ঋণখেলাপি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের ‘আশকারায়’ দ্বৈত নাগরিকরাও এবারের ভোটের মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। আশকারা মানে আইনের ‘ছিদ্র’ দিয়ে, দয়া দেখিয়ে ঋণখেলাপির পাশাপাশি দ্বৈত নাগরিকদেরও মনোনয়ন বৈধ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।’
জুলাই আন্দোলনের সন্মুখসারির নেতারাও দ্বৈত নাগরিকের মনোনয়ন বৈধ করায় ইসির কড়া সমালোচনা করেন। দ্বৈতরা একই সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, ‘আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেয়া ২১ প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য হলফনামায় দিলেও, কমপক্ষে দুজন প্রার্থী সম্পর্কে আমাদের কাছে তথ্য আছে। দুজনই ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন বা আছেন; এই তথ্য তারা প্রকাশ করেননি। এক প্রার্থীর নির্ভরশীল ২১০ কোটি টাকার সম্পদ ইংল্যান্ডে আছে। তবে ওই সম্পদের তথ্য হলফনামায় প্রকাশ হয়নি।’ জুলাই আন্দোলনকারীদেরও প্রশ্ন, ‘এইসব দ্বৈত নাগরিক নির্বাচিত হয়ে দেশের কী উপকার করবেন?’ নির্বাচন ও আইন বিশেষজ্ঞরা এমন কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন এদিন-এর কাছেও।
দ্বৈত নাগরিকত্ব: অনেক প্রশ্ন
সম্প্রতি টিআইবি এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য লুকানোর কথা জানায়। তবে টিআইবির নীতিমালার কারণে তাদের পরিচয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জানান, এদের মধ্যে এক প্রার্থী নিজে ও স্ত্রীর নামে বিদেশে কোনো সম্পদ নেই ঘোষণা দিলেও, দুবাইতে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট রয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে- এক প্রার্থীর বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার ঘোষণা দিলেও সংখ্যাটি কমপক্ষে তিনগুণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
আরেকজন প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার না করলেও অনুসন্ধানে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৮টিই বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। একজন প্রার্থীর করস্বর্গে কোম্পানির নিবন্ধন থাকার পুরনো তথ্য অনেকটাই প্রকাশিত থাকলেও এ বিষয়ে হলফনামায় কোনো ঘোষণা দেখা হয়নি। প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে দুদক, এনবিআর ও ইসি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
দ্বৈত নাগরিকত্ব কী বা দ্বৈত নাগরিক কারা? দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) হচ্ছে, একই সাথে দুটি ভিন্ন দেশের নাগরিক হওয়া, যা জন্ম, বিবাহ, বা আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে, এবং এর ফলে দুটি দেশের আইন মেনে চলতে হয়। বাংলাদেশ সরকার নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের (যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের কিছু দেশ) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের অনুমতি দেয়, তবে এজন্য আবেদন ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এটি পাসপোর্ট গ্রহণ এবং অন্যান্য সেবার জন্য প্রয়োজন হতে পারে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি একই সময় দুটি ভিন্ন দেশের আইনগতভাবে নাগরিক হিসেবে গণ্য হন। আইনত, দুটি দেশই সেই ব্যক্তির ওপর আইন প্রয়োগ করতে পারে এবং তাকে উভয় দেশের প্রতি অনুগত থাকতে হয়। দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরা কিছু ক্ষেত্রে (যেমন সরকারি চাকরি বা নির্বাচনে) বিশেষ নিয়মকানুনের আওতায় পড়েন। দুটি দেশের আইনের প্রতি আনুগত্যের কারণে দ্বৈত নাগরিকরা কিছু ক্ষেত্রে দ্বৈত দায়িত্বের (conflicting obligations) মুখোমুখি হতে পারেন।
দ্বৈত নাগরিকরা ভোটের মাঠে আসায় রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের আনুগত্য, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তাই সামনে এসেছে। মূল প্রশ্নটি যদিও খুব সরল- যিনি আইন প্রণয়ন করবেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নেবেন; তিনি কি এককভাবে বাংলাদেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন নাকি অন্য কোনো রাষ্ট্রের আনুগত্য পোষণ করবেন? দ্বৈত নাগরিকত্ব মানে শুধু দুটি পাসপোর্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অন্য একটি রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ, আইনি দায়বদ্ধতা এবং প্রয়োজনে স্বার্থ রক্ষার বাধ্যবাধকতা। ফলে প্রশ্ন ওঠে, যিনি আইন প্রণয়ন করবেন; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশ নেবেন; এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত বিষয়ে অবস্থান নেবেন, তিনি দ্বৈত নাগরিক হলে এককভাবে বাংলাদেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা সম্ভব হবে কিনা? জুলাই আন্দোলনকারীদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মতে, ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করা একটি দলের প্রার্থীদের বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। তাদের মুখে জাতীয়তাবাদের কথা অত্যন্ত হাস্যকর শোনায়।’
এবারের ভোটে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন প্রবাসীদের মধ্যেও স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নাগরিকত্ব বদলাননি। তাদের পরিবার, ভবিষ্যৎ ও শিকড় বাংলাদেশেই। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় এসব মানুষের পাঠানো রেমিট্যান্সই দেশকে বড় ধরনের পতন থেকে রক্ষা করেছে। তারা বিদেশে শ্রম দিলেও আনুগত্য বদলায় না। তাদের কোনো দ্বিতীয় ঠিকানা নেই। অন্যদিকে একটি শ্রেণি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও দেশে ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখে। তাদের পরিবার, সন্তান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশে সুরক্ষিত। ফলে ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় ভুল হলে বা জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হলে দেশ ছেড়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ খোলা থাকে। এই প্রবণতা কি শাসনব্যবস্থার ভেতরে স্থায়ী দুর্বলতা তৈরি করে না?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বহু দেশ বাস্তব উপলব্ধি থেকে নাগরিকত্ব নীতিতে কড়াকড়ি করেছে। জাপান ও সিঙ্গাপুর দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। ভারত বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল করে। ইউরোপের অনেক দেশে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলে নাগরিকত্ব পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। কারণ দ্বিতীয় দেশের নাগরিকত্ব কোনো সুবিধার কাগজ নয় বরং এটি দ্বিতীয় দেশের প্রতি বাংলাদেশির দায়িত্ব, শপথ এবং আনুগত্যের সম্পর্ক, যা বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে।
এ ব্যাপারে নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম এদিন-কে বলেন, ‘বর্তমানে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতার বিষয়টি যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’ তাঁর মতে, ‘বর্তমান আইনি সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলার সময় এসেছে। নির্বাচন কমিশন এখন থেকে যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহির শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে, তবে ভবিষ্যতেও কোনো অযোগ্য ব্যক্তি আর এ ব্যবস্থার ফাঁক গলে বের হতে পারবে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









