রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

জামায়াতের ক্যাশ যখন বিকাশে

প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম

জামায়াতের ক্যাশ যখন বিকাশে

আর কয়েকদিন পরই নির্বাচন। প্রচারণা এখন তুঙ্গে। এখনো ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য ও মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) নম্বর সংগ্রহ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। অভিযোগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছেন এবং বিনিময়ে অর্থ  দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। এ ঘটনাকে ‘নির্বাচনি আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে বিএনপি।

গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (জামায়াত) কর্মীরা সাধারণ ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। এটি কেবল নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়, বরং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর আঘাত, যা একটি ফৌজদারি অপরাধ।’ 

বিএনপি অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের দিন বা তার আগে সংগ্রহ করা বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে বড় অংকের টাকা পাঠিয়ে ভোট কেনার একটি ছক আঁকা হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘সবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’। দলটির প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘জামায়াত কোনো দিন টাকা দিয়ে ভোট কেনার রাজনীতি করে না। আমাদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে ঠিকই, তা দাওয়াতি কাজ এবং নির্বাচনী ইশতেহার পৌঁছে দেয়ার জন্য। বিকাশ নম্বর সংগ্রহের কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা নেই। পরাজয়ের ভয়ে একটি মহল আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এই বানোয়াট তথ্য ছড়াচ্ছে।’ 

সম্প্রতি দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘জামায়াত জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে, ভোট কেনার প্রয়োজন নেই।’

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলে জানান। ইসি সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, কোনো দল বা প্রার্থী মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করছে, তবে ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। মোবাইল ব্যাংকিং সংস্থাগুলোকে (যেমন বিকাশ, নগদ) নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন বড় ধরনের কোনো অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য ইসিকে তাৎক্ষণিক জানানো হয়। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কোনো সুযোগ আইনে নেই। 

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আসলেই বড় অংকের টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়, তবে তা ট্র্যাক করা সহজ হবে। কিন্তু ছোট ছোট অংকে হাজার হাজার মানুষকে টাকা দেয়া হলে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায়, ‘বিকাশ বিতর্ক’ জনে জনে ছড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ‘ডিজিটাল ভোট কেনা’র সংস্কৃতি যদি শুরু হয়, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এক অশনিসংকেত। নির্বাচন কমিশনের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে এই বিভ্রান্তি ও অনিয়ম দূর করতে।

যেসব আসনে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে তার মধ্যে ঢাকা-১৫ (মিরপুর-কাফরুল) মূল অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু। এ আসনে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। মিরপুর ও কাফরুল এলাকার বিভিন্ন বস্তি ও মধ্যবিত্ত কলোনিতে জামায়াতের নারীকর্মীরা ‘জরিপ’ করার নাম করে ভোটারদের নাম, এনআইডি নম্বর এবং সচল বিকাশ নম্বর ডায়েরিতে টুকে নিচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ। এ আসনের বিএনপি প্রার্থী অভিযোগ করেন, ‘গোপন একটি দল আমার এলাকায় ভোটারদের বিকাশে টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এটি একটি পরিকল্পিত ডিজিটাল কারচুপি।’

এদিকে ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক অভিযোগ করেন, একটি দল ভোটারদের বিকাশ নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, তার নির্বাচনি এলাকায় আপাতদৃষ্টিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিরাজ করলেও, একটি দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকে বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। এর মাধ্যমে তারা ভোট কেনার চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

ফেনী-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্ট‍ু সরাসরি জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছেন। সোনাগাজী ও দাগনভূঞার গ্রামাঞ্চলে জামায়াত কর্মীরা উপহার সামগ্রী বিতরণের নাম করে তালিকা করছেন বলেও তাঁর অভিযোগ। আবদুল আউয়াল মিন্টু ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে যারা এনআইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর চাইছে, তাদের প্রতিরোধ করুন। এরা ভোটের পবিত্রতা নষ্ট করছে।’

নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) এলাকায় এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ ও উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে। নাটোর সদরে জামায়াতের নারীকর্মীরা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে বিএনপির নেতাকর্মী তাদের বাধা দেন। এ ঘটনায় জামায়াত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে, তাদের নির্বাচনী গণসংযোগে ‘চড়-থাপ্পড়’ মেরে বাধা দেয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জামায়াত কর্মীরা ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে অবৈধ লেনদেনের পথ খুঁজছে।

পাবনা-৫ এবং রাজশাহীর বিভিন্ন আসনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। পাবনা সদরে নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই বিকাশ নম্বর সংগ্রহ ইস্যু নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীতে এবি পার্টির এক প্রার্থী অভিযোগ করেন, জামায়াত কর্মীরা কৌশল পরিবর্তন করে ভোটারদের মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য নিচ্ছে যাতে নির্বাচনের ঠিক আগে টাকা পাঠানো যায়।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ভোট কেনাবেচা ঠেকাতে প্রতিটি আসনে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হবে। তাঁর মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হলে সেটি আচরণবিধির মারাত্মক লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। ইসি জানিয়েছে, নির্বাচনি এলাকায় হঠাৎ করে কোনো নির্দিষ্ট নম্বর থেকে অনেক বেশি পরিমাণ ছোট ছোট অঙ্কের (যেমন ৫০০ বা ১০০০ টাকা) লেনদেন হলে সেগুলোকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হবে। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডারদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এদিনকে বলেন, ‘বিএনপির অভিযোগের পরেই আমরা বিকাশের সঙ্গে কথা বলে লেনদেন সিমিত করার জন্য বলে দিয়েছি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মিটিং হয়েছে, তারা হয়তো ইতিমধ্যে সার্কুলার জারি করে থাকতে পারে।’ 

তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট এলাকায় বা নির্দিষ্ট এজেন্টদের মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে কি না, তা গোয়েন্দা সংস্থা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট পর্যবেক্ষণ করছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ওই অ্যাকাউন্টগুলো সাময়িকভাবে লক বা স্থগিত করে দেয়া হবে।’

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.