মহাকাশ গবেষণার দীর্ঘ যাত্রায় আবারো এক অধ্যায় যুক্ত করল 'কিউরিসিটি রোভার'। মঙ্গল গ্রহে প্রথমবারের মতো পরিচালিত এক বিশেষ রাসায়নিক পরীক্ষায় এই রোভার এমন কিছু জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছে, যা পৃথিবীতে জীবনের সূচনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- মঙ্গল কি একসময় সত্যিই জীবনের জন্য উপযোগী ছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এই অভিযানে মোট ২১ ধরনের কার্বন-সমৃদ্ধ জৈব অণু শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে সাতটি আগে কখনো মঙ্গলে দেখা যায়নি। এসব অণুর মধ্যে রয়েছে নাইট্রোজেন হেটারোসাইকেল- যা ডিএনএ ও আরএনএ'র মতো জিনগত উপাদানের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশন্সে, যা এই আবিষ্কারকে বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক মহলে গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক অভিনব পদ্ধতি- মঙ্গলে প্রথমবারের মতো ‘ওয়েট কেমিস্ট্রি’ বা ভেজা রাসায়নিক পরীক্ষা। কিউরিসিটি রোভার একটি পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে তা রাসায়নিক দ্রবণে গলিয়ে তার ভেতরের জৈব উপাদান উন্মোচন করে।
নমুনাটি নেয়া হয়েছিল গেল কার্টারের মাউন্ট শার্প অঞ্চলের ‘মেরি অ্যানিং’নামে পরিচিত একটি স্থান থেকে। বিজ্ঞানীদের মতে, এখানে পাওয়া জৈব অণুগুলো প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল।
মিশনের বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মঙ্গল একসময় শুধু বাসযোগ্যই ছিল না, বরং বিস্ময়করভাবে জীবনের জন্য অনুকূল পরিবেশ ছিল। সেখানে ছিল পানি, হ্রদ, এমনকি প্রবাহমান জলধারার প্রমাণও মিলেছে।
গবেষণার সহ-লেখক এসউইন ভাসাভাদা বলেন, “আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হচ্ছে- মঙ্গল কতটা অবিশ্বাস্যভাবে বাসযোগ্য ছিল।”
এখানেই মূল রহস্য। এই জৈব অণুগুলো জীবনের চিহ্ন কিনা- তা এখনো নিশ্চিত নয়। এগুলো হয়তো প্রাকৃতিক ভূ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে, কিংবা উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে মঙ্গলে পৌঁছেছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মঙ্গলের মাটিতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ছিল।
সামনে কী?
বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পেতে হলে মঙ্গল থেকে সংগৃহীত নমুনা পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। বর্তমানে পারসেভারেন্স রোভার সেই লক্ষ্যেই নমুনা সংগ্রহ করছে।
এছাড়া, ভবিষ্যতের মিশন যেমন রোসালিন্ড ফ্র্যাংকলিন রোভার এবং ড্রাগনফ্লাই মিশনেও একই ধরনের পরীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।
মঙ্গলের মাটিতে লুকিয়ে থাকা এই জৈব অণুগুলো যেন এক গভীর রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছে। উত্তর এখনো মেলেনি, কিন্তু প্রশ্নগুলো আরো জোরালো হয়েছে- আমরা কি একা? নাকি মহাবিশ্বের কোথাও, কোনো এক সময়ে, জীবন তার চিহ্ন রেখে গেছে?
মানবজাতির সেই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে কিউরিওসিটির এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে এক বড় মাইলফলক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









