীও হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নৈতিক বৃত্তও বড় হয়েছে। একসময় নৈতিকতার অর্থ ছিল নিজের পরিবারকে রক্ষা করা। পরে তা সম্প্রসারিত হয়েছে গোত্র, ধর্মীয় সম্প্রদায়, জাতি এবং রাষ্ট্রের দিকে। আজ আমরা অন্তত ধারণাগতভাবে স্বীকার করি যে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের জীবনও মূল্যবান। এই স্বীকৃতি সবসময় বাস্তবে ক্রিয়াশীল থাকে না। আমরা এখনো যুদ্ধ করি, সীমান্তে মানুষ মরে, জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ায়, রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করা হয়। কিন্তু একটি ধারণার অস্তিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যে পৃথিবী তৈরি করে, তার আগে সে সেই পৃথিবীকে কল্পনা করে। সহমর্মিতা এমন একটি কল্পনার নাম—যেখানে আমি বুঝতে চেষ্টা করি, অন্য মানুষের শরীরেও ব্যথা লাগে।
সাহিত্য এই কাজটি বহুদিন ধরে করে আসছে। একটি উপন্যাস আমাদের এমন মানুষের জীবন দেখায়, যার সঙ্গে আমাদের কোনো মিল নেই। একটি কবিতা আমাদের এমন শোকের কাছে নিয়ে যায়, যা আমরা নিজের জীবনে কখনো দেখিনি। একটি সংবাদ প্রতিবেদন দূরদেশের একটি নামকে আমাদের কাছে একটি মুখে পরিণত করে। ভাষা তখন শুধু তথ্য বহন করে না। ভাষা দূরত্ব কমায়।

তবে মানুষকে কেবল সহানুভূতিশীল প্রাণী ভাবলে ভুল হবে। মানুষের মধ্যে রাগ আছে, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা আছে, নিজের গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ মনে করার প্রবণতা আছে। সভ্যতা এসব প্রবৃত্তিকে মুছে দেয়নি। বরং সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এখানেই সভ্যতার প্রকৃত দুর্বলতা। আমরা প্রায়ই ভাবি, একবার কোনো সমাজ সভ্য হয়ে গেলে সে আর পিছিয়ে যাবে না। ইতিহাস এমন নিশ্চয়তা দেয় না। আইন দুর্বল হতে পারে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়তে পারে। ঘৃণার ভাষা আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। মানুষ আবার বিশ্বাস করতে পারে যে প্রতিবেশী মানুষটি তার শত্রু।
সভ্যতা কোনো অর্জিত সম্পত্তি নয়। এটি প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়। এই রক্ষার অন্যতম উপায় যুক্তি। জ্ঞানকাঠামোর চর্চা
মানুষের মস্তিষ্ক শুধু গল্প তৈরি করতে পারে না; গল্পকে প্রশ্নও করতে পারে। সে নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে—যদিও তা সবসময় সহজ নয়।
বিজ্ঞান এই ক্ষমতাকে একটি সামাজিক পদ্ধতিতে পরিণত করেছে। বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট আবিষ্কার নয়। বরং এটি শেখায়, আমরা ভুল হতে পারি। একটি পুরোনো ধারণা সত্য বলে মনে হলেই তা সত্য হয়ে যায় না। বহু মানুষ বিশ্বাস করলেই কোনো ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায় না। বাস্তবতা আমাদের বিশ্বাসের কাছে ঋণী নয়।
এই বিনয়ই জ্ঞানের শুরু। মানুষ যখন নিজের ভুল সংশোধন করতে শেখে, তখন তার পৃথিবী বদলাতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান রোগের প্রকৃতি বুঝতে শেখে। প্রযুক্তি মানুষের শ্রম কমায়। শিক্ষা অজ্ঞতাকে সীমা সংকোচিত করে। আইন ক্ষমতাবানদের ওপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু জ্ঞান একা যথেষ্ট নয়। একজন মানুষ অনেক কিছু জানতে পারে, তবু নিষ্ঠুর হতে পারে। একটি সমাজ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হতে পারে, তবু অন্যায় করতে পারে। একটি রাষ্ট্র মহাকাশে পৌঁছাতে পারে, তবু নিজের নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন কেবল আমরা কতটা জ্ঞান অর্জন করব, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই জ্ঞান আমরা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করব। আজ মানুষের হাতে এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা আগের কোনো প্রজন্মের হাতে ছিল না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভাষা বুঝতে শিখছে। জিনসম্পাদনা জীবনের গঠন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। পারমাণবিক অস্ত্র মুহূর্তে একটি শহর ধ্বংস করতে পারে। আমাদের ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে কি আমাদের প্রজ্ঞাও বেড়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ আছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এবং অসমতা—সবই আমাদের সামনে বাস্তব বিপদ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভয় যেন আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা ভুলিয়ে না দেয়। মানুষ আগে কখনো এত দীর্ঘ জীবন পায়নি। আগে কখনো এত মানুষ শিক্ষার সুযোগ পায়নি। আগে কখনো পৃথিবীর এত মানুষ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। অগ্রগতি নিখুঁত নয়, সমানও নয়; কিন্তু তা বাস্তব।
এই অগ্রগতি নিজে থেকে আসেনি। মানুষ ভুল করেছে, সংশোধন করেছে, আবার ভুল করেছে। প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে, সেগুলো ভেঙেছে, আবার নতুন প্রতিষ্ঠান গড়েছে। অতএব, আশাবাদ কোনো অন্ধ বিশ্বাস নয়। আশাবাদ হতে পারে একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের সন্তানদের শুধু প্রতিযোগিতা শেখালে চলবে না। তাদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। কীভাবে নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়। কীভাবে এমন একজন মানুষের কষ্ট বুঝতে হয়, যার ভাষা আমরা বুঝি না।
আমাদের শেখাতে হবে, অপরিচিত মানুষ শত্রু নয়। কারণ সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা প্রযুক্তির উৎকর্ষে নয়; অপরিচিত মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে। মানুষের ভবিষ্যৎ কোনো পূর্বনির্ধারিত গল্প নয়। আমরা এমন কোনো বই হাতে নিয়ে জন্মাই না, যার শেষ অধ্যায় আগে থেকেই লেখা। আমাদের সামনে সম্ভাবনা আছে, বিপদ আছে, ভুলের সম্ভাবনা আছে।আমরা যে গল্পগুলো বিশ্বাস করি, সেগুলোই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। যদি আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবী কেবল শক্তিশালীদের জন্য, তবে আমরা দুর্বলদের জন্য কোনো স্থান রাখব না। যদি বিশ্বাস করি অন্য মানুষ আমাদের শত্রু, তবে যুদ্ধ আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি আমরা এমন একটি গল্প তৈরি করতে পারি যেখানে প্রতিটি মানুষের জীবন মূল্যবান, তবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোও বদলাতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কোনো যন্ত্র নয়। কোনো সাম্রাজ্য নয়। কোনো শহরও নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো—অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সহযোগিতা করার ক্ষমতা। ভাষা আমাদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে। স্মৃতি আমাদের অতীতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুক্তি আমাদের ভুল সংশোধনের সুযোগ দিয়েছে। সহমর্মিতা আমাদের নিজের সীমানার বাইরে তাকাতে শিখিয়েছে।
তবু পথ শেষ হয়নি।
আমাদের ভেতরে এখনো সেই পুরোনো অন্ধকার আছে—ভয়, প্রতিশোধ, ঘৃণা, ক্ষমতার লোভ। সভ্যতার কাজ সেই অন্ধকারকে অস্বীকার করা নয়; তাকে চিনে রাখা। কারণ যে মানুষ নিজের অন্ধকারের কথা ভুলে যায়, সে সহজেই আবার তার হাতে বন্দী হয়ে পড়ে।
স্টিভেন পিংকারের চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তাই শুধু এই নয় যে পৃথিবী অতীতের তুলনায় ভালো হয়েছে। বরং এই যে ভালো হওয়া কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়। আমাদের কাজ হলো সেই শক্তিগুলোকে বেছে নেওয়া, যেগুলো মানুষকে মানুষ করে তোলে। ভাষা, যুক্তি, সহমর্মিতা, স্বাধীনতা এবং সহযোগিতা—এই পাঁচটি শব্দ হয়তো ভবিষ্যতের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ নকশা নয়। কিন্তু এগুলো ছাড়া মানুষের কোনো দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ কল্পনা করাও কঠিন।
আমরা এখনো গল্প লিখছি। প্রশ্ন শুধু এতটুকু—এই গল্পে আমরা কাদের মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? এবং কাদের ভুলে যেতে চাই? এর উত্তরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

পরিচিতি
স্টিভেন পিংকার (জন্ম ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪) কানাডীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী, জ্ঞানবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী ও লেখক। মানুষের ভাষা, চিন্তা, আচরণ এবং সভ্যতার বিকাশ নিয়ে তার দীর্ঘ গবেষণা তাঁকে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত জনবুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছে।
কানাডার মন্ট্রিয়েলে জন্ম নেওয়া পিংকার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। তার গবেষণার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানুষের ভাষা কীভাবে কাজ করে এবং ভাষা শেখার ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্কে কীভাবে বিকশিত হয়েছে। ‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিংক্ট’ বইয়ে তিনি ভাষাকে মানুষের স্বাভাবিক ও বিবর্তনগতভাবে গড়ে ওঠা মানসিক ক্ষমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তবে তার চিন্তার পরিধি ভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘দ্য বেটার এঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার’ বইয়ে তিনি ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে মানুষের সহিংসতা কমে আসার প্রবণতা বিশ্লেষণ করেন। ‘এনলাইটেনমেন্ট নাও’ বইয়ে তিনি যুক্তি, বিজ্ঞান, মানবতাবাদ ও আলোকায়নের মূল্যবোধকে আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
পিংকারের লেখার বৈশিষ্ট্য হলো জটিল বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রশ্নকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ করে তোলা। তার চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিশ্বাস—মানুষের ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত নয়; যুক্তি, সহমর্মিতা, বিজ্ঞান ও মানবিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই মানুষ তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









