বাংলাদেশের রাজনীতির গত দুই যুগের সমীকরণ পাল্টে দিচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের বর্তমান অবস্থান। অথচ এই দুই দলের সখ্যের শুরু দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় আগে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোটের মাধ্যমে। এই দীর্ঘ সময় সুখে-দুঃখে একসাথেই ছিল দুই দল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অফিস-আদালতের চেয়ার দখলকে কেন্দ্র করে তাদের দূরত্ব প্রকাশ্য রূপ নিতে শুরু করে।
আর আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই দূরত্ব এখন কথার লড়াই ছাপিয়ে অনেকটা মাঠের সংঘাতে রূপ নিয়েছে। একসময়ের জোটের বন্ধু এই দুই দল যেন এখন একে অন্যের ঘোষিত শত্রু। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে দল দুটি জড়িয়ে পড়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও। আগামী কয়েক দিনে এই সংঘাত আরো বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে সাধারণ মানুষ।
রাজপথের আন্দোলনে যে জামায়াত ছিল বিএনপির ‘ভ্যানগার্ড’, তারা এখন একে-অপরের প্রতিযোগী ও সমালোচক। ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তৎকালীন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এবং জামায়াতের আমির গোলাম আযম জোটবদ্ধ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই জোট অভাবনীয় সাফল্য পায় এবং জামায়াতের দুজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান। তবে শুরু থেকেই বিএনপির একটি বড় অংশ এবং সুশীল সমাজ এই জোটকে বাঁকা চোখে দেখেছে।
পাঁচ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তারা মনে করছে, জামায়াতকে সাথে রাখলে আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশের সেক্যুলার ভোটারদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতও এখন আর বিএনপির ‘বি-টিম’হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজেদের একক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কার ভূমিকা বেশি ছিল, তা নিয়ে দুই দলের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। দুই দলের শীর্ষ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে এই তিক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুই দলের শীর্ষ দুই নেতা এতদিন একে অন্যকে সরাসরি আক্রমণ না করলেও এখন আর তাদের সমালোচনায় কোনো রাখঢাক নেই। তারা একে অন্যকে স্বাধীনতাবিরোধী এবং চাঁদাবাজ বলতেও ছাড়ছেন না।
জামায়াতকে উদ্দেশ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমানে দেশে নতুন জালিমের আবির্ভাব হয়েছে। গুপ্তদলের লোকেরা জালিম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশে নারী-পুরুষ মিলিয়ে মাঠে কাজ করে। নতুন জালিম যাদের মানুষ গুপ্ত হিসেবে চেনে সেই জালিমদের নেতা নারীদের নিয়ে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেন। এরা ইসলামের রাজনীতি করে কিন্তু নারীদের নিয়ে কিভাবে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করে?’
তিনি আরো বলেন, ‘গুপ্ত সংগঠনের নেতারা ভুয়া সিল ছাপাচ্ছে, বিভিন্ন প্রেসে জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই যারা অনৈতিক কাজ করে ভোটকে প্রভাবিত করছে, তারা কী করে সৎমানুষের শাসন কায়েম করবে? আইডি হ্যাকের নামে মিথ্যা কথা বলে যারা, তারা সৎমানুষ হতে পারে না।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘দেশের মানুষ সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের হাত থেকে মুক্তি চায়। আগামী নির্বাচনে মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে এসব জুলমের দাঁতভাঙা জবাব দেবে।’
তিনি বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী আমার পেছনে লেগেছে। আমার এক্স আইডি হ্যাক করে যা তা চালিয়ে দিয়েছে। আর অমনি একটা দল ঝাঁপিয়ে পড়ে তাইরে-নাইরে গান শুরু করেছে। লজ্জা। ওদের চুনোপুঁটি তো গাইল বটে, এখন তাদের বড় বড় মাথাগুলোও গাইতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তারা পেরে ওঠেনি, আমাদের সাইবার টিম তাদের গলা টিপে ধরেছে। সত্য কখনো ধামাচাপা দেয়া যায় না। ইতোমধ্যে প্রধান অপরাধীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে না। সূর্যকে মেঘ ঢেকে রাখতে পারে না।’
তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না। চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। আর বিভক্তি নয়। কোনো দলীয় রাষ্ট্র কায়েম করতে চাই না। এ বিজয়ে তিস্তাপাড়ের মানুষের মাঝে গণজোয়ার দেখছি। আমরা দেশে আধিপত্যবাদীদের ক্ষমতা দেখতে চাই না, চাই সমতা থাকুক বাংলাদেশে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এদিন-কে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘসময় জামায়াতকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করেছি। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এখন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে মনোযোগী, যেখানে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই।’ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিভিন্ন সময় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দল এখন এককভাবে পথ চলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। তিনি মনে করেন, জামায়াত তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি ব্যস্ত।
অন্যদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই। বিএনপি যদি মনে করে আমাদের ছাড়া ভালো থাকবে, সেটা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমাদের দরজা সবার জন্য খোলা, এখন এককভাবে জনমানুষের কাছে যেতে চাই।’
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দলের মধ্যকার দূরত্ব জনসমক্ষে আসে। বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি তুললেও জামায়াত রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত চাইছে সংস্কারের নামে সময় নিয়ে নিজেদের সংগঠনকে তৃণমূল পর্যন্ত আরো শক্তিশালী করতে, যাতে তারা আগামী নির্বাচনে একক বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত, আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি জামায়াতকে একটি ‘বোঝা’হিসেবে মনে করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরই জামায়াতের আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলে এসেছে। বিএনপি এখন নিজেকে একটি উদার-ডানপন্থী দল হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে চায়, যেখানে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ থাকা তাদের জন্য নেতিবাচক হতে পারে। বিএনপি এবং জামায়াত এখন একে অপরের প্রতিযোগী। জামায়াত এখন বিএনপির জন্য শুধু একটি আলাদা দল নয়, বরং ভোট ব্যাংকে বড় ভাগ বসানো এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ ড. আতিকুর রহমানের মতে, জোট হয় ড্রইংরুমে বসে চা-চক্রে, কিন্তু ভোট হয় মাঠের কঠিন লড়াইয়ে। যে কারণে জোটের দুটি দল যখন ভোটের মাঠে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হয় তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এটিই জোট ও ভোটের রাজনীতির ট্র্যাজেডি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









