নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ ছাড়ে’ ঋণখেলাপিরা এবারের ভোটের মাঠে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ ছাড় মানে আইনের ‘চোরাগলি’ দিয়ে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন বৈধ করা হয়েছে। ইসির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছেন, ভোটে আটকানো যায়নি অন্তত ৪৫ ঋণখেলাপিকে। যাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি-জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন মনোনীত প্রার্থীরাও। আইনের দোহাই দিয়েই দায় সারতে চাইছে খোদ নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বিশেষজ্ঞ-অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন করছেন, এটা কি কেবলই আইনের মারপ্যাঁচ, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার? আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্টতা আর আইনের অপব্যবহারেই পার পেয়ে যাচ্ছেন খেলাপিরা। জুলাই আন্দোলনের সন্মুখসারির নেতারাও ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন বৈধ করায় ইসির কড়া সমালোচনা করেছেন। ঋণখেলাপিরা জনগণের টাকা ফেরত না দিয়েই জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন। জুলাই আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন, এসব ঋণখেলাপি নির্বাচিত হয়ে দেশের কী উপকার করবেন? তাঁরা বলছেন, ‘ঋণখেলাপিরা আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসে আপনার-আমার টাকা, জনগণের টাকা লুট করার জন্য অপেক্ষা করছে।’ নির্বাচন ও আইন বিশেষজ্ঞরাও এমন কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন এদিন-এর কাছে।
ভোটে ঋণখেলাপি: কে কী বলছেন
জুলাই আন্দোলনকারীদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মতে, ‘জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জাতীয়তাবাদী দল, দলের ইতিহাস-বাংলাদেশেরই ইতিহাস। বাস্তবে আর তার কোনো চিহ্নই নেই। আমরা দেখেছি তারা কীভাবে জনগণের টাকা লুট করা ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়েছে।
ঋণখেলাপিরা বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসে আবারও আপনার-আমার টাকা, জনগণের টাকা লুট করার জন্য অপেক্ষা করছে।’‘নির্বাচিত হলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে’—বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এমন প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, ঋণখেলাপিদের প্রার্থী করে দুর্নীতি দমনের কথা বলা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘একটা দল শুনলাম ইদানীং বলছে, তাদের হাতে দেশ এলে তারা নাকি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। যাদের সংসদ সদস্য (প্রার্থী) ৩৯ জন গুরুতর ঋণখেলাপি, কায়দা করে তাদের বানানো হয়েছে ক্যান্ডিডেট (প্রার্থী)। তাঁরা বাংলাদেশের মানুষকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন!’ জামায়াত আমির বলেন, ‘বগলের নিচে ঋণখেলাপিদের নিয়ে সংসদ নির্বাচন করবেন আর জনগণকে আপনারা ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ উপহার দেবেন—এসব ঘুম পাড়ানো, মনভোলানো গান আর চলবে না।’ তাঁর ভাষায়, ‘জুলাই যোদ্ধারা ঘুমিয়ে যায়নি। তাদের প্রথম কাজটি করেছে, দ্বিতীয় কাজের জন্য তারা এখন প্রস্তুত।’
সরকারের কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত টেকেনি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে এমপি হতে চাওয়া বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী ইসির কাছে মনোনয়নের বৈধতা চান। মাথায় তার ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা জনগণের আমানতের ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ, বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও যা পরিশোধ করেননি। কিন্তু বড় দলের বড় নেতার উপদেষ্টাকে সৌজন্যতা দেখিয়ে দায় পরিশোধ করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের ভাষায়— ‘কমিশনের কাছে প্রমাণ থাকার পরও, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’পক্ষপাতসহ অনেক অভিযোগের পরও এবারে মাঠ পর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৮২ এমপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছিল ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে। কিন্তু শেষমেষ সেখান থেকে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৫ এ। যার অন্তত ৩০ জন প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেছেন। আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া ৩০ খেলাপির মধ্যে ১৪ জনই বিএনপির। শুরুতে খেলাপির তালিকায় জামায়াত ইসলামীর দুজন থাকলেও একজন অর্থ পরিশোধ করে অন্যজন বৈধতা পান আদালতের স্থগিতাদেশে। বৈধতা দেয়া হয় নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। সুযোগ পাচ্ছেন জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির ১ জন করে। এছাড়া স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ১১ ঋণখেলাপি।
আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের স্থগিতাদেশের দোহাই দিয়ে নির্বাচন করতে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। স্থগিতাদেশ থাকলেও বিদ্যমান আইনে খেলাপিদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার এখতিয়ার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। ইসির আপিল শুনানিতে ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ আছে। শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।’যদিও এবারের নির্বাচনে কোনো খেলাপি অংশ নিতে পারবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যমান আইনে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। কেউ অন্যের ঋণের গ্যারান্টর থাকলেও তিনি খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমান সরকারের মেয়াদে সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী– সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও কোনো ব্যক্তির খেলাপির সত্যতা নিশ্চিত হলে তিনি পদ হারাতে পারেন। অবশ্য সরকারের দিক থেকে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সে অবস্থান দেখা যায়নি।
ভোটের মাঠে যেসব ঋণখেলাপি
ঋণখেলাপি হয়েও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এবার ৩১ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ১৫ জনই বিএনপির। তাদের মধ্যে আপিল শুনানিতে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তিনি ঋণখেলাপি হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। তাঁর ঋণখেলাপি না দেখাতে আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তিনি নির্বাচনী হলফনামায় কোনো ঋণ নেই উল্লেখ করেন। এই আসনে এনসিপির আলোচিত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ এ বিষয়ে ইসিতে আপিল করেন। শুনানি শেষে গত ১৭ জানুয়ারি তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়। উচ্চ আদালতদের স্থগিতাদেশ নেয়া অন্যদের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে। ঋণখেলাপির কারণে ৮২ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। তাদের মধ্য থেকে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ১৫ জন। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন হলেন– যশোর-২ আসনের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ।
প্রাইম ব্যাংকে তাঁর ক্রেডিট কার্ডের ঋণখেলাপি। নির্ধারিত তারিখের পর গত ১ জানুয়ারি ব্যাংকের সব পাওনা পরিশোধ করে তিনি খেলাপিমুক্ত হন। নির্ধারিত তারিখের পর খেলাপিমুক্ত হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন তিনি। দলটির আরেক প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল হক ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী। জনতা ব্যাংকের খেলাপি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তার প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুজন হলেন– যশোর-৩ থেকে মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন ও ময়মনসিংহ-৬ থেকে মো. নূরে আলম সিদ্দিকী।
জাতীয় পার্টির নীলফামারী-৩ থেকে মো. রোহান চৌধুরী, গণঅধিকার পরিষদের খাগড়াছড়ির দীনময় রোয়াজা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চাঁদপুর-২ থেকে নাসিমা নাজনিন সরকার ও এনপিপির বরগুনা-২ থেকে মো. সোলায়মান। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে স্বতন্ত্রপ্রার্থী সাতজন হলেন– খুলনা-৩ আসনের এস এম আরিফুর রহমান মিঠু, ঝালকাঠি-১ আসনের মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ-১০ আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৩ একেএম আলমগীর, মানিকগঞ্জ-২ এস এম আব্দুল মান্নান, ঢাকা-১ থেকে সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা ও গোপালগঞ্জ-২ থেকে উৎপল বিশ্বাস। ঋণখেলাপি হিসেবে বাতিল হওয়া অন্য ৬৭ জনের বাতিলই রয়েছে। কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ার ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়।
এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ারও মনোনয়ন টেকেনি। ঋণখেলাপির কারণে বিএনপির মনোনীত যশোর-৪ আসনের টিএস আইয়ুবের মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরবর্তী আপিলেও তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। তাঁর মালিকানাধীন সাইমেন্স লেদার প্রোডাক্টস ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি। এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফরাজীর মনোনয়নপত্র টিকেছে। চট্টগ্রাম-১১ থেকে একেএম আবু তাহেরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ আসনে দলটির মূল প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ থেকে আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমেদের ঋণ নির্ধারিত তারিখের পর ৩০ ডিসেম্বর খেলাপিমুক্ত হয়েছে। তবে তিনি বেশ আগে টাকা জমা দেয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
এদিন-কে ড. আব্দুল আলীম
এ ব্যাপারে বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম এদিন-কে বলেন, ‘বর্তমানে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতার বিষয়টি যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’ তার মানে এই যে, তারা ভোটে জিতে আবার লুটপাট করবেন- এমন প্রশ্নে ড. আলীম বলেন, ‘বর্তমান আইনি সীমাবদ্ধতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলার সময় এসেছে। নির্বাচন কমিশন এখন থেকে যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো খেলাপি বা অযোগ্য ব্যক্তি আর এ ব্যবস্থার ফাঁক গলে বের হতে পারবে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









