জঙ্গল সলিমপুর। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকা, যার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। যেখানে মাইকে সন্ত্রাসী জড়ো করে র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, দুর্গম পাহাড়ের সেই ভূখণ্ডটি কি বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন? সেখানে নেই কেন সরকারের নিয়ন্ত্রণ? কেন গড়ে উঠেছে আলাদা সশস্ত্র বাহিনী? ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি কার নিয়ন্ত্রণে? গত ১৯ জানুয়ারি র্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এরকম নানা প্রশ্ন দেশবাসীর সামনে এসেছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ‘ছিন্নমূল জনপদ’ নামে পরিচিত এই এলাকা দীর্ঘদিন সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে কুখ্যাত।
ওইদিন বিকালে সেখানেই র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক, বিজিবির নায়েব সুবেদার মোতালেবকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার সঙ্গে থাকা র্যাবের আরো দুই সদস্য এবং একজন সোর্সকেও গণপিটুনি দেয়া হয়। সেই ঘটনার পর থেকে এখনো র্যাবের তিনজন সদস্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হতাহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু প্রধান আসামিরা এখনো সরকারি বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের ধরতে ‘কম্বাইন্ড অপারেশন’ চালানো হবে বলেও এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে সতর্ক করার জন্য হলেও একটা যৌথ অভিযান চালানো জরুরি।
জঙ্গল সলিমপুর কোথায়
সলিমপুর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্গত একটি ইউনিয়ন। যার আয়তন ৪৪৫৩ একর (১৮.০২ বর্গ কিলোমিটার)। এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার সবচেয়ে ছোট ইউনিয়ন। উপজেলার সর্ব-দক্ষিণে সলিমপুর ইউনিয়নের অবস্থান। উপজেলা সদর থেকে এ ইউনিয়নের দূরত্ব ২৯ কিলোমিটার। এ ইউনিয়নের উত্তরে ভাটিয়ারী ইউনিয়ন, পূর্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড ও ২নং জালালাবাদ ওয়ার্ড, দক্ষিণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৯নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড ও ১০নং উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর।
প্রশাসনিক কাঠামো কাগজে-কলমে সলিমপুর ইউনিয়ন সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতাধীন ১০নং ইউনিয়ন পরিষদ। এ ইউনিয়নের উত্তরাংশের প্রশাসনিক কার্যক্রম সীতাকুণ্ড মডেল থানার আওতাধীন এবং দক্ষিণভাগের কিছু অংশ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আকবর শাহ থানার আওতাধীন। এটি জাতীয় সংসদের ২৮১নং নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রাম-৪ এর অংশ। এটি উত্তর সলিমপুর, দক্ষিণ সলিমপুর, লতিফপুর, জঙ্গল সলিমপুর ও জঙ্গল লতিফপুর এ ৫টি মৌজায় বিভক্ত। জনসংখ্যা ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫২,০৫০ জন হলেও, বর্তমানে ছিন্নমূলরা সেখানে ‘নিরাপদ আবাসন’ গড়ে তোলায় অধিবাসীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে লাখের ওপর।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় গত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এই দখলদারিত্ব ও প্লট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সেখানে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র বাহিনী। জঙ্গল সলিমপুরে বসবাসকারীদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একাধিকবার সেখানে অভিযান পরিচালনার সময় সশস্ত্র হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে ৫টি মৌজায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি রয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে এই স্থানটি সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার লিংক রোড দিয়ে। কম টাকায় ‘জমি কিনে’বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই সেখানে রয়েছে। যাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্তের মানুষ। ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এলাকাটির ভেতরে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, কেজি স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কবরস্থান, শ্মশান, কেয়াং, মন্দির, গির্জা ও বাজারসহ সবই গড়ে তোলা হয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী ওই এলাকায় প্রায় ১৯ হাজার মানুষ বসবাস করে। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছে, সেখানে ১০টি সমাজের প্রায় ৩০ হাজারের বেশি পরিবার রয়েছে। সেসব পরিবারের লক্ষাধিক সদস্য সেখানে বসবাস করছে।
সাংবাদিক প্রবেশ নিষিদ্ধ
জঙ্গল সলিমপুরের দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্যে সাংবাদিকদের প্রবেশও নিষিদ্ধ বললেই চলে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের এক সকালে জঙ্গল সলিমপুরের ১ নম্বর সলিমপুর ওয়ার্ডের বিবিরহাট এলাকায় পাহাড় ধসে তিন শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হলে বহুদিন পর ওই এলাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের পা পড়ে। এর আগের এক দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলাকালে এবং ছিন্নমূলের আমন্ত্রণ ছাড়া সংবাদকর্মীরা ওই এলাকায় ঢুকতে পারেননি। পাহাড় ধসে তিন শিশু মৃত্যুর সময় এলাকায় যাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক এ প্রতিনিধিকে জানান, জঙ্গল সলিমপুরের দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্যে সাংবাদিক প্রবেশে ঝুঁকি আছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় ঝুঁকি আরো বেশি।
১৯ জানুয়ারি কী ঘটেছিল?
সেদিন ছিল সোমবার। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী’ গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হয়। এসময় র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ দুষ্কৃতকারী র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় র্যাবের চারজন সদস্য ‘রক্তাক্ত আহত’হয় তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সিএমএইচে নেয়া হয়। এর মধ্যে নায়েক সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। বাকি তিনজন চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন। হামলায় কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে র্যাব সদস্যরা কাজ করছেন বলে জানানো হয়।
জানা গেছে, এ অপরাধ সাম্রাজ্যের পেছনে রয়েছে দুটি শক্তিশালী সংগঠন। এর একটি হলো ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন মিয়া। অপরটি ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’, যেটি কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, এই দুই সংগঠনের সদস্য প্রায় ৩০ হাজার। দখল করা পাহাড়ি জমিতে বসতি স্থাপন, প্লট বাণিজ্য এবং অবৈধ স্থাপনা রক্ষায় সংগঠিতভাবে তারা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই দুই পক্ষ এতটাই শক্তিশালী যে সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বারবার ব্যবস্থা নেয়া হলেও প্রতিরোধ ও সহিংসতার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।
ওইদিনের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী র্যাবের অন্তত পাঁচ সদস্য, অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া দুই কর্মকর্তা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বর্ণনা পাওয়া গেছে। র্যাব–৭–এর দুই কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবস্থান আরো শক্ত হয়।
ঘটনার দিন সকালে র্যাবের একটি সোর্স খবর দেয়, জঙ্গল সলিমপুরে একটি দলের কার্যালয় উদ্বোধন হবে, যেখানে চট্টগ্রামের আলোচিত তিন সন্ত্রাসী উপস্থিত থাকবেন। তাদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ইয়াসিনও রয়েছেন বলে তথ্য আসে। দুপুর থেকেই র্যাব প্রস্তুতি শুরু করে। দুটি মাইক্রোবাস ও একাধিক সিএনজি অটোরিকশায় ১৬ সদস্যের দল বেলা ৩টায় অভিযানে নামে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে র্যাবের চার সদস্য—যার মধ্যে ছিলেন নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেব—ওই দলের কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন ভেতরে অন্তত ১৫০ নেতাকর্মী অবস্থান করছিলেন। র্যাব সদস্যরা ইয়াছিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরিয়ে ফেলতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। র্যাবের চার সদস্যকে ঘিরে ধরে প্রথমে ধাক্কাধাক্কি, তারপর শুরু হয় বেধড়ক পিটুনি। কার্যালয়ের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রায় ৩০০ হামলাকারী র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল ছোড়ে। এসময় গ্রেপ্তার দুজন পালিয়ে যায়। র্যাবের পাঁচ সদস্য জানান, ভেতরে আটক সঙ্গীদের বাঁচাতে বাইরে থাকা র্যাব সদস্যরা এগোতে চাইলে হামলাকারীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আরো লোক জড়ো করে। ভাঙচুর করা হয় র্যাবের মাইক্রোবাস। হামলার তীব্রতা দেখে র্যাব সদস্যরা নিরুপায় হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।
র্যাব–৭–এর এক সিনিয়র কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপির কার্যালয়ের ভেতরে থাকা র্যাব সদস্যদের শুধু মারধরই নয়, বরং অপহরণের মতো করে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আবারও তাদের ওপর হামলা হয়। সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছেন নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেব। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।’
কে এই ইয়াসিন
নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি শুরু করেন সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে। এরপর থেকেই নগরী কিংবা আশপাশের জেলার বিভিন্ন সন্ত্রাসীর কাছে ‘নিরাপদ আবাসন’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে এই দুর্গম অঞ্চলটি। র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস মারা যাওয়ার পর এলাকা ভাগ করে নেয় তার সহযোগীরা। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মশিউর, গফুর ও ইয়াসিন সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মশিউর ও গফুর নীরব হয়ে যায়। এ সুযোগে ভোল পাল্টে একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এক সময় জুট মিলে চাকরি করা ইয়াসিন। আধিপত্য ধরে রাখতে গড়ে তোলেন নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী। আর সেই বাহিনী দিয়ে প্রশাসনের লোকজনের ওপর একের পর এক হামলা। এমনকি এই বাহিনীর হামলায় আহত হন সাংবাদিকও।
২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোহাম্মদ ইয়াসিন। সঙ্গে নিয়ে আসেন ছোটভাই ফারুককে। নিজে যোগ দেন একটি জুট মিলে। টাকার অভাবে বাসা ভাড়া নেন জঙ্গল সলিমপুরে। আর সেখানে গিয়েই অপরাধ জগতের গডফাদার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সে সময় জঙ্গল সলিমপুরের ত্রাস আলী আক্কাসের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বড় ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলতে মাঠে নামেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে নগরী ও আশপাশের জেলার সন্ত্রাসীদের মধ্যে যারাই পুলিশের ভয়ে থাকত তাদেরই আশ্রয় দিতেন ইয়াসিন। এরপর থেকে নিজেও পাহাড় কেটে শুরু করেন প্লট বাণিজ্য। আর সেই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলেন নিজের বিশেষ বাহিনী। এভাবে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীদের দুর্ভেদ্য আখড়ায় পরিণত হয় জঙ্গল সলিমপুর।
জানা গেছে, সন্ত্রাসী আলী আক্কাস র্যাবের ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ার পর সেখানে প্রভাব বিস্তার শুরু করে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াছিন, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকসহ সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা। কিন্তু একপর্যায়ে তারা পৃথক সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরির চেষ্টা করলে সংঘর্ষ, খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়ে যায়। এ কারণে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করে যৌথবাহিনী। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে পরে সেখানে সব অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সন্ত্রাসীরা। যাদের অনেকে এক সময় বিএনপির অনুসারী হিসাবে পরিচিতি পেলেও পরে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বেপরোয়া ওঠে। এরপর তারা সেখানে ছিন্নমূল বস্তি ও আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি নামে দুটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করে। শুরু থেকে আলীনগর সমবায় সমিতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন ইয়াসিন। এ সমিতির মাধ্যমেই সরকারি জমিকে বেসরকারি প্লট বানিয়ে বিক্রির মহোৎসব শুরু হয়। গত ২০ বছরে সেখানে কয়েক হাজার প্লট বিক্রি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে যায় এই ইয়াসিন।
জনবিস্ফোরণের হুমকি
২০২২ সালে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে অভিযান চালাতে গেলে হামলা করে ইয়াসিন বাহিনী। কিন্তু এই বাহিনীর সদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে জেলা প্রশাসনকে অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য করে। ওই বছরই জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গুলিবিনিময় হয়। একই বছরে অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধা দেয়া হয় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। ২০২৩ সালে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হন। গত ২১ জানুয়ারি এক ভিডিও বার্তায় ইয়াসিন বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যদি অহেতুক কোনো ঝামেলা সৃষ্টি হয় বা অপরাধের ফাঁদে ফেলে কেউ গোলযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে যত সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সবই হচ্ছে রোকন মেম্বারের লোকজনের মাধ্যমে। ডিসি পার্ক থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় তার লোকরা চাঁদাবাজি করছে। চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে সে আমাদের এই এলাকা দখল করতে চায়। তার কাছে সব অস্ত্রের ভান্ডার রয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি-এই রোকন মেম্বারকে গ্রেফতার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। সে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে টাকা তুলে এখানে র্যাবকে এনেছে।’ ইয়াসিন বলেন, ‘আজ আবারও জোরালোভাবে বলছি- এলাকায় যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তাহলে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে। এ জনবিস্ফোরণের দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে।’
এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক
চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের বর্তমান সভাপতি গাজী সাদেকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কাজী মশিউর রহমান। মশিউর রহমান বলেন, সমিতির সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ১৫ হাজার। আট হাজার পরিবারে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস সেখানে। পুরো এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়েছে ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য। দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই এখানে আছে। অধিকাংশ রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর, হোটেল বয় ও গার্মেন্টম শ্রমিক। মশিউর জানান, তাদের ওই এলাকার ভেতরে ১২টি মসজিদ, চারটি মাদ্রাসা, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, তিনটি কেজি স্কুল, তিনটি এতিমখানা, ছয়টি কবরস্থান, পাঁচটি মন্দির, দুটি কেয়াং, একটি গির্জা, একটি শ্মশান এবং একটি কাঁচা বাজার আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সমিতির সদস্যপদ নিতে হয় ১৫০ টাকা দিয়ে। পরে সমিতিকে টাকা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে একেক খণ্ড জমির দখল নিয়ে ঘর তুলেছেন তারা। এখানে সবাই নিঃস্ব, নদীভাঙা দরিদ্র মানুষ। ২০০৪ সাল থেকে তাদের এই বসবাস শুরু হয়েছে। পাহাড়ে এই অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০০৪ সালে একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ২০১০ সালে স্থানীয় লাল বাদশা ও আলী আক্কাসের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ওই এলাকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সংবাদকর্মীরা। ২০১০ সালের ২৩ মে র্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস নিহত হন।
জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দা মো. জসিম একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এলাকায় আমরা সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকি। আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই, এ ধরনের ঘটনা আর দেখতে চাই না।’ অবৈধ বসতি স্থাপনে পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আক্কাসের (আলী আক্কাস) ইতিহাস আপনারা জানেন। আক্কাসের পর্ব শেষ হয়েছে, এখন আরেক পর্ব এসেছে- ইয়াসিন। লোকে বলে- সে কোথায় থাকে, তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে একেক সময় একেকজন হাজির হবে। নেপথ্যে থেকে এগুলো করাবে। আমাদের উচিত তা করতে না দেয়া।’ ইয়াসিনের বিষয়ে জানতে চাইলে সংগ্রাম পরিষদের মশিউর বলেন, ‘সে কেউ না। সেটা আলীনগর এলাকা। সলিমপুর পেরিয়ে যেতে হয়। সেখানে আমাদের চেয়েও বড় পাহাড়।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









