ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আরোপ করা যান চলাচলের কঠোর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও রাজধানীর সড়কগুলোয় দেখা গেছে ব্যক্তিগত গাড়ির অবাধ চলাচল। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার এবং জিপ গাড়ির উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল, যা কমিশনের নির্দেশনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া ১০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ৭২ ঘণ্টার জন্য মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সকালে রাজধানীর মিরপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা ও শাহবাগ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোনো ধরনের পুলিশি চেকপোস্ট না থাকায় বিনাবাধায় চলেছে এই গাড়িগুলো। অনেক গাড়িতেই কোনো স্টিকার বা বৈধ পাস ছিল না, তবুও তারা অনায়াসেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি যান চলাচলের বিধিনিষেধ বা নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তবে তাকে, সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে। (এটি অপরাধের ধরন এবং গাড়ির ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে)। অথবা মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ড (জরিমানা) করা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড উভয়ই হতে পারে। এ ছাড়া নির্বাচনের দিন রাস্তায় কোনো গাড়ি যদি বৈধ স্টিকার বা অনুমতিপত্র ছাড়া চলাচল করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (পুলিশ, র্যাব বা বিজিবি) তাৎক্ষণিকভাবে সেই গাড়িটি জব্দ করতে পারে। সাধারণত নির্বাচনের পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাড়িটি ছাড়িয়ে নিতে হয়। যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো গাড়ি নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে বা ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে ব্যবহৃত হয়েছে (যা আইনত নিষিদ্ধ), তবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ব্যবস্থা নেয়া যায়। এর ফলে এমনকি তার প্রার্থিতা বাতিল পর্যন্ত হতে পারে।
নির্বাচনের দিন মাঠ পর্যায়ে অসংখ্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। রাস্তার মোড়ে গাড়ি থামিয়ে নিয়ম ভঙ্গকারীকে সরাসরি সাজা বা জরিমানা করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। রাস্তায় চলাচলকারী অনেক গাড়ির সামনের কাঁচের ওপর ‘জরুরি নির্বাচনী কাজ’ বা ‘প্রেস’ লেখা (হাতে) কাগজ দেখা গেছে। দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকেই হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন বা এয়ারপোর্টের টিকিট দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে প্রভাবশালী মহলের পরিচয় দিয়ে বাধা উপেক্ষা করছেন।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এবার ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সুবিধার জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হয়। তবে এই সুযোগের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মী ও ক্যাডাররা মহড়া দিয়েছে কি না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয় ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা প্রতিটি মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালিয়েছেন। যাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র বা জরুরি কারণ নেই, তাদের গাড়ি আটকে রাখা হয়। তবে গণপরিবহন ও রিকশার অভাব থাকায় সাধারণ মানুষকে খুব বেশি হয়রানি না করার চেষ্টা করা হয়। তবে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, গণপরিবহন ও মোটরসাইকেল বন্ধ থাকায় দূরবর্তী ভোটকেন্দ্রে যাওয়া তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ অবস্থায় যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তারা সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ ভোটাররা পড়েছেন বিপাকে। এ বিষয়ে ডিএমপি থেকে জানানো হয়, ‘মাঠ পর্যায়ে আমরা ইসির নির্দেশনা শতভাগ কার্যকরের চেষ্টা চলেছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় অসুস্থ রোগী বা জরুরি বিমানযাত্রীদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা দেখানো হয়। অনেক সময় ব্যক্তিগত গাড়িতে স্টিকার বা প্রেস লিখে পার পাওয়ার চেষ্টা করা হয়, আমরা সেগুলো যাচাই করে দেখেছি। যারা আইন অমান্য করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও গাড়ি জব্দের প্রক্রিয়া চলমান ছিল।’ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকা বেসরকারি একটি সংস্থার একাধিক সদস্য এদিনকে বলেন, ‘যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা নিরাপত্তার জন্য জরুরি, কিন্তু তা যেন সাধারণ ভোটারদের ভোটাধিকারে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। আমরা লক্ষ্য করছি, অনেক সময় ব্যক্তিগত গাড়ির ছদ্মবেশে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এলাকায় মহড়া দেয়। পুলিশের উচিত কেবল সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে প্রভাবশালী বা অবৈধ স্টিকার ব্যবহারকারীদের দিকে নজর দেয়া।’
ঢাকা-৫ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুস সবুর আসুদ এদিনকে বলেন, ‘আমরা কমিশনের নির্দেশকে সম্মান জানাই। বিরোধী পক্ষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে ভোটারদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









