বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় দুই দশক পর উৎসবমুখর ও রক্তপাতহীন একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার বারবার বলে আসছিলেন, ইতিহাসের সেরা ভোট উপহার দেবেন। আসলেই, কথা রক্ষা করছেন প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এবারই প্রথম ভোটের আগে ঈদের খুশিতে শহর ছেড়ে গ্রামে গেছে। ভোটের দিন গ্রাম-শহরে উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক ভোট প্রদান করে নাগরিকরা।
শান্তিপূর্ণ ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পান ভোটাররা। বিশেষ করে ভোটে নারী এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আর এই ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মসনদের নিশ্চয়তা পেল বিএনপি। তবে তিন দশক পর শক্তিশালী বিরোধী দলও পেতে যাচ্ছে এবারের জাতীয় সংসদ। সংসদে উচ্চকক্ষ এবং নিম্ম কক্ষে বিভক্ত দুটি সিস্টেম চালু হচ্ছে এবারই প্রথম। এবারের ভোটে বিএনপি জোট প্রায় দুই দশক পর চতুর্থ বারের মতন ক্ষমতায় বসছে। আর প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকছে বিএনপির একসময়ের জোটবন্ধু জামায়াতে ইসলামী। নিম্নকক্ষের পাশাপাশি উচ্চকক্ষেও বাজিমাত জামায়াতে ইসলামীর।
পাশাপাশি চব্বিশের উত্থানের পর গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও জামায়াতের সাথে জোটগত নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৬টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া ছোট ছোট কয়েকটি দল এবং দলের নেতারা বিএনপি-জামায়াতের সাথে পৃথক জোট কিংবা সমঝোতা করে আসন পেয়েছে। আর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের পলাতক অনেক কর্মী-সমর্থক প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরছে। বিএনপি কিংবা জামায়াতের সাথে মিলেমিশে প্রকাশ্যে এসে ভোট দিয়েছে। বলা চলে, এবারের নির্বাচনে কেউ হারেনি, সবাই জিতেছে। অর্থাৎ, অন্তবর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও আওয়ামী লীগ। আর এটাকে সাধারণ মানুষ ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছেন।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। মোট ২১২টি আসন পেয়েছে দলটি, আরো দুই আসনে জয় পেলেও আইনি জটিলতায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি রয়েছে। অপরদিকে গণভোটে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিএনপির একচ্ছত্র মালিকানা তৈরি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এ অবস্থায় গণভোটের গুরুত্বপূর্ণ কি-পয়েন্টের একটি—উচ্চকক্ষে কী হতে যাচ্ছে? কারণ, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও এ বিষয়টিতে বেশকিছু নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল দলটি। একই সঙ্গে বিএনপির ইশতেহারে উচ্চকক্ষ নিয়ে রয়েছে জুলাই সনদের সঙ্গে বিপরীত অবস্থানও। ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ২৯৯টি আসনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিএনপি জোট ২১২, জামায়াত জোট ৭৭, স্বতন্ত্র ৭ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসন পেয়েছে। বাকি রয়েছে দুটির ফল ঘোষণা, আর একটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়নি। অপরদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন দেশের ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ ভোটার এবং ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোটার। মোট ২৯৯ আসনে গণভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দু-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে থাকা বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। আর দলগতভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ আসনপ্রাপ্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা পেয়েছেন ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ ভোট। সাতটি আসনে বিজয়ী স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের ঘরে গেছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশের সমর্থন। গতকাল রবিবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) দলগত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের এ তথ্য প্রকাশ করেছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তিনদিন পর প্রকাশ করল সংস্থাটি। ভোটের পর দিন শুক্রবার দলভিত্তিক ফল ও ভোটের হার তুলে ধরে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সংসদ নির্বাচনের ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ (২৯৭ আসনে)। আর গণভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ( ২৯৯ আসনে)। ৫০টি দল ভোটে অংশ নিলেও ২৯৭ আসনে মাত্র ৭টি দল জয় পেয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠন হলে তার আসন বণ্টন সংসদ নির্বাচনের আসনের অনুপাতে হবে, নাকি ভোটের অনুপাতে হবে, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
দলের প্রার্থীরা কত ভোট পেল
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ১৩ প্রার্থীর (ছাতা) ০.৩৫%, বাইসাইকেল প্রতীকে জাতীয় পার্টির (জেপি) ১০ জন ০.০৪%, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ৬৫ জন কাস্তে প্রতীকে পেয়েছেন ০.০৮%, ধানের শীষ নিয়ে বিএনপির ২৯০ জন পেয়েছেন ৪৯.৯৭%, গণতন্ত্রী পার্টির ১ জন (কবুতর) ০.০০%, জাতীয় পার্টির ১৯৯ জন লাঙ্গল প্রতীকে ০.৮৯%, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৮ জন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৩১.৭৬%, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ২৮ জন ০.০৪%, জাকের পার্টির ৫ জন গোলাপ প্রতীকে ০.০২%, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৩৫ জন মই প্রতীকে ০.০৫%, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ২ জন গরুর গাড়ির প্রতীকে ০.১৪%, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ৮ জন বটগাছ প্রতীকে ০.০১%, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ১৬ জন হারিকেন প্রতীকে ০.০১%, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ২২ জন আম প্রতীকে ০.০১%, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশেল ৪ জন খেজুর গাছ প্রতীকে ০.৪৭%, গণফোরামের ২০ জন উদীয়মান সূর্য প্রতীকে ০.০১%, গণফ্রন্টের ৫ জন মাছ প্রতীকে ০.০০%, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ১ জন গাভী প্রতীকে ০.০১%, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির ৬ জন কাঁঠাল প্রতীকে ০.০০%, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ২০ জন চেয়ার প্রতীকে ০.০৮%, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির ২ জন হাতঘড়ি প্রতীকে ০.০০%, ইসলামী ঐক্যজোটের ২ জন মিনার প্রতীকে ০.০০%, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩৪ জন রিক্সা প্রতীকে ২.০৯%, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন হাতপাখা প্রতীকে ২.৭০%, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ২৫ জন মোমবাতি প্রতীকে ০.৪৫%, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ১ জন চশমা প্রতীকে ০.০০%, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ৭ জন কোদাল প্রতীকে ০.০৪%, খেলাফত মজলিসের ২০ জন দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে ০.৭৬%, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) ৪ জন হাত পাঞ্জা প্রতীকে ০.০০%, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) ২০ জন ছড়ি প্রতীকে ০.০১%, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) ৮ জন টেলিভিশন প্রতীকে ০.০০%, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ৮ জন সিংহ প্রতীকে ০.০০%, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১৮ জন ডাব প্রতীকে ০.০১%, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ৪২ জন আপেল প্রতীকে ০.০৩%, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (বাংলাদেশ জাসদ) ১৫ জন মোটরযান প্রতীকে ০.০২%, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) ১৮ জন একতারা প্রতীকে ০.০৪%, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ৩০ জন ঈগল প্রতীকে ০.২৮%, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) ৯৪ জন ট্রাক প্রতীকে ০.৩৩%, নাগরিক ঐক্যের ১১ জন কেটলি প্রতীকে ০.০১%, গণসংহতি আন্দোলনের ১৭ জন মাথাল প্রতীকে ০.১৪%, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির ২ জন ফুলকপি প্রতীকে ০.১৭%, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) ৮ জন রকেট প্রতীকে ০.০১%, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ১৭ জন আনারস প্রতীকে ০.০১%, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ১৪ জন হাতি প্রতীকে ০.০২%, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন শাপলা কলি প্রতীকে ৩.০৫%, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) ৩২ জন কাঁচি প্রতীকে ০.০২%, জনতার দলের ২০ জন কলম প্রতীকে ০.০৫%, আমজনতার দলের ১৫ জন প্রজাপতি প্রতীকে ০.০১%, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টির (বিইপি) ১ জন দোয়াত কলম প্রতীকে ০.০০% এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ৩ জন বই প্রতীকে ০.০৪% ভোট পেয়েছেন।
সংরক্ষিত নারী আসন ও জুলাই সনদের উচ্চকক্ষ
এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ২৯৭ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি জিতেছে ২০৯ আসন; জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের ১১ দলীয় জোট শরিকদের মধ্যে এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ দুটি ও খেলাফত মজলিশ একটি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে থাকা গণঅধিকার পরিষদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি একটি ও গণসংগতি আন্দোলন একটি আসনে জয় পেয়েছে। জোটের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি ও স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা সাতটি আসনে জয় পেয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদে সংরক্ষিত ৫০ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পাবে ৩৬, জামায়াত জোট পাবে ১৩, আর স্বতন্ত্ররা পাবে একটি।
দ্বিকক্ষ হলে উচ্চকক্ষ গঠন কীভাবে
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পেয়েছে। জুলাই সনদে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রস্তাব রয়েছে। সেক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে। বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে ৫০টি। সেটি ক্রমান্বয়ে ১০০টিতে উন্নীত করার প্রস্তাবও রয়েছে। পিআর পদ্ধতিতে আসন বণ্টনে ২৪টি রাজনৈতিক দল একমত হলেও বিএনপিসহ ৭টি রাজনৈতিক দল ও জোটের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত আছে। তারা বলেছে, নিম্নকক্ষের ভোটের ভিত্তিতে নয়, উচ্চকক্ষ গঠন হবে সংসদ নির্বাচনের আসনের অনুপাতে। বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এ মুহূর্তে উচ্চকক্ষের প্রয়োজন নেই বলেও ‘নোট অব ডিসেন্টে’ বলা হয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর। তবে কোনো কারণে নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে বিএনপি
নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমান বারবার একটি বার্তা দিয়ে আসছিলেন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি করব না। নির্বাচনের পরদিন থেকেই সেই বার্তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কি পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে? বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ কর্মীরা যে গণপিটুনি বা মামলার ভয়ে ছিল, তা কাটাতে বিএনপি ঢাল হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। কার্যক্রম স্থগিত থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের অফিসগুলো সচল করে দেওয়র মাধ্যমে দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে ‘নিশ্বাস নেয়ার’ সুযোগ করে দিচ্ছে বিএনপি। এ ছাড়া বিএনপি জানে, আওয়ামী লীগের বিশাল কর্মী বাহিনীকে কোণঠাসা করলে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। তাই তাদের ‘মেইনস্ট্রিমে’ রাখার চেষ্টা চলছে।
আওয়ামী লীগ ফেরার ইঙ্গিত
নির্বাচনের ঠিক পরদিন (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) পঞ্চগড়ে বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান কর্তৃক আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেয়ার ঘটনাটি একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে প্রতিহিংসার বদলে স্থিতিশীলতা। বিএনপি নেতৃত্ব হয়তো চাইছে না মাঠপর্যায়ে কোনো সংঘাত অব্যাহত থাকুক। আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দেয়ার যে আশ্বাস বিএনপি নেতারা দিচ্ছেন, তা দলটিকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার একটি প্রচ্ছন্ন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলকে পুরোপুরি নির্মূল করলে চরমপন্থা বাড়তে পারে এমন একটি কৌশলগত চিন্তা থেকে বিএনপি দলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সরাসরি নির্বাচনে অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগ ছিল এ নির্বাচনের অন্যতম ‘গেম চেঞ্জার’। আর এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী বিএনপিকে ভোট দিয়েছে যা জামায়াতের একচেটিয়া আধিপত্য ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত (১২ মে ২০২৫ থেকে) থাকলেও এবং শীর্ষ নেতৃত্ব বিদেশে থাকলেও, মাঠপর্যায়ে তাদের অফিস খুলে দেয়া এবং নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ কমে আসা দলটির জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ যদি ফিরতে চায়, তবে তাকে একটি ‘পরিশোধিত’ চেহারায় আসতে হবে। বিতর্কিত বা অভিযুক্ত নেতাদের বদলে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের নেতৃত্বে আনতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে একটি কার্যকর ভারসাম্য রক্ষায় আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকা জরুরি। তাদের মতে, বিএনপি সরকার গঠন করার পর যখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শুরু করবে, তখন তারা আওয়ামী লীগের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করতে পারবে না। পঞ্চগড়ের ঘটনাটি সম্ভবত একটি পাইলট প্রজেক্ট, যা দেশের অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সব দল নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার বিএনপির
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বের অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, তারা কেবল একক বিজয় নয়, বরং ‘জাতীয় ঐক্য’ ও ‘স্বাধীনতার পক্ষের সব শক্তিকে নিয়ে’ রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করছে। বিএনপি নিজেকে ‘রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের দল’ হিসেবে দাবি করে এখন একটি ‘বিগ টেন্ট’ পলিটিক্স বা সর্বজনীন রাজনৈতিক ধারার দিকে হাঁটছে। তারেক রহমান তাঁর বিজয়-পরবর্তী বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত ১৫ বছরের শোষণ ও জুলুমের বদলা হিসেবে বিএনপি কোনো প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড সমর্থন করবে না। পঞ্চগড়ে বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধানের আওয়ামী লীগ অফিস খুলে দেয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এটি বিএনপির কেন্দ্রীয় কৌশলের অংশ যাতে দলটির তৃণমূল কর্মীরা (যারা অপরাধের সাথে জড়িত নয়) নিজেদের নিরাপদ মনে করে এবং উগ্রপন্থা বা বিশৃঙ্খলার দিকে না ঝুঁকে বিএনপির ‘জাতীয় ঐক্যের’ ছায়াতলে আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। জামায়াতের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব সামাল দিতে বিএনপি আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোট ব্যাংক এবং অন্যান্য ছোট ছোট ‘লিবারেল’ বা উদারপন্থী দলগুলোকে (যেমন: গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি) সাথে রাখতে চায়। এ ছাড়া একটি অংশগ্রহণমূলক ও সহনশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সালেহ উদ্দিনের মতে, বিএনপি এখন ‘শত্রু নির্মূ ‘ নয় বরং ‘শত্রু রূপান্তর’ প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি দলকে মাঠপর্যায়ে স্পেস দেয়ার অর্থ হলো একটি বড় জনশক্তিকে স্থিতিশীলতার ভেতরে নিয়ে আসা।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









